প্রাতরাশের পর আবার রওনা হয়ে পড়ল ওদের সফরি। নদীটা পার হয়ে ওপারের বনভূমিতে গিয়ে পড়ল ওরা। নদীতে জল খুব কম ছিল আর তলায় পাথর থাকায় ট্রাকগুলো সহজেই পার হয়ে গেল। বানসুটোদের কোথাও চিহ্ন পাওয়া গেল না। আর কোন অশুভ ঘটনাও ঘটল না। ওদের চারপাশের বনভূমিতে কোথাও কোন জনপ্রাণী আছে বলে মনে হল না। ক্রমে দুপুর হয়ে গেল। দলের সবার মনে সাহস ফিরে এল।
সহসা অতর্কিতে এক ঝাঁক তীর ছুটে এল। দু’জন নিগ্রোভৃত্য মারা গেল সঙ্গে সঙ্গে। মেজর হোয়াইট ওরমানের পাশে এক সঙ্গে পথ হাঁটছিল। তার বুকেও একটা তীর এসে লাগলে সে তীরটা বুক থেকে জোর করে তুলে ওরমানের পায়ের তলায় লুটিয়ে পড়ল। শ্বেতাঙ্গ যাত্রীরা রাইফেল হাতে ছোটাছুটি করে বনটা তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগল। সকলেই ট্রাক থেকে নেমে পড়ল।
পরদিন আবার যাত্রা শুরু করল ওরা। কামুড়ির লোকরাও রয়ে গেল। একটা ট্রাকের উপর মৃতদেহ চাপানো হলো। এরপর যেখানে শিবির স্থাপন করা হবে সেখানে কবর দেয়া হবে। বিক্ষুব্ধ নিগ্রোভৃত্যরা রাগের সঙ্গে রাস্তা পরিষ্কার করে যেতে লাগল। আরবরা যথারীতি দলের পিছনে রইল। আজ সকাল থেকেই ওরমানের হাতে চাবুক ছিল না। আজ সে ভালভাবে কথা বলছিল নিগ্রোভৃত্যদের সঙ্গে। তাদের মনে সাহস সঞ্চার করার চেষ্টা করছিল। সে বলল, আগামীকালই আমরা এ অঞ্চল থেকে বেরিয়ে যাব।
সারাদিন আর কোন ঘটনা ঘটল না। কিন্তু বিকালের দিকে আবার এক জায়গায় শিবির স্থাপন করার আগে কিন্তু আবার কয়েকটা তীর এসে বিদ্ধ করল তিনজনকে। তিনজন নিগ্রো মারা গেল। আর একটা তীর ওরমানের মাথার উপর দিয়ে যাবার সময় তার শিরস্ত্রাণটা ফেলে দিল। অল্পের জন্য বেঁচে গেল সে।
তখনো সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসেনি ওদের শিবিরে। সামান্য যে একটু আলো ছিল তাতে রোন্ডা তার ঘরে টেবিলে বসে কি লিখছিল একা একা। একটু দূর থেকে আতুই নামে আরবটা লক্ষ্য করছিল তাকে। হঠাৎ মার্কাস এসে রোন্ডার সামনে বসে তাকে বলল, কবিতা লিখছ নাকি?
রোন্ডা বলল, দৈনন্দিন ডায়েরী লেখার কাজটা সেরে রাখছি।
মার্কাস বলল, এ ডায়েরীর মধ্যে থাকবে বহু দুঃখজনক ঘটনার সকরুণ কাহিনী।
রোন্ডা বলল, ঘটনাক্রমে এই ম্যাপটা সেদিন আমার ব্যাগের মধ্যে পেয়ে যাই। সেদিন একটা দৃশ্যে আমার ছবি তোলার সময় এটা পাই।
ম্যাপটা খুলে রোন্ডা যখন মার্কাসকে দেখাচ্ছিল তখন আতুই আরো কাছে এসে কুটিল চোখে তা দেখল।
মার্কাস বলল, ওটা তোমার কাছেই রেখে দাও। ওরা চাইলে তবে দেবে। ওরা কি এই ম্যাপটা স্টুডিওতে তৈরি করে?
