ওরমান বলল, আমার ক্যামেরাম্যান কে হবে?
বিল ওয়েস্ট।
চমৎকার।
এছাড়া পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশজন ড্রাইভার থাকবে। জেনারেটার ট্রাক আর শব্দ যন্ত্রের ট্রাক ছাড়া থাকবে কুড়িটা ট্রাক। পাঁচটা প্রাইভেট কার যাবে যাত্রীদের নিয়ে।
স্মিথের কথা শেষ হতে ওরমান বলল, কিন্তু কবে আমরা আফ্রিকা রওনা হচ্ছি?
আজ হতে দশ দিনের মধ্যে।
শেখ আবেল বেনেম আর তার আরব অনুচরেরা দলের পিছন থেকে সব দেখছিল। তারা দেখছিল দু’শো জন নিগ্রোভূত্য কিভাবে নটন মালবোঝাই একটা ভারী ট্রাককে একটা ছোট্ট হাঁটুভোর কাদা জলে ভর্তি নদীর বুক থেকে টেনে তুলছিল। ওরমান সবকিছুর তদারক করছিল।
তার কিছুটা দূরে একটা যাত্রীগাড়ির ভিতরে দুটি মেয়ে বসেছিল আর সেই গাড়ির দরজা দিয়ে মুখ ঢুকিয়ে জেরল্ড বেন একটি মেয়েকে জিজ্ঞাসা করল, কেমন আছ নাওমি?
খুব খারাপ।
আবার জ্বর হয়েছে?
জিঞ্জা ছেড়ে আসার পর থেকে আর জ্বর হয়নি।
তবে আমার মনে হচ্ছে আমি এখনি হলিউডে চলে যাই। কিন্তু মনে হচ্ছে আর সেখানে কোনদিন যেতে পারব না। এখানেই আমায় মরতে হবে।
না, না, ভেবো না। সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিছুক্ষণ তারা নীরবে বসে মাছি তাড়াতে লাগল। আরবরা তাদের টাট্ট ঘোড়ার পিঠে চেপে সব কিছু দেখতে লাগল।
শেখ আবেল বেন তার পাশের একজন আরবকে বলল, দুটো মেয়ের মধ্যে কোন মেয়েটা হীরকদেশের রহস্য জানে তা জান?
আরবটা বলল, মেয়ে দুটো দেখতে একরকম।
শেখ বলল, ওদের একজনের কাছে কাগজটা আছে এ বিষয়ে তুমি নিশ্চিত?
আরব বলল, হ্যাঁ, কাগজটা ছিল একজন বৃদ্ধ শ্বেতাঙ্গের কাছে। সেই বৃদ্ধই হলো মেয়েটার বাবা। যে শ্বেতাঙ্গ যুবকটা মুখ বাড়িয়ে কথা বলছে মেয়ে দুটোর সঙ্গে সে প্রথমে বৃদ্ধকে হত্যা করে কাগজটা হাত করার এক ষড়যন্ত্র করে। কিন্তু পরে মেয়েটা সে ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পেরে কাগজটা তার বাবার কাছ থেকে নিয়ে নেয়। বৃদ্ধ আর ঐ যুবকটা মনে ভাবছে কাগজটা হারিয়ে গেছে।
দু’শোজন নিগ্রোভৃত্য যখন ট্রাকগুলোর সঙ্গে বাঁধা মোটা মোটা দড়ি ধরে টানাটানি করছিল, টমাস ওরমান তখন একটা লম্বা চাবুক হাতে দাঁড়িয়েছিল তাদের কাছে। তার পোশাকগুলোয় কাদা লেগেছিল। তার সারা দেহে ঘাম ঝরছিল।
ওরমান তার দলবল নিয়ে হলিউড থেকে তিন মাস হলো এখানে এসেছে। কিন্তু যেখান থেকে ছবি তোলার শুরু হবে, সেই নির্দিষ্ট জায়গায় এখনো পৌঁছতে পারেনি। সবচেয়ে ভাবনার বিষয় হলো এই যে, এখানকার আদিবাসীরা তাদের পিছু নিয়েছে। তারা এখন প্রধান অন্তরায় হয়ে উঠেছে তাদের পথে।
