আতুই বলল, কাল যদি ওখানে যেতে পারি তাহলে খুব তাড়াতাড়ি আমরা হীরকদেশের উপত্যকায় গিয়ে পড়ব।
শেখ আতুইকে কি বলতে রোন্ডা তাকে জিজ্ঞাসা করল শেখ কি বলল।
আতুই বলল, শেখ বলছে হীরকদেশে গিয়ে অনেক হীরে পেলে সে ধনী হবে। তখন সে তোমাদের দু’জনকেই রেখে দিতে পারবে। সে তখন আর বিক্রি করবে না তোমাদের।
আরবরা মেয়েদের শোবার জন্য একটা তাবুর ঘরে কম্বল বিছিয়ে দিল। রোন্ডার চোখে কিন্তু ঘুম এল না। সে এক সময় নাওমিকে বলল, ওরা যখন সত্যি সত্যিই হীরের দেখা বা খোঁজ পাবে না, তখন আমাদের উপর ক্ষেপে যাবে। আমাদের তখন যেখানে হোক বিক্রি করে দেবে। সুতরাং এখনি আমাদের পালিয়ে যেতে হবে এখান থেকে।
নাওমি বলল, সে কি, এই রাত্রিতে বনের ভিতর দিয়ে কি করে পালাবে? যাই হোক, তোমার মতলবটা কি?
রোন্ডা বলল, তুমি শুধু আমাকে অনুসরণ করে যাবে। কোন কথা বলবে না।
এই বলে সে উঠে দেখল আরবরা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। একজন পাহারাদার শুধু আগুনের ধারে জেগে আছে। সেও তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে ঝিমোচ্ছে।
রোন্ডা চুপি চুপি উঠে গিয়ে একটা জ্বলন্ত কাঠ এমনভাবে সজোরে প্রহরীটার উপর খুঁজে ধরল যে, সে সঙ্গে সঙ্গে অচেতন হয়ে পড়ে গেল।
বনের মধ্যে অশ্বারোহীদের যাবার মত যে একটা পথ ছিল সেই পথ ধরে ওরমান আর বিল ওয়েস্ট এগিয়ে চলেছিল।
ওরমান এক সময় বলল, আমি ভেবেছিলাম একদিনের মধ্যেই আরবদের দেখা পেয়ে যাব এবং দেখা করেই শিবিরে ফিরে আসব। কিন্তু এগার দিন কেটে গেল। আর কোন আশাই নেই। এখন আমাকে ফিরে গিয়ে আমার দলের লোকদের বাড়ি পাঠাবার কথা ভাবতে হবে।
ওরা বুঝতে পারল বনে পথ হারিয়ে ফেলেছে। হঠাৎ ওয়েস্ট বলল, কিসের একটা শব্দ শুনতে পাচ্ছি। মনে হচ্ছে কে যেন আসছে।
ওরমান বলল, ওটা একটা সিংহ হলে মুস্কিল হবে। কারণ এখানে পথটা সরু এবং দু’ধারে ঘন ঝোপ।
ওরমান আগে গুলি করল। গুলিটা সিংহটার মাথার খুলিতে লাগল। বিলের গুলি লাগল না। সিংহটা ক্ষেপে গিয়ে ওরমানকে আক্রমণ করল। ওয়েস্ট হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু ওরমানকে কোনভাবে আহত করার আগেই একটা গাছ থেকে টারজান সিংহটার উপর অতর্কিতে লাফিয়ে পড়ে তার কেশর ধরে বারবার ছুরি বসাতে লাগল তার গায়ে। সিংহটা মারা গেলে তার মৃতদেহের উপর দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে বিজয়সূচক এক চীৎকার করল। ওরমান আর ওয়েস্ট অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু তারা কোন ধন্যবাদ দেবার আগেই টারজান অদৃশ্য হয়ে গেল বনের মধ্যে।
প্রহরীটাকে মেরে রোন্ডা শিবিরের সব ঘোড়াগুলোকে ছেড়ে দিল। তাদের জন্য দুটো ঘোড়াকে বেছে নিয়ে নিজে একটাতে চেপে অন্যটাতে নাওমিকে চাপাল। অন্য ঘোড়াগুলোকে বনের মধ্যে তাড়িয়ে দিল। ঘোড়াগুলো ছাড়া পেয়ে এদিক সেদিক ছুটে পালাতে লাগল।
