কামুড়ি বলল, হ্যাঁ। তবে অন্য সব নরখাদক আদিবাসীদের মত নয়। ওরা সব সময় সব মানুষ খায় বা মানুষের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ খায় না। ওরা কেবল যারা কোন না কোন দলের প্রধান বা সর্দার, যারা বীর সাহসী এবং বলবান ওরা শুধু তাদেরই হত্যা করে তাদের মাংস খায়। কারণ তাদের ধারণা তাহলে তারাও বীর, বলবান ও প্রধান হবে। আবার মৃতদেহের বাছাই করা শুধু কয়েকটা অঙ্গ খায় তারা। তারা। আমাদের হৃদপিণ্ড, হাতের তালু, পায়ের তলা, আর হাত-পায়ের পেশীগুলো খাবে।
সেদিন রাতের খাওয়া হয়ে গেলে ওরমান আর বিল ওয়েস্ট গিয়ে রোন্ডাকে বলল, তোমরা যাও, আমরা ডিশগুলো ধুয়ে নেব। জিমি আর শর্টি আমাদের সাহায্য করবে।
রাত্রি দুপুর হলে শ্বেতাঙ্গরা আরবদের ডেকে পাহারায় বসিয়ে দিয়ে শুতে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই গভীরভাবে ঘুমিয়ে পড়ল তারা।
পরদিন সকালে রোদ ওঠার পর গর্ডন মার্কাস প্রথমে উঠল। উঠেই শিবিরটার চারদিকে তাকিয়ে তার কেমন মনে হতে লাগল। শিবিরটাকে ফাঁকা ফাঁকা মনে হলো তার। আগুনের কাঠ সব নিভে গেছে। ধোয়া হচ্ছে না তাতে। তার উপর কেউ পাহারায় নেই। এরপর সে দেখল আরবরা শিবির ছেড়ে পালিয়ে গেছে। মার্কাস তখন ছুটে গিয়ে ওরমান আর ওগ্রেডির তাঁবুতে গিয়ে তাদের জাগাল। ব্যস্তভাবে বলল, আরবরা পালিয়ে গেছে। তাদের ঘোড়া, মালপত্র কিছুই নেই।
ওরমান আর ওগ্রেডি মশারির ভিতর থেকে বেরিয়ে এল। সব শুনে ওরমান বলল, মনে হচ্ছে। কয়েকঘণ্টা আগেই ওরা পালিয়েছে। যাই হোক, ওদের ছাড়াই আমাদের চলতে হবে। এখন প্রাতরাশের জন্য খাবার তৈরির জন্য মেয়েদের ডাক। জিমি আর শর্টিকেও ডেকে তোল।
মার্কাস মেয়েদের ঘরে চলে গেল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ছুটতে ছুটতে ফিরে এল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, মেয়েদের পাওয়া যাচ্ছে না। রোন্ডা, নাওমি কেউ নেই। তাদের ঘরটার সবকিছু তছনছ হয়ে আছে। আরবরা ওদের ধরে নিয়ে গেছে। ওদের চেঁচাবার সুযোগ দেয়নি। কিন্তু কেন তারা ওদের নিয়ে গেল।
ওগ্রেডি বলল, হয়তো মুক্তিপণ চায় মোটা রকমের অথবা ওদের বিক্রি করে দিতে চায় মোটা দামে।
ওরমান বলল, এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক জায়গায় মেয়ে বিক্রির বাজার আছে।
এরপর ওরমান কোথায় যাবার জন্য তার জামা-কাপড়, খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে তৈরি হতে লাগল। তা দেখে বিল ওয়েস্টও সেইভাবে যাবার জন্য তার জিনিসপত্র গোছাতে লাগল।
ওরমান তাকে বলল, কোথায় যাবে তুমি?
ওয়েস্ট বলল, আমি যাব তোমার সঙ্গে।
ওগ্রেডি বলল, তোমরা যদি মেয়েদের খোঁজ করতে যাও তাহলে আমিও তোমাদের সঙ্গে যাব।
অনেকেই যেতে চাইল। কিন্তু ওরমান বলল, না আমি একা যাব। দলবলের থেকে একজন লোক অনেক দ্রুত যেতে পারে। ওরা ঘোড়ায় গেলেও অনেক জায়গায় নামতে হবে ওদের। তার থেকে আমি হেঁটে তাড়াতাড়ি যাব। আমার অনুপস্থিতিতে সফরির ভার থাকবে ওগ্রেডির উপর।
ওগ্রেডি বলল, কিন্তু তুমি একা, ওদের ধরতে পারলেই বা কি করবে? কি করে একা লড়াই করবে?
