ডগলাস আর ডেভিস। বুবোনোভিচ চেঁচিয়ে বলল।
ঠিক। জেরি মাথা নাড়ল। একমাত্র ঐ দু’জনেরই খোঁজ পাওয়া যায়নি।
বুলেটের বেল্টটা বেঁধে রাইফেলটা হাতে নিয়ে বুবোনোভিচ বলল, চল ক্যাপ্টেন।
সূর্যের দিকে তাকিযে টারজান বলল, দ্রুত ছুটতে পারলে অন্ধকার হবার আগেই কাজ ফতে করা যাবে। কিন্তু একমাত্র তাদেরই সঙ্গে নিতে হবে যারা দ্রুত হাঁটতে পারে।
কতজন চাই? ভ্যান প্রিন্স প্রশ্ন করল।
বিশজনই যথেষ্ট। সব কিছু ঠিকমত চললে এ কাজ আমি একাই করতে পারি।
ভ্যান প্রিন্স বলল, যথেষ্ট লোকজন নিয়ে আমি নিজেই যাব তোমার সঙ্গে।
বিদেশী সেনাদলের সকলেই যাবার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু টারজান কোরি ও সারিনাকে নিষেধ করল। তারা তর্ক করল, কিন্তু টারজান কোন কথা শুনল না।
ডাক্তার রেড বলল, আরও একজনের যাওয়া উচিৎ হবে না। ক্যাপ্টেন লুকাস অসুস্থ মানুষ। এত দীর্ঘ পথ ছুটাছুটি করলে আসন্ন দক্ষিণ অভিযানে যোগ দেবার মত শরীরের অবস্থা তার থাকবে না।
জেরি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে টারজনের দিকে তাকাল। টারজান বলল, আমারও ইচ্ছা এ নিয়ে তুমি পীড়া পীড়ি করেনা জেরি।
দশ মিনিট পরে বিশজনের দলটি দ্রুত পায়ে উপত্যকার পথে হাঁটতে শুর করল। সকলের আগে টারজান ও ভ্যান প্রিন্স।
ক্যাপ্টেন তোকুজো মাৎসুয়ো লেফটেন্যান্ট হাইদিও সোকাবে সারা রাত মদ গিলেছে-মদ গিলেছে আর ঝগড়া করেছে। সৈনিকরাও কম যায়নি। মাতাল সৈনিকদের পাশবিক অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচাতে গ্রামের লোকেরা মেয়েছেলেদের নিয়ে জঙ্গলে পালিয়েছে। সুতরাং জনশূন্য গ্রামে মাতাল জাপানীদের পরাস্ত করে দুই বন্দী মার্কিন ডগলাস ও ডেভিসকে উদ্ধার করতে টারজান ও ভ্যান প্রিন্সের বিশেষ কোন অসুবিধা হল না।
দু’দিন পরে।
এখন দশজনে গড়া বিদেশী বাহিনী গোরিলাদের বিদায়-সম্ভাষণ জানিয়ে এক অজানা গন্তব্যের পথে পা বাড়াল। ডগলাস ও ডেভিস সকলেই ছোট দলটার সঙ্গে মানিয়ে নিল। ডগলাস এটার নাম দিল। ‘জাতিসংঘ।
যাত্রাপথ নির্মম, নিষ্ঠুর। হাতের ছুরি দিয়ে ভয়ংকর গভীর জঙ্গলকে কেটে কেটে পথ করে অগ্রসর হতে হচ্ছে। গভীর খাদ আর পাহাড়ি ঝর্ণা বার বার বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অনেক সময় পাহাড়ের দেওয়াল শত শত মাইল খাড়া; না আছে ধরার কিছু, না আছে পা রাখার জায়গা; অগত্যা অনেক পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে। বৃষ্টি তো লেগেই আছে- একেবারে ধারাসারে প্রচণ্ড বর্ষণ। কি পথচলা কি ঘুম, দুই কাজই করতে হচ্ছে ভিজে জামা-কাপড়ে। পায়ের জুতো ও স্যান্ডেল ছিঁড়ে আসছে।
ভ্যান প্রিন্স যে মানচিত্রটা এঁকে দিয়েছিল, জেরি, বুবোনোভিচ, রসেটি সেটাই মনোযোগ দিয়ে দেখছে।
জেরি বলল, এখানে আমরা পাহাড়টা পার হয়ে পূর্ব দিকে এসে পড়েছি- আলাহান্ পান্তজাং এর ঠিক নিচে।
রসেটি বলল, এদিকে দেখ; এই যেখানে আবার আমরা পাহাড়টা পার হব সেটা নাকি ১৭০ কিলো মিটার। যুক্তরাষ্ট্রের হিসেবে কত হয়?
