গোলার ধাক্কায় টারজান বেশ কিছুটা দূরে ছিটকে পড়েছিল। সাঁতার কেটে বুবোনোভিচ ও ডগলাসের দিকে এগোতেই তারা তাকে সাবধান করে দিল। তাড়াতাড়ি ডুব দিয়ে সে ছুরিটা বের করল। দ্রুত হাত পা ছুঁড়ে সে হাঙরটার কাছে পৌঁছেই ছুরির এক কোপে হাঙরের পেটটা দুফালা করে ফেলল। ফলে সেটা ভ্যান ডের বসকে ছেড়ে টারজানকে আক্রমণ করল। টারজান তার বিরাট হাটাকে এড়িয়ে বারবার ছুরি চালাতে লাগল।
এমন সময় আর একটা হাঙর এসে আগেরটাকে আক্রমণ করল। সমুদ্রের জল রক্তে লাল হয়ে গেল। মুহূর্তের জন্য আক্রান্ত লোকগুলো সাময়িক স্বস্তি পেলেও গুলি-গোলা সমানেই চলতে লাগল।
টারজনের সাহায্যে বুবোনোভিচ ও ডগলাস টাকের দেহটাকে ভাঙা জাহাজের একটা বড় তক্তার উপর তুলে নিল। তার ট্রাউজারের খানিকটা ছিঁড়ে নিয়ে তাই দিয়ে টারজান ক্ষতস্থানটা বেঁধে দিল। তখনও টাকের নিঃশ্বাস পড়ছে। তবে সে সম্পূর্ণ অচেতন।
হঠাৎ একটা ভয়ঙ্কর শব্দ শোনা গেল। সকলে জাপানী জাহাজটার দিকে তাকাল। একটা বড় মাপের আগুনের শিখা বাণিজ্য-জাহাজটার মাঝখান থেকে কয়েক শ’ ফুট উপরে আকাশের দিকে উঠে গেছে। একটা ধোয়ার স্তম্ভ উঠে গেছে আরও কয়েক শ’ ফুট উপরে। পরক্ষণেই আর একটা বিস্ফোরণ ঘটল। জাহাজটা দুই ভাগে ফাঁক হয়ে সঙ্গে সঙ্গে ডুবে গেল। জ্বলন্ত তেলের মধ্যে কতকগুলো অর্ধদগ্ধ মানুষ আর্তনাদ করতে লাগল।
কয়েক মুহূর্ত প্রোয়ার জীবিত যাত্রীরা বিস্ময়বিমূঢ় হতবাক হয়ে নিঃশব্দে সে দৃশ্য দেখল। প্রথম কথা বলল রসেটি, ভাগ্যঠাকুরাণি আমার কথা শুনেছে।
জেরি বলল, আমরা ডুবে যাবার বা হাঙরের পেটে যাবার আগে ভারত মহাসাগরের মাঝখান থেকে আমাদের উদ্ধার করতে হলে তোমার ভাগ্যঠাকুরাণিকে আরও কিছু খেল দেখাতে হবে শ্রীম্প।
সঙ্গে সঙ্গে রসেটি চেঁচিয়ে বলল, ঐ দেখ ক্যাপ, তার আর এক করুণার খেলা!
কোরিও আঙুল বাড়িয়ে বলে উঠল, দেখ দেখ।
জ্বলন্ত আগুন থেকে প্রায় তিনশ’ গুজ দূরে একটা সাবমেরিন ভেসে উঠেছে! তার মাথায় ইউনিয়ন জ্যাক আঁকা।
টারজান হেসে বলল, ব্রিটিশদের এখন কেমন লাগছে সার্জেন্ট?
