কিন্তু সব মানুষেরই কি স্বাধীনতার অধিকার নেই? বুবোনোভিচ প্রশ্ন করল।
স্বাধীনতার অধিকার যারা অর্জন করে ওটা তাদের প্রাপ্য। খিস্টপূর্ব ২৩ শতাব্দীতে হান বংশের চীনা সম্রাট ওয়াং মাং-এর রাজত্বকালেই আমরা সুমাত্রার কথা প্রথম জানতে পারি। ইন্দোনেশীয় সভ্যতা তখন বেশ প্রাচীন। সেই প্রাচীন সভ্যতা এবং ওলন্দাজ শক্তি কর্তৃক এই দ্বীপটি পুরোপুরি দখলের আপেকার প্রায় দু’হাজার বছরের পরিপ্রেক্ষিতেও যদি দেখা যায় যে এ দেশের মানুষ তখনও অত্যাচারী শাসকদের হাতে ক্রীতদাস হয়েই আছে, তাহলে বলতেই হবে যে স্বাধীনতা লাভের উপযুক্ত তারা তো সর্ব রকমে স্বাধীন। আর কি তারা চায়?
বুবোনোভিচ মুচকি হেসে বলল, সহজ কথায় বলে রাখি, আমি কিন্তু কম্যুনিস্ট নই। আমার কথা হলঃ যে লক্ষ্য সম্মুখে রেখে আমরা এই যুদ্ধ করছি, মানুষের মুক্তি তার অন্যতম।
জেরি বলল, বাজে কথা। আমরা কেউ জানি না কেন আমরা যুদ্ধ করছি। শুধু জানি, জাপানীদের মারতে হবে, যুদ্ধটা শেষ করতে হবে, এবং তারপর বাড়ি ফিরতে হবে। তারপর? তারপর হয় তো, ধুরন্ধর রাজনীতিকরা আবার একটা তালগোল পাকিয়ে বসবে।
আর অসিধারীরা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পায়তাড়া কসতে থাকবে, ভ্যান ডের বস বলল।
তারপর সব চুপচাপ। কারও মুখে কথা নেই।
গোরিলাদের শিবির ছেড়ে আসার পরে এক মাস কেটে গেছে। অনেক দুঃখ-কষ্ট সইলেও বিদেশী বাহিনী কোন বড় রকমের বিপদে পড়ে নি; নিজেদের মুখ ছাড়া অন্য কোন মানুষের মুখও দেখে নি। তারপরেই নীল আকাশ থেকে বজ্র নেমে এল। টারজান জাপানীদের হাতে বন্দী হল।
আগাগোড়াই টারজান গাছের উপর দিয়ে সকলের আগে আগেই চলেছে। হঠাৎ একটা জাপানী সেনাদলকে দেখতে পেল। পথের উপর বসে তারা বিশ্রাম করছে। দলে কতজন আছে জানবার জন্য টারজান আরও নিচে নেমে এল।
টারজনের সব মনোযোগ জাপানীদের উপর নিবদ্ধ। মাথার ঠিক উপরে যে সমূহ বিপদ ঝুলছে সেদিকে তার খেয়ালই নেই। একটা প্রকাণ্ড ময়াল সাপ পাকে পাকে তার শরীরটাকে জড়িয়ে ধরল। সঙ্গে সঙ্গে তার হাতের ছুরি ঝলসে উঠল। আহত সাপটা বেদনায় ও ক্রোধে ছটফট করতে লাগল। যে ডাল ধরে সাপটা ঝুলছিল সেটাকে ছেড়ে দিল। দু’জনেই হুড়মুড় করে এসে পড়ল পথের উপরে জাপানীদের পায়ের কাছে।
জাপানীদের বেয়নেট ও তরবারির আঘাতে সাপটা পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হল। তখন টারজান তাদের হাতের মুঠোয়। সংখ্যায় তারা অনেক। এক ডজন বেয়নেট তার দিকে উদ্যত। অসহায়ভাবে সে মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে রইল। তার তীর, ধনুক ও ছুরি কেড়ে নেয়া হল।
একটি অফিসার এগিয়ে এসে পেটে লাথি মেরে বলল, কে তুমি?