তা-একশ’ পাঁচ-ছয় মাইল। ওটা বিমান পথের একটা ঘাঁটি।
আমরা গড়ে দৈনিক কতটা চলেছি? বুবোননাভিচ শুধাল।
পাঁচ মাইলও হয় কি না সন্দেহ।
রসেটি বলে উঠল, গীজ! ‘লাভলি লেডি’ হলে কুড়ি-পঁচিশ মিনিটেই আমাদের ওখানে পৌঁছে দিত। আর যেভাবে আমরা চলেছি তাতে তো এক মাস লেগে যাবে। ৬৮৫
বেশিও হতে পারে, জেরি যোগ করল।
বুবোনোভিচ বলল, যাই বল দৃশ্যটা কিন্তু চমৎকার। সুপ খেতে খেতে নিচে তাকালে কী সুন্দর যে দেখাচ্ছে।
রসেটি সায় দিয়ে বলল, তা ঠিক। দেখে তো মনেই হয় না যে এমন সুন্দর একটা দেশে যুদ্ধবিগ্রহ থাকতে পারে।
টাক ভ্যান ডে বস বলল, অথচ গত একশ’ বছরের আগে এ দেশে কেবল যুদ্ধ-বিগ্রহই চলত। ইতিহাসের আদি থেকে, হয় তো বা প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই গোটা পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জকে চষে বেড়িয়েছে একের পর এক যত যুদ্ধবাজের দল-উপস্থিত-প্রধানরা, ছোট প্রিন্সরা, ছোট রাজারা, আর সুলতানরা। ভারতবর্ষ থেকে এসেছে হিন্দুরা, এসেছে চীনারা, পর্তুগিজরা আর স্পেনিয়ার্ডরা, এসেছে। ইংরেজ ও ওলন্দাজরা, আর এখন এসেছে জাপানীরা। তারা নিয়ে এসেছে নৌবহর, সেনাদল, আর যুদ্ধ। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে কুবল খানের রাজদূতকে গ্রেফতার ও মুখমণ্ডল বিকৃত করে চীনে ফেরৎ পাঠানোর অপরাধে জাভর রাজাকে শাস্তি দিতে মহান খান সাহেব এ দেশে পাঠিয়েছিল ২০০০০০ সৈন্যসহ এক হাজার জাহাজের এক নৌবহর।
ওলন্দাজদের বিরুদ্ধে প্রায়ই অভিযোগ শোনা যায় যে, আমরা নাকি ইন্দোনেশীয়দের উপর নিষ্ঠুর অত্যাচার করি। কিন্তু তাদের নিজের দেশের সুলতানরা যে রকম চরম নিষ্ঠুরতার সঙ্গে দেশটাকে ধ্বংস করেছে, দেশের লোকজনদের ক্রীতদাস করে রেখেছে, হত্যা করেছে, সে রকমটা আমরা তো করিই নি, আমাদের আগে যারা এ দেশে এসেছে তারাও করেনি। এই সব পানাসক্ত, ইন্দ্রিয়সর্বস্ব জীবগুলো শুধুমাত্র নিজেদের খেয়াল মেটাতে নিজের প্রজাদেরই খুন করেছে। সুন্দরী নারী ও কুমারীদের নিয়ে গেছে। তাদের একজনের হারেমে নাকি ছিল চৌদ্দ হাজার মেয়ে।
গীজ! রসেটি সবিস্ময়ে শব্দটা উচ্চারণ করল।
টাক মুচকি হেসে আবার বলতে শুরু করল। ক্ষমতায় থাকলে আজও তারা তাই করত। আমাদের হাতে আসার পরেই ইন্দোনেশীয়রা পেয়েছে ক্রীতদাসত্বের কবল থেকে মুক্তির স্বাদ পেয়েছে প্রথম শান্তি, প্রথম সমৃদ্ধি। জাপানীদের এ দেশ থেকে তাড়াবার পরে তাদের স্বাধীনতা দিয়ে দেখো, এক প্রজন্মের মধ্যেই তারা যেখানে ছিল আবার সেখানেই ফিরে যাবে।