ওরমান বলল, আমি ত লড়াই করব না। আরবরা ওদের বিক্রি করে যত টাকা পাবে আমি তাদের আরো বেশি টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে আনব।
এরপর ওরমান প্রাতরাশ খেতে খেতে বলল, ওম্বাম্বি জলপ্রপাতের কাছে তোমরা অপেক্ষা করবে আমার জন্য। সেখানে গেলে কিছু আদিবাসী ভৃত্য পাবে। দক্ষিণ দিকের পথ দিয়ে একজন লোককে জিঞ্জায় পাঠিয়ে আমাদের আমেরিকার স্টুডিওতে খবর পাঠিয়ে দেবে। যা যা ঘটেছে তা জানিয়ে দেবে। এবং এখন কি করা হবে তার নির্দেশ চাইবে।
ওরমান যাবার জন্য উদ্যত হতেই বিল ওয়েস্ট তার পিছু নিল। বলল, আমাকে যেতেই হবে। রোন্ডা কোথায় কেমন আছে তার কিছুই জানি না।
ওরমান বলল, বুঝেছি। আমি এ কথাটা ভাবিনি। তুমি আমার সঙ্গে যেতে পার।
ওরমান আর ওয়েস্ট শিবির থেকে বেরিয়ে যে পথে আরবরা ঘোড়ায় চড়ে পালিয়ে গেছে সেই পথ ধরে অদৃশ্য হয়ে গেল বনের মধ্যে।
রাত্রিশেষে নতুন দিনের আলোকে স্বাগত জানাল ওবরস্কি। কারণ এদিন মৃত্যু এসে তার বন্দীত্বের সব দুঃখ-কষ্টভভাগের অবসান ঘটাতে পারে। দড়ির শক্ত বাঁধনগুলোর জন্য তার হাতে পায়ে ব্যথা লাগছিল। তার উপর ক্ষুধা তৃষ্ণার জ্বালা। ঘরের ছোট ছোট ইঁদুরগুলো গায়ে উঠে কামড়াচ্ছিল। সারা রাত ধরে গ্রামবাসীরা নাচগান করতে থাকায় তাদের সেই ভয়ঙ্কর নাচগানের শব্দে রাতে একটুও ঘুম হয়নি ওবরস্কির। কিন্তু ওবরস্কি দেখল কামুড়ি ও তার দু’জন লোক বেশ ঘুমোচ্ছে।
সে তাদের বলল, খাবার আর জলের জন্য তোমরা চীৎকার করো।
সারারাত নাচগান করে কাটিয়ে ক্লান্ত হয়ে গ্রামবাসীরা প্রায় দুপুর পর্যন্ত ঘুমোল। তারপর মেয়েরা উঠে রান্নার কাজ করতে লাগল। কয়েকজন প্রহরী এসে বন্দীদের পায়ের বাঁধনগুলো খুলে দিয়ে তাদের সকলকে বানসুটো আদিবাসীদের সর্দার রঙ্গুলার ঘরের সামনে নিয়ে গেল। রঙ্গুলা কামুড়িকে তাদের ভাষায় কি বললে কামুড়ি ওবরস্কিকে বলল, সর্দার জিজ্ঞাসা করছে তোমরা ওদের দেশে কি করছিলে?
ওবরস্কি বলল, আমরা একটা কাজে চলে যাচ্ছিলাম। ওদের কোন ক্ষতি করিনি। আমরা বন্ধু তোমাকে ছেড়ে দিতে বল।
কামুড়ির মাধ্যমে সে কথা শুনে রঙ্গুলা বলল, সব শ্বেতাঙ্গদের মারা হবে। গতকাল তাকেও মারা হত, শুধু তোর চেহারাটা খুব বলিষ্ঠ বলে সঙ্গে সঙ্গে মারা হয়নি।
