রোন্ডা বলল, সে রান্না করবে।
ওরমান বলল, মোট তিনজন রাঁধুনির দরকার। আর কে কে রান্না করবে?
ওবরস্কি বলল, আমি সাহায্য করব রোন্ডাকে।
সবাই হেসে উড়িয়ে দিল কথাটাকে। অবশেষে ঠিক হলো রোন্ডা রান্নার কাজ করবে আর জিমি ও শর্টি তাকে সাহায্য করবে।
খাবার সময় নাওমি তার গাড়ির সীটে বসে রইল। খেতে গেল না। তাঁবু গুটিয়ে মাল বোঝাই করে সফরি রওনা হবার সময় রোন্ডা সব কাজ সেরে তার গাড়িতে গেল। সে কাগজে মোড়া গোটাকতক স্যাউউইচ নাওমিকে দিয়ে বলল, এগুলো তোমার জন্য এনেছি, তুমি খেয়ে নাও।
নাওমি ম্যাডিসন নীরবে তা খেয়ে নিল।
সফরির গতিটা খুব ধীর ছিল। শ্বেতাঙ্গরা পথ পরিষ্কারের কাজ ঠিকমত পারছিল না তারা একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল গরমে। কুড়াল দিয়ে গাছ কাটার কাজে অভ্যস্ত ছিল না তারা। পথের সামনে এখানে অনেক গাছ ছিল।
বিল ওয়েস্ট তার কপাল থেকে ঘাম ঝেড়ে বলল, পথ-প্রদর্শক না থাকায় আমরা বুঝতে পারছি না কোন্ পথে কোথায় যাচ্ছি।
যেতে যেতে ওরা বন পার হয়ে একটা ফাঁকা জায়গায় এসে পড়ল। জায়গাটা মানুষ সমান লম্বা লম্বা ঘাসে ভর্তি, একটাও গাছ নেই।
ওরমান বলল, এখানে কোন গাছ না থাকায় শত্রুরা আমাদের বিরক্ত করবে না। জোরে গাড়ি চালাও। যাত্রীরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
কিন্তু ঘাসের উপর গাড়িগুলো কিছুটা এগিয়ে যেতেই ঘাসগুলোর ভিতর থেকে আবার এক ঝাঁক তীর উড়ে এল। এবার আর লুকিয়ে রইল না শত্রুরা। বানসুটো আদিবাসীরা যুদ্ধের ধ্বনি দিতে দিতে বর্শা হাতে সামনে ছুটে এল। রাইফেলগুলো গর্জে উঠল। শ্বেতাঙ্গ যাত্রীরা সকলেই গুলি চালাতে লাগল। রোন্ডাও রিভলবার হাতে বেরিয়ে পড়ল তার গাড়ি থেকে। আদিবাসীদের অনেকেই মারা গেল। তারা দু’মিনিটের মধ্যেই আবার ঘাসগুলোর মধ্যে পালিয়ে গেল। শ্বেতাঙ্গদের দশ-বারোজন মারা গেল।
নয়েস, বেন ও সাতজন আমেরিকান আর তিনজন আরব মারা গেল। তাদের মৃতদেহগুলো একটা ট্রাকের উপর চাপানো হলো।
ওগ্রেডি ওরমানকে বলল, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে টম। শয়তানরা ঘাসগুলোতে আগুন লাগিয়ে দিতে পারে।
ওরমান আবার যাত্রা শুরু করার হুকুম দিল। ওগ্রেডি বলল, কিন্তু ওবরস্কি কোথায়? তাকে ত দেখছি না।
মার্কাস বলল, আমি দেখছি আক্রমণের সময় ও গাড়ি থেকে নেমে ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে পড়ে। আক্ৰমণটা আমাদের বাঁদিকে শুরু হওয়ায় ও ডানদিকে চলে যায়।
ওরমান নিজে ঘাসের মধ্যে ওবরস্কির খোঁজ করতে গেল। তার সঙ্গে আরো কয়েকজন খুঁজতে লাগল। কিন্তু অনেক খুঁজেও ওবরস্কিকে পাওয়া গেল না কোথাও। তার মৃতদেহও কেউ দেখতে পেল না।