ফাঁকা জায়গাটা পার হয়ে বনপথ ধরল ওরা।
কিছুদূর যাবার পর তারা একটা নদীর সামনে এসে পড়ল। নদীটা কিভাবে পার হতে হবে তা বুঝতে পারল না।
রোন্ডা বলল, নদীটা পার হতে হবে। এখন ফিরে গেলে আরবদের কবলে পড়ব আমরা। আমার সঙ্গে সঙ্গে এস। নদীটা তেমন চওড়া বা গভীর নয়। ঘোড়াগুলোকে নামিয়ে দিলে ঠিক পার হয়ে যাব।
নদী পার হতেই সকাল হয়ে গেল। দূরে সামনে পাহাড় দেখা যাচ্ছিল। নদীটার এপারে ফাঁকা মাঠ। মাঝে মাঝে কিছু গাছপালা ছড়িয়েছিল।
নদী পার হয়ে ওরা আবার ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়েছিল। সহসা সামনে কতকগুলো গাছের ওধার থেকে একটা সিংহের গর্জন শোনা গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে সিংহটা ওদের সামনে এসে রোন্ডার ঘোড়াটাকে আক্রমণ করল আগে। রোন্ডা ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে মরার মত শুয়ে রইল স্থির হয়ে। সিংহটা। ঘোড়াটাকে মেরে তার উপর থাবা গেড়ে বসে রইল। এদিকে সিংহটা রোন্ডার ঘোড়াটাকে মারতে গিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লে নাওমির ঘোড়াটা তীরবেগে পিছন দিকে ঘুরে পালিয়ে গেল। নদী পার হয়ে যে পথে। এসেছিল ওরা, সেই পথেই পালাতে লাগল ঘোড়াটা। নাওমি তার গতিকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারল না কোনভাবে। নাওমি একবার পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখল সিংহটা সেইভাবে বসে আছে ঘোড়ার মৃতদেহটার উপর আর তার অদূরে রোন্ডা তেমনি শুয়ে আছে নিস্পন্দ হয়ে।
এদিকে ওরমান আর বিল ওয়েস্ট পথ হারিয়ে গভীর জঙ্গলের মধ্যে অনেক ঘুরে বেড়াল। কিন্তু কোন পথ খুঁজে পেল না। ওরা হারানো মেয়ে দুটোর খোঁজে বেরিয়েছে দু’সপ্তাহ হয়ে গেল। কয়দিন কিছুই খাওয়া হয়নি। আজ আবার পথে সিংহ ওদের আক্রমণ করায় ভয় পেয়ে গেছে দু’জনেই।
ওরমান বলল, আমি ভূত বিশ্বাস করি না। ওবরস্কি ভূত নয়, ওবরস্কি নিজেই আমাদের উদ্ধার করে চলে গেছে। তবে তার মাথার ঠিক নেই। সে পাগল হয়ে গেছে বলে গায়ে তার জোর অনেক বেড়ে গেছে এবং সে আমাদের চিনতে পারেনি।
ওয়েস্ট বলল, ওবরস্কি যাই করুক সে শুধু আমাদের বাঁচায়নি, সে আমাদের আর একটা উপকার করে গেছে সিংহটাকে মেরে।
ওরমান বুঝল সিংহটার মাংস খাবার কথা বলছে ওয়েস্ট।
ওরা দুজনে বসে ছুরি দিয়ে সিংহটার মৃতদেহ কেটে পেট ভরে মাংস খেল এবং অনেকটা মাংস কেটে সঙ্গে নিয়ে নিল। মাংস খেয়ে কিছুটা গায়ে বল পেল ওরা।
সন্ধ্যার দিকে ওয়েস্ট হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে ওরমানকে কি দেখাল। ওরমান তা দেখে বলল, ও হচ্ছে ঈয়াদ নামে সেই আরবটা। কিন্তু ওর সঙ্গে ত দলের অন্য কেউ নেই। ও এক জায়গায় আগুন জ্বালিয়ে একা বসে আছে তার পাশে।