আমি তাদের ভালবাসি।
সাবমেরিনটা ঘুরে এসে পোয়র সব যাত্রীদেরই তুলে নিল। টারজান ও বুবোনোভিচ ভ্যান ডের বসকেই প্রথম তুলে দিল। ডেকের উপর শুইয়ে দিতেই সে মারা গেল। কোরি তার পাশে নতজানু হয়ে বসল। চোখের জল বাধা মানল না। জেরিও বসল তার পাশে।
কোরি বলল, হতভাগ্য টাক।
সাবমেরিনের দলপতি লেফ কম্যান্ডার বোল্টন প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে সব জেনে নিল। টাকের দেহটাকে নিচে না নিয়ে সমুদ্রেই তাকে সমাধি দেয়া হল। বোল্টনই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া পরিচালনা করল।
টারজান ও সিংহমানব (টারজান এ্যাণ্ড দি লায়ন ম্যান)
স্টুডিওর অফিস ঘরে বসে প্রযোজনা সমিতির সহ-সভাপতি মিল্টন স্মিথ তার সহকারীদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় ব্যস্ত ছিল। ছয়জন সহকারীর কাছে তার নতুন ছবির পরিকল্পনা সম্বন্ধে তার বক্তব্য বোঝাচ্ছিল হাত নেড়ে।
একজন সেক্রেটারি এসে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে খবর দিল, ওরমান এসে গেছেন।
এরপর ঘরের দরজা ঠেলে সেক্রেটারি ওরমানকে নিয়ে এলে স্মিথ উঠে গিয়ে তার সঙ্গে করমর্দন করল। ঘরের সকলেই তাকে অভ্যর্থনা জানাল।
স্মিথ করমর্দন করে বলল, তোমাকে দেখে খুশি হলাম ওরমান। তুমি বোর্নিও থেকে আসার পর আর তোমার দেখা পাইনি। সেখানে তুমি একটা বড় কাজ করেছ। কিন্তু তার থেকে আরো বড় একটা কাজ তোমার জন্য রেখেছি। তুমি জঙ্গলের উপর তোলা কিছু ভাল ছবি দেখেছ আশা করি।
ওরমান বলল, হ্যাঁ, দেখেছি। এখন অনেকেই জঙ্গলের উপর ছবি তৈরি করছে।
স্মিথ বলল, এই সব জঙ্গলের উপর তোলা ছবি হলিউডের পঁচিশ মাইলের মধ্যেই কোন না কোন জায়গা থেকে তোলা হয়। তার মধ্যে শুধু আফ্রিকার ছবি আর গলার স্বর জুড়ে দেয়া হয়।
ওরমান বলল, কোথায় ছবি তোলা হবে? হলিউডের আশেপাশে।
স্মিথ বলল, না স্যার। আমরা একটা দলকে আফ্রিকার জঙ্গলের গভীরে পাঠাচ্ছি। সে জঙ্গলটার নাম ইতুরি জঙ্গল। তাছাড়া এ ছবি করে তুমি বিখ্যাত হয়ে যাবে।
ওরমান বলল, এই ছবিতে বিখ্যাত হব কি না জানি না। তবে আমি আফ্রিকা কখনো যাইনি। তাই সেখানে যেতে আমার ভাল লাগবে।
স্মিথ বলল, আমরা সব ব্যাপারটা আলোচনা করে দেখছি। আমরা তাই মেজর হোয়াইটকে বসিয়ে রেখেছি। মেজর হোয়াইট, ইনিই হলেন পরিচালক ওরমান। মেজর একজন নামকরা শিকারী এবং আফ্রিকার জঙ্গলের সবকিছু পড়া বইএর পাতার মত জানা আছে ওর। ও আমাদের দলের সঙ্গে টেকনিক্যাল এ্যাডভাইজার হিসেবে যাচ্ছে। এখন বিচিত্ৰকাহিনীটা সম্বন্ধে তোমাকে কিছু বলছি। আমাদের যে কাহিনীটা জো লিখেছে তার নায়ক হলো এমনই একজন মানুষ যার আফ্রিকার জঙ্গলে জন্ম হয় এবং সে সেখানেই লালিত পালিত হয়। সে একটা সিংহের দুধ খেয়েই মানুষ হয়। সে সিংহদের মাঝেই থাকত। বড় হয়ে সে সিংহদের রাজা হয়। তারপর একটি মেয়ের সংস্পর্শে এল সে। সে জীবনে মেয়ে কখনো দেখনি। মেয়েটি একদিন একটা পুকুরে স্নান করছিল। এমন সময় সেই সিংহমানুষ তার কাছে এল। কেমন লাগছে?
ওরমান বলর, ভালই ত মনে হচ্ছে। এখন কথা হচ্ছে সেই সিংহমানুষের ভূমিকায় কে অভিনয় করবে?
স্মিথ বলল, তার নাম স্ট্যানলি ওবরস্কি। আর ওবরস্কির নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করছে নাওমি ম্যাডিসন? গর্ডন মার্কাস ম্যাডিসনের বাবার ভূমিকায় অভিনয় করছে। ভূমিকাটা হলো এক শ্বেতাঙ্গ ব্যবসায়ীর। মেজর হোয়াইট যিনি এখানে এখন বসে রয়েছেন তিনি অভিনয় করছেন এক শ্বেতাঙ্গ শিকারীর ভূমিকায়।