কর্নেল জন ক্লেটন। রাজকীয় বিমান বাহিনী।
তুমি তো আমেরিকান; এখানে কি করছ?
টারজান জবাব দিল না।
দেখাচ্ছি মজা, বলে অফিসার জাপানী ভাষায় কি যেন নির্দেশ দিল। আর্জেন্টটি বন্দীর সামনে অর্ধেক ও পিছনে অর্ধেক সৈন্য সাজিয়ে যাত্রা করল। টারজান বুঝল, বিদেশী বাহিনী যে পথ ধরে এসেছিল তারা এখন সেই পথেই ফিরে চলেছে।
ওদিকে অনেকক্ষণ টারজানকে ফিরতে না দেখে জেরি বলল, টারজনের কোন বিপদ ঘটেছে।
রসেটি বলল, আমি কি এগিয়ে দেখব ব্যাপারটা কি? আমি তোমাদের সকলের চাইতে জোরে ছুটতে পারি।
বেশ, এগিয়ে যাও; আমরা পিছনে আসছি।
কিছুদূর এগিয়েই রসেটি অনেক মানুষের গলা শুনতে পেল। বিপদের কোন আশংকা থাকায় জাপানীরা, হেলাফেলাভাবেই এগোচ্ছে। আরও কিছুটা এগিয়ে সে বেঁটে মানুষগুলোর মাঝখানে টারজনের উন্নত দেহটা দেখতে পেল। টারজান জাপানীদের হাতে বন্দী! এযে অবিশ্বাস্য।
রসেটির মুখে সব কথা শুনে সকলেই হতাশায় ভেঙে পড়ল। অরণ্য-রাজকে হারানো যে ঘোট দলটার পক্ষে কত বড় ক্ষতি তা তারা বোঝে।
দলে কতজন জাপানী আছে রসেটি? জেরি শুধাল।
প্রায় বিশজন। আর আমরা আছি ন’জন। সেটাই যথেষ্ট ক্যাপ্টেন।
বুবোনোভিচ বলল, তাহলে এগিয়ে চল।
সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট কেজো কানেকোর নির্দেশে একজন সার্জেন্ট বন্দীর হাত পা এত বেশি মোটা দড়ি দিয়ে এমন শক্ত করে বাঁধল যে অরণ্য-রাজের বলিষ্ঠ মাংসপেশীও তাকে ছিঁড়তে অক্ষম। বাঁধাছাদা শেষ করে সে এক ধাক্কায় টারজানকে মাটিতে ফেলে দিল। একটা ঘোড়া এনে জিন পরানো হল। নিজের সঙ্গে একটা দড়ি বেঁধে তার একটা দিক বেঁধে দেয়া হল টারজনের পায়ের সঙ্গে।
কানেকো বলল, তুমি যদি আমার প্রশ্নের জবাব দাও তাহলে দড়িটা খুলে দেয়া হবে, আর ঘোড়াটাকেও চাবুক মারা হবে না। তোমরা দলে কতজন আছ, আর তারা কোথায়?
টারজান নীরব। কানেকোর মুখ রাগে লাল হয়ে উঠল। এগিয়ে গিয়ে সে টারজনের পেটে একটা লাথি কসাল।
জবাব দেবে না?
টারজান নিঃশব্দে চোখ তুলে তাকাল। দারুণ রেখে কানেকো অশ্বারোহীকে হুকুম দিল। সঙ্গে সঙ্গে তার হাতের চাবুক উদ্যত হল। একটা রাইফেলের গর্জন শোনা গেল। ঘোড়াটা পাক খেয়ে উল্টে পেড় গলে। আর একটা গুলি। সেকেন্ড লেফঃ কেজো কানেকো আর্তনাদ করে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। তারপর গুলির পর গুলি। একের পর এক জাপানী সৈন্যরা ধরাশায়ী হতে লাগল। যারা পারল উপত্যকার দিকে পালিয়ে গেল। ন’জন রাইফেলধারী উঁচু রাস্তা থেকে লাফিয়ে নেমে শিবিরে ঢুকল।
একজন আহত জাপানী তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তেই কোরি এক গুলিতে তাকে খতম করে দিল। বেয়নেট ও ছুরি হাতে ঢুকল রসেটি ও সারিনা। একটি আহত জাপানীও অবশিষ্ট রইল না।
