কামুড়ি রঙ্গুলাকে বলল, কিন্তু আমাদের কোন খাদ্য বা পানীয় দিয়ে এভাবে শুকিয়ে রাখলে তাতে কি লাভ হবে তাদের?
কামুড়ির কথার কোন জবাব না দিয়ে রঙ্গুলা তাদের যোদ্ধাদের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা একটা লোককে ডেকে ওবরস্কির পাশে দাঁড়াতে বলল। দেখল ওবরস্কি তার থেকেও লম্বা এবং তার পেশীগুলো সত্যিই বেশ বলিষ্ঠ আর সুগঠিত।
কামুড়ি আর ওবরস্কিকে আবার সেই ঘরটার মধ্যে নিয়ে যাওয়া হলো। এবার আর তাদের পাগুলো বাঁধা হলো না। রঙ্গুলার নির্দেশে একটা আদিবাসী মেয়ে তাদের জল আর খাবার দিয়ে গেল।
এইভাবে এক সপ্তাহ কেটে গেল। তারপর একদিন রাত্রিবেলায় কামুড়ির একজন বন্দী লোককে তিন চারজন যোদ্ধা এসে তাকে সর্দারের ঘরের সামনে নিয়ে গেল। গ্রামবাসীরা ঢোলের তালে তালে উল্লাস করতে লাগল। সেই উল্লাসের মাঝে এক সময় এক তীক্ষ্ণ কণ্ঠের আর্ত চীৎকার শুনতে পেল ওবরস্কি।
কামুড়ি বলল, সব শেষ।
পরদিন রাতে আবার একজন বন্দীকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করল ওরা।
তৃতীয় দিন কামুড়ি বলল, আজ আমার পালা। আজ রাতে তোমাকে একা থাকতে হবে মালিক।
কিন্তু রাত্রি হতেই কামুড়ি আর ওবরস্কি দু’জনকেই নিয়ে যাওয়া হলো সর্দারের বাড়ির সামনে সেই বধ্যভূমিতে। ওবরস্কির সামনে কামুড়িকে নির্মম নিপীড়নের মাধ্যমে ধীরে ধীরে হত্যা করা হলো। কিন্তু সেদিন ওবরস্কিকে হত্যা করা হলো না। কামুড়িকে হত্যা করার পর ওবরস্কিকে আবার সেই ঘরে এনে রাখা হলো।
এদিকে টারজান দূর থেকে রঙ্গুলাদের গাঁ থেকে পর পর তিন রাত ঢাক-ঢোলের আওয়াজ, নাচ গানের শব্দ শুনতে পেয়েছে।
আজ রাতে আবার বানসুটোদের গাঁ থেকে দমদম নাচের বাজনার শব্দ শুনতে পেল। কি মনে হতে সেই গাঁয়ের দিকে গাছের ডালে ডালে এগোতে লাগল টারজান। জাদ-বাল-জা তখন তার সঙ্গে ছিল না।
গাঁয়ের কাছে গিয়ে টারজান দেখল গায়ের সর্দারের ঘরের সামনে নাচের আসর বসেছে। জ্বলন্ত আগুনের আলোয় দেখতে পেল তারই মত অনেকটা দেখতে বলিষ্ঠদেহী এক শ্বেতাঙ্গ যুবককে একটা জায়গায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। একটু পরেই অর্থাৎ নাচ হয়ে গেলেই তার উপর অকথ্য পীড়ন চালিয়ে হত্যা করা হবে তাকে।
টারজান দেখল সর্দারের ঘরের আশেপাশে ও পিছনে অনেকগুলো গাছ রয়েছে। গায়ের পিছন দিক দিয়ে সে সর্দারের কুঁড়ের কাছে একটা গাছের উপরে উঠে গেল। সেখান থেকে ওদের নাচটা ভালভাবেই দেখতে পাচ্ছিল টারজান। মুখে রং মাখা যোদ্ধারা বাজনার তালে তালে নাচছিল আর মাঝে মাঝে লাফাচ্ছিল। সর্দার রঙ্গুলা এক পাশে দাঁড়িয়েছিল। বন্দী শ্বেতাঙ্গ যুবকটিকে দেখে কৌতূহল জাগল তার মনে। তার মত অনেকটা দেখতে। সে কে এবং কোথা থেকে এসেছে তা বুঝতে পারল না।
