জেরি টারজনের বাঁধন কেটে দিল। টারজান বলল, তুমি ঠিক সময় মতই এসে পড়েছিলে।
ঠিক সার্কাসের ঘোড়ার মত, বুবোনোভিচ বলল।
জেরি শুধাল, এখন আমাদের কি কর্তব্য?
টারজান বলল, বাকিদেরও খতম করতে হবে। এদের কোন একজনও যদি মূল ঘাঁটিতে ফিরে গিয়ে খবর দেয় তো তারাই আমাদের তাড়া করবে।
ওরা সংখ্যায় কতজন ছিল বলতে পার?
প্রায় পঁচিশ-ছাব্বিশজন। কতজনকে আমরা মেরেছি?
রসেটি জবাব দিল, যোজন; আমি শুনেছি।
মৃত জাপানীর রাইফেল ও বুলেটের বেল্টটা হাতে নিয়ে টারজান বলল, আমি গাছের উপর দিয়ে এগিয়ে সুমুখ থেকে তাদের মহড়া নেব, আর তোমরা পিছন দিক থেকে এসে গুলি করবে।
তাই হল। দু’মুখো আক্রমণের চাপে পড়ে দিশেহারা জাপানীরা কতক গুলিতে মরল, আর বাকিরা নিজেদের হাত-বোমার সাহায্যে হারাকিরি করল।
আরও ছ’সপ্তাহ পরে বিদেশী বাহিনী মেয়েকে-মোয়েকের ভাটিতে সমুদ্রের তীরে পৌঁছে গেল। অনেক ঝড়-ঝাঁপটা পেরিয়ে অবশেষে বাঞ্ছিত উপকূল। যেখানে তারা আত্মগোপন করল সেখান থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে আছে জাপানীদের একটা বিমান-বিধ্বংসী কামানের ঘাটি। কাছেই আছে। একটা আদিবাসী গ্রাম। সেই গ্রামের বুড়ো সর্দার জাপানীদের খুব ঘৃণা করে। জাপানীরা তাকে অনেক লাথি-চড় মেরেছে, সকলের সামনে তাকে মাথা নোয়াতে বাধ্য করেছে।
বুড়ো বলল, সে যাত্রা পথ বড়ই বিপদ-সংকুল। এখানকার সমুদ্রে অনেক শত্রু-জাহাজ চলাচল। করে। অস্ট্রেলিয়াও তো অনেক দূরের পথ। তবে তুমি ও তোমার বন্ধুরা যদি এই ঝুঁকি নিতে চাও, তাহলে আমি তোমাদের সাহায্য করব। এই গ্রাম থেকে কয়েক মাইল ভাঁটিতে একটা বড় পোয়া (দুদিকে ছুঁচলো মুখ দ্রুতগামী বড় জাহাজ) নদীতে লুকানো আছে। আমরাই তাতে খাবার-দাবার তুলে দেব। তবে সময় লাগবে। জাপানীরা আমাদের উপর কড়া নজর রেখেছে। মাঝে মাঝেই এ গ্রামে আসে।
একটি মাস কেটে গেল। এই এক মাসে অনেকবার তারা ধরা পড়তে পড়তে বেঁচে গেছে; স্নায়ুর অনেক চাপ সহ্য করেছে। শেষ পর্যন্ত জাহাজ বোঝাইয়ের কাজ সারা হল। এবার এক অন্ধকার অমাবস্যার রাত ও অনুকূল বাতাসের অপেক্ষা।
অবশেষে এল সেই শুভরাত্রি। জোয়ার এল। আকাশে চাঁদ নেই। তীরভূমি থেকে জোর হাওয়া বইছে। ধীরে ধীরে লগি দিয়ে ঠেলতে ঠেলতে তারা জাহাজটাকে সাগরে নিয়ে গেল। বড় ত্রিকোণ পালটা তুলে দেয়া হল। প্রথমে তাতে অল্প হাওয়া লাগল, কিন্তু বার-দরিয়ার পড়তেই জোরালো হাওয়ায় পাল ফুলে-ফেঁপে উঠল। প্রোয়া তরতর করে ছুটল।
সকাল হতেই তারা একটা ফাঁকা সমুদ্রে এসে পড়েছে-চারদিকে শুধু দূর-বিস্তার ফেনিল জলরাশি। খোলা হাওয়া বইছে; সমুদ্রও যেন ছুটে চলেছে। তারা কিলিং দ্বীপ পেরিয়ে এসেছে। একটাও শত্রু জাহাজ চোখে পড়েনি।