আবার মোটরবাহিনী এগিয়ে চলল। সামনের দিকে ছিল সশস্ত্র প্রহরী আর মালবাহকরা। সহকারী পরিচালক প্যাট ওগ্রেডির উপর ভার ছিল ট্রাকগুলোর। তার হাতে কোন চাবুক ছিল না। প্যাটের পাশে ছিল মেজর হোয়াইট। হোয়াইট এক সময় প্যাট ওগ্রেডিকে বলল, সবকিছুর ভার যদি তোমার উপর থাকত তাহলে খুব ভাল হত। মন মেজাজের দিক থেকে ওরমান মোটেই এ কাজের উপযুক্ত নয়।
সফরিটা আবার ধীর গতিতে এগিয়ে চলতে লাগল। ওরমান হোয়াইটকে পাশে নিয়ে সামনের দিকে রইল। নিগ্রোভৃত্যরা কুড়াল আর ছুরি দিয়ে পথ পরিষ্কার করতে করতে যাচ্ছিল। কিছুদূর যাওয়ার পর ওরা একটা নদী পেল। ওরমান বলল, আজ এখানেই শিবির স্থাপন করব।
গাড়িগুলো সব দাঁড়িয়ে রইল। একটা গাড়ির নিচে বসে ওরমান এক বোতল স্কচ খাচ্ছিল। ম্যাডিসন তার একটা সিগারেট ধরাল। সে বনের চারদিকে তাকাচ্ছিল। দেখল নদীর ওপারেও ঘন বন। ম্যাডিসন এক সময় বলল, ফিরে চল টম তা না হলে আমরা সবাই মারা পড়ব।
ওরমান বলল, আমাকে আমার ছবি করার জন্য পাঠানো হয়েছে। যাই ঘটুক না কেন, আমাকে আমার কাজ করতেই হবে। যাও, তোমার সিংহমানুষকে তোমার মনের কথা জানাওগে।
এক সময় নিগ্রোদের সর্দার কামুড়ি ওরমানের সামনে এসে বলল, আমার লোকেরা আর তোমাদের সফরির সঙ্গে যাবে না।
ওরমান বলল, কিন্তু তোমরা সই করেছ চুক্তিপত্রে।
কামুড়ি বলল, কিন্তু আমার বানসুটোদের অঞ্চলে আসার জন্য সই করিনি। তোমরা যদি এখান থেকে ফিরে যাও তাহলে আমরা তোমাদের সঙ্গে থাকব।
ওরমান তার চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে চাবুক বার করল। বলল, আমি তোমাদের উচিৎ শিক্ষা দেব।
মেজর হোয়াইট ওরমানের কাঁধের উপর একটা হাত রেখে বলল, থাম। এতদিন আমি তোমার কোন কাজে হস্তক্ষেপ করিনি। কিন্তু এখন আমাদের সকলের জীবন বিপন্ন।
ওগ্রেডি বলল, তুমি নির্বোধের মত কাজ করছ টম। মেজর ঠিকই বলছে। কিছু মনে করো না মেজর। তুমিই এখন সবকিছুর ব্যবস্থা করো। কিভাবে আমরা এই ভয়ংকর জায়গাটা থেকে বেরিয়ে যেতে পারি তার জন্য চেষ্টা করো।
তার সহকারী ওগ্রেডি এখন তাকে আর সমর্থন করছে না দেখে চুপ করে গেল ওরমান। ওগ্রেডি মেজরকে জিজ্ঞাসা করল, এই বানসুটো অঞ্চল থেকে আমাদের বার হতে আর কদিন লাগবে।
হোয়াইট বলল, ট্রাকগুলোর জন্য পথ করে এগোতে আমাদের দেরী হয়ে যাচ্ছে। তা না হলে দু’দিনের মধ্যেই এ অঞ্চলের বাইরে গিয়ে পড়তাম। তবে এখন আমাদের দু’সপ্তাহ লাগবে, তাও যদি ভাগ্য ভাল হয়।
কামুড়ির সঙ্গে কথা বলে ফিরে এসে হোয়াইট ওগ্রেডিকে বলল, ওরা বেশি টাকা পেলে আমাদের সঙ্গে যাবে। তবে ওদের আর চাবুক মারা চলবে ন।
সকাল হবার অনেক আগেই শিবিরের সবাই জেগে উঠল। সকালে উঠেই হোয়াইট জানতে পারল কামুড়ির অধীনস্থ পঁচিশজন নিগ্রোভৃত্য রাত্রিবেলায় শিবির ছেড়ে পালিয়ে গেছে। প্রহরীদের জিজ্ঞাসা করে জানল তারা কাল শিবির ছেড়ে কখন গেছে তা ওরা দেখতেই পায়নি।