রোন্ডা বলল, না। জো একটা দোকান থেকে একটা পুরনো বই কিনে তার মধ্যে এটা পায়। এই মানচিত্রটাকে কেন্দ্র করেই ও কাহিনীর পটভূমি রচনা করেছে। ব্যাপারটা বেশ মজার নয়? লোকের মনে হবে এই ম্যাপটা দেখে হীরক দেশের উপত্যকায় যাওয়া সহজ হবে।
রোন্ডা ম্যাপটা এবার গুটিয়ে ভাঁজ করে তার ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখল। আতুই সেটা লক্ষ্য করল।
মার্কাস বলল, অন্ধকার ঘন হয়ে উঠলেই কবর দেয়া হবে।
সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হয়ে উঠলেই কবর দেয়ার কাজটা সারা হয়ে গেল। ম্যাডিসন বসে ভাবতে লাগল।
সে রাতে ওরমান একেবারেই ঘুমোতে পারল না। লণ্ঠনের আলোটা মিটমিট করে জ্বলছিল তার ঘরে। শেষ রাতের দিকে পাশের ঘর থেকে ওগ্রেডি তাকে লক্ষ্য করে বলল, ঘুমিয়ে পড় টম। তা না হলে তোমার মাথা গরম হয়ে যাবে।
ওরমান বলল, আমি ঘুমোতে পারছি না। আমি সারাক্ষণ হোয়াইটকে দেখতে পাচ্ছি। আমিই তাকে হত্যা করেছি। আমিই নিগ্রোদের হত্যা করেছি।
ওগ্রেডি বলল, এটা তোমার দোষ নয়। স্টুডিও কর্তৃপক্ষ তোমাকে যে কাজের ভার দিয়ে পাঠিয়েছে তুমি শুধু সেই কাজ জোরের সঙ্গে করে যাচ্ছ।
ওরমান তবু বলল, না, সব দোষ আমার। হোয়াইট বারবার আমায় নিষেধ করেছিল।
ঘুম থেকে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সন্দেহটা জেগেছিল প্রথমে বিল ওয়েস্টের মনে। সে ছুটে নিগ্রোভৃত্যদের শিবিরে চলে গেল। কামুড়ীর খোঁজ করল। বিল দেখল শিবিরে একটা নিগ্রোভৃত্যও নেই।
বিল ওয়েস্টের ডাকাডাকিতে ওরমান আর ওগ্রেডি ছুটে এল। ওরমান বিলকে বলল, প্রাতরাশের কি হলো?
বিল বলল, প্রাতরাশ এবার থেকে নিজের হাতে তোমায় তৈরি করে নিতে হবে। শিবির ছেড়ে নিগ্রোভৃত্যরা সব পালিয়েছে। আগুনটা পর্যন্ত নিভিয়ে দিয়ে গেছে। শিবিরে কোন পাহারা নেই। মনে হয় আমাদের কিছু খাদ্যদ্রব্যও নিয়ে গেছে।
ওরমান বলল, কিন্তু কখন কোন্ দিকে পালাল? কোথায় যাবে তারা?
সবাই ওরমানের মুখপানে তাকাতে লাগল। তারা দেখল ওরমান প্রথমে কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই সামলে নিল নিজেকে। সকলে তখন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল।
ওরমান নির্দেশ দিল, ট্রাকগুলো সব দেখ। ড্রাইভারদের সব বলল, মালপত্র সব ঠিক আছে কিনা। তারা দেখুক। বিন, তুমি এ কাজগুলো করো। প্যাট একজন প্রহরী বসিয়ে দাও শিবিরের সামনে। আরবরা এখনো আছে শিবিরে। প্যাট, তুমি বরং তাদের প্রহরীর কাজে লাগিয়ে দাও। তারপর সকলকে খাবার টেবিলে ডাক।
ওরমান শিবিরে একবার ঘুরে এসে খাবার টেবিলে এসে দেখল সবাই সেখানে বসে নিগ্রোদের শিবির ত্যাগের ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করছে নিজেদের মধ্যে।
ওরমান শান্তভাবে বলল, কি হয়েছে তোমরা সকলেই জান। এর জন্য কাউকে দোষারোপ করে লাভ নেই। আমাদের অবস্থা এখনো একেবারে হতাশাব্যাঞ্জক হয়নি। আমরা কোনরকমে বানসুটোদের এই এলাকা পার হতে পারলে আর কোন ভয় নেই। তখন আমরা কোন আদিবাসীদের গায়ে কিছু মালবাহক যোগাড় করব। এর মধ্যে তোমাদের সকলেই আপন আপন কাজ করে যেতে হবে। এবার হতে তোমাদের শিবির স্থাপন করতে হবে, শিবির গোটাতে হবে, মাল বোঝাই, মাল নামানো, রান্না, পথ পরিষ্কার করা, পাহারার কাজ সবই করতে হবে। এখন আমাদের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। কে রান্না করতে পারবে?