সর্দার রঙ্গুলা একটা টুলের উপর বসেছিল। সে হঠাৎ হুকুম দিল, বন্দীকে একটা গাছের সঙ্গে বেঁধে ফেল এবার।
কিন্তু ওবরস্কিকে ধরে নিয়ে যাবার জন্য যোদ্ধারা তার কাছে এলেই ওবরস্কি একজনকে তুলে এনে অন্য যোদ্ধাদের উপর সজোরে ফেলে দিল। তাতে অনেকে পড়ে গেল। রঙ্গুলা চীৎকার করে বলতে লাগল, ওকে ধরে ফেল। বেঁধে ফেল।
কিন্তু সমানে একা অনেক লোকের সঙ্গে লড়াই করে যেতে লাগল ওরস্কি। নিগ্রোযোদ্ধারা সংখ্যায় বেশি থাকায় ক্রমে তারা ওবরস্কিকে ধরে ফেলল। কিন্তু তার হাত পা বাঁধতে গেলে সে আবার ঘুষিতে বেশ কয়েকজনকে ঘায়েল করল। তবু তারা ওবরস্কিকে মাটিতে ফেলে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে গাছের উপর থেকে অতর্কিতে একটি দড়ির ফাস এসে সর্দার রঙ্গুলার গলায় আটকে গেল। তার হাত দুটোও বাধা পড়ে গেলে ফাঁসে। রঙ্গুলা ভয়ে ও বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে চীৎকার করে উঠল। তার পাশের লোকেরা কিছু বোঝার আগেই তার দেহটা আশ্চর্যজনকভাবে গাছের উপর উঠে গেল। অথচ গাছের উপর কোন লোক দেখতে পেল না তারা।
ওবরস্কি নিজেও কম আশ্চর্য হলো না।
হঠাৎ গাছের উপর থেকে এক অদৃশ্য লোকের গম্ভীর কণ্ঠস্বর শোনা গেল। রঙ্গুলাকে সে কণ্ঠস্বরে বলল, আমাকে দেখতে পাচ্ছ? দেখ আমি কে?
রঙ্গুলা ভয়ে ও যন্ত্রণায় হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, হ্যাঁ পাচ্ছি, ওয়ালাম্বে।
টারজান বলল, না, আমি ওয়ালাম্বে বা মৃত্যুর দেবতা নই। আমি তার থেকেও বড়। আমি হচ্ছি বাঁদরদলের টারজান। আমি যেকোন সময়ে মৃত্যু এনে দিতে পারি। যে কোন লোকের মৃত্যু ঘটাতে পারি।
রঙ্গুলা তেমনি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, কি চাও তুমি? কি করবে আমাকে নিয়ে?
টারজান বলল, আমি নিজেকে দুভাগে ভাগ করে আর একটি মানুষকে আমার মত করে তাকে পাঠিয়েছিলাম তোমাদের কাছে। তোমরা তার সঙ্গে কেমন ব্যবহার করো তা দেখতে চেয়েছিলাম। আমি দেখলাম সে তোমার কোন ক্ষতি না করলেও তোমরা তাকে বিনা কারণে হত্যা করো, তার সঙ্গে নিষ্ঠুর ব্যবহার করো। এজন্য তোমাকে মরতে হবে।
রঙ্গুলা বলল, তুমি গাছের উপর এখানে রয়েছ, আবার গাছের তলাতেও রয়েছ। তুমি তাহলে দানব। তোমাকে খাদ্য, পানীয়, অস্ত্রশন্ত্র এবং মেয়ে দিয়ে সন্তুষ্ট করব। তুমি আমাকে মেরো না।
টারজান বলল, তোমার জীবনের একটা মূল্য ছাড়া আর আমি কিছুই চাই না।
রঙ্গুলা ভয়ে ভয়ে বলল, সেটা কি মালিক?
টারজান বলল, তোমাকে কথা দিতে হবে তুমি কোন শ্বেতাঙ্গের সঙ্গে লড়াই করবে না। তোমাদের দেশে কোন শ্বেতাঙ্গ এলে বরং তাকে সাধ্যমত সাহায্য করবে।