এবারে পড়ল। ডগলাস পাহারায় ছিল। সে এসে বলল, জল ছাড়াও একটা কিছু যেন দেখা যাচ্ছে।
সে আঙুল বারিয়ে দেখাল। সকলের দৃষ্টিই সেই দিকে ঝুঁকল। দিকচক্ররেখার ঠিক উপরে একটা কালো দাগ।
সকলেরই ভীতু দৃষ্টি সেই কালো দাগটার উপর নিবদ্ধ। অনেকক্ষণ পর্যন্ত সেটার কোন পরিবর্তন ঘটল না। টারজনের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতেই প্রথম ধরা পড়ল দিকচক্ররেখার উপরে উঠে আসা একটা জাহাজের ছবি।
কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে টারজান বলল, জাহাজটা গতি বদলেছে। আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। এবার তার পতাকাও দেখতে পাচ্ছি। নির্ঘাৎ জাপানী জাহাজ।
জেরি বলল, আমাদের সকলেরই হাতের টিপ ভাল। কিন্তু আমাদের হাতে যা অস্ত্র আছে তা দিয়ে তো একটা জাহাজকে ডুবিয়ে দেয়া যাবে না।
টারজান বলল, ওটা একটা সশস্ত্র ছোট বাণিজ্য জাহাজ। সম্ভবত ওতে আছে ২০ মি.মি. বিমান বিধ্বংসী কামান আর ৩০ ক্যালিবারের মেশিনগান।
জেরি বলল, ২০ মি.মি. কামানের রেঞ্জ মাত্র ১২০০ গজের মত। আমাদের এই সব বন্দুকের রেঞ্জ তার চাইতে বেশি। কাজেই ওরা আমাদের শেষ করবার আগে বেশ কিছু নিপকে আমরা খতম করতে পারব- অবশ্য তোমরা যদি যুদ্ধ করতে রাজী হও।
সকলেই একবাক্যে যুদ্ধে সম্মতি জানাল। সকলেরই মত, আত্মসমর্পণ করার চাইতে যুদ্ধে মৃত্যুই শ্রেয়।
বাণিজ্য-জাহাজটি দ্রুত এগিয়ে আসছে। হঠাৎ বাতাসও পড়ে গেল। প্রোয়ার ত্রি-কোণ পালটাও সে হাওয়ায় ফুলে উঠল না।
জাপানী জাহাজের একটা লাল আলোর ঝলকানি দেখা গেল। তারপরেই একটা ধোঁয়ার কুন্ডলি। মুহূর্তকাল পরে একটা গোলা এসে ফাটল তাদের বেশ কিছুটা দূরে।
রসেটি বলে উঠল, ভাগ্যঠাকুরাণি অনুকূল হাওয়া নিয়ে প্রস্তুত হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত যা ঘটার তাই ঘটল-একটা গোলা সোজা এসে প্রোয়ার উপর ফাটল। জেরি দেখল, সিংতাই-এর দেহের অর্ধেকটা পঞ্চাশ ফুট উপরে উড়ে গেল। টাক ভ্যান ডের বসের ডান পাটা ছিঁড়ে বেরিয়ে গেল। গোটা দল সাগরের জলে ছিটকে পড়ল। আর জাপানীরা আরও কাছে এসে তাদের লক্ষ্য করে মেশিনগান চালাতে লাগল। তারা তখন কেউ সাঁতরাচ্ছে, কেউ বা ভাঙা কাঠের টুকরো আঁকড়ে ধরে ভাসছে। সকলেই বুঝতে পারছে-’বিদেশী বাহিনী এখানেই ইতি।
বুবোনোভিচ ও ডগলাস ভ্যান ডের বসের অচেতন দেহটা ধরে ভাসিয়ে রেখেছে। জেরি চেষ্টা করছে মেশিনগান ও কোরির মাঝখানে থাকতে। হঠাৎ কে যেন ভ্যান ডের বসের দেহটাকে নিচের দিকে টানতে লাগল। জলের নিচে একটা শক্ত দেহ বুবোনোভিচের পায়ে লাগল। সে চেঁচিয়ে বলে উঠল, মাই গড! একটা হাঙর টাককে ধরেছে।