যাই হোক, সফরি আবার এগিয়ে চলল। বিকালের দিকে এক জায়গায় শিবির স্থাপন করা হলো। রান্নার কাজ শেষ হলে সবাই বিষণ্ণ মুখে খাবার টেবিলে বসল।
স্ট্যানলি ওবরস্কির চেহারাটা অসাধারণভাবে বলিষ্ঠ হলেও মনে একটুও সাহস বা পৌরুষবোধ ছিল না। অথচ তাকে দেখে তা মনে হত না। কিন্তু আসলে তার মনটা ছিল দারুণ ভীরু প্রকৃতির। কিন্তু লজ্জায় সে তার ভীরুতা প্রকাশ করত না কখনো। আজও তাই বানসুটো অধিবাসীরা তাদের অকস্মাৎ আক্রমণ করলে সাহসের সঙ্গে দলের আর পাঁচজনের মত সম্মুখীন না হয়ে কোন লড়াই করে ঘাসের ভিতরে গিয়ে লুকিয়ে রইল।
একজন আদিবাসী তাকে দেখে প্রথমে ভয় পেয়ে যায়। কিন্তু পরে সে তাদের দলের লোকদের ডাকে। সে একটা ছুরি বার করে। ওবরস্কির হাতে কোন অস্ত্র ছিল না। সে তার দলের লোকদের কাছে। ছুটে পালাতেও পারল না।
ওবরস্কি তখন তার সামনের নিগ্রো আদিবাসীটিকে দু’হাত দিয়ে মাথার উপরে তুলে মাটিতে আছাড় মেরে ফেলে দিল। জীবনে আজ সে প্রথম লড়াই করল নিজের হাতে। তার দেহে এতখানি শক্তি ছিল, মনে এত সাহস ছিল তা নিজেই জানত না সে। আজ প্রথমে পরিচিত হলো তার নিজের শক্তি আর সাহসের সঙ্গে।
কয়েকজন বানসুটো আদিবাসী এসে ওবরস্কির হাত দুটো পিঠের দিকে ঘুরিয়ে বেঁধে দিল। তারপর লড়াই শেষে পালিয়ে যাবার সময় ওবরস্কিকেও হটিয়ে নিয়ে যেতে লাগল। ক্রমাগত অনেকক্ষণ ধরে পথ। চলে আদিবাসীরা বিকালের দিকে একটা গায়ে গিয়ে পৌঁছল।
ওবরস্কিকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে গাঁয়ের সব লোক, নারী, শিশু সবাই ছুটে এল। তার গায়ে থুথু দিতে লাগল আর ময়লা ফেলতে লাগল। গায়ের সর্দার এসে দর্শকদের তাড়িয়ে দিল। অবশেষে এক অন্ধকার কুঁড়ে ঘরের সামনে তার মধ্যে ঢুকে পড়তে বলল। কিন্তু দরজাটা খুব ছোট বলে ঢুকতে পারছিল না ওবরস্কি।
আদিবাসী যোদ্ধারা তাকে কোনরকমে টেনে ঢোকাল। ঘরের ভিতরটা অন্ধকার হলেও ওবরস্কি দেখতে পেল কামুড়ি আর দু’জন নিগ্রো হাত পা বাঁধা অবস্থায় বসে আছে মেঝের উপর।
ওবরস্কি সিংহমানুষের অভিনয় করার জন্য এসেছিল বলে নিগ্রোভৃত্যরা তাকে সিম্বা বলত। ওবরস্কিকে দেখেই আশ্চর্য হয়ে কামুড়ি বলল, তোমাকে কি করে ধরল বাওয়ানা সিম্বা?
ওবরস্কি বলল, তুমি তাহলে পালিয়ে এসে ভাল কাজ করনি কামুড়ি।
কামুড়ি বলল, আমাদের দলের অনেকে পথে ওদের হাতে মারা যায়। কিছু লোককে বন্দী করে এনেছে। কিছু লোক পালিয়ে যায়।
ওবরস্কি বলল, ওরা আমাদের খুন করছে না কেন?
কামুড়ি বলল, কারণ ওরা আমাদের খাবে।
ওবরস্কি বলল, তুমি কি বলতে চাও ওরা মানুষখেকো?
