কোরি বলল, আমি আছি।
ইতোমধ্যে দীর্ঘশ্বাস ফেলে জেরি চোখ মেলল। বারকয়েক চোখ পিটপিট করল; যেন কিছুই বিশ্বাস করতে পারছে না। জেরির মুখে হাসি ফুটল; হাত বাড়িয়ে সে কোরির হাতটা চেপে ধরল।
কোরি বলল, এবার তুমি ভাল হয়ে যাবে জেরি।
জেরি বলল, আমি তো ভাল হয়েই গেছি।
দু’জন দু’জনের দিকে তাকাল। পৃথিবীটা কী সুন্দর!
ক্যাপ্টেন ভ্যান প্রিন্স আহতদের জন্য ডুলি বানাবার কাজে ব্যস্ত ছিল। সে এসে জেরিকে শুধাল, কেমন আছ?
খুব ভাল।
যাত্রার সময় হল। জেরি কিছুতেই ডুলিতে উঠবে না; সে হেঁটেই যেতে পারবে। শেষে ডাক্তারের ধমক খেয়ে ভুলিতে চাপল।
চারদিকে চোখ বুলিয়ে ভ্যান প্রিন্স বলল, টারজান কোথায়?
বুবোনোভিচ বলল, ঠিকই তো। কোথায় সে?
রসেটি বলল, গীজ, লড়াইয়ের পরে সে তো গ্রামেই ফেরেনি। কিন্তু সে তো আহতও হয়নি।
বুবোনোভিচ বলল, তার জন্য মাথা ঘামাতে হবে না। নিজের ও অন্য সকলের জন্য ঘামাবার মত মাথা তার আছে।
ভ্যান প্রিন্স বলল, ঠিক আছে আমাদের যাত্রা শুরু হোক।
উপত্যকার একেবারে মাথায় একটা চুনা পাথরের পাহাড়ের নিচে অবিরাম উৎসারিত হচ্ছে একটা ঝর্ণার জলধারা। সেখানেই অনেকগুলো গুহাও আছে। ভ্যান প্রিন্স স্থির করেছে সেখানেই একটা মোটামুটি স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি করে ম্যাক আর্থারের অধীনে মিত্রশক্তির আগমনের প্রতীক্ষায় থাকবে; আমেরিকানদের কাছেই সে সর্বপ্রথম জেনেছে ম্যাক আর্থার ক্রমশই এগিয়ে আসছে।
যে ছোট দলটা অস্ট্রেলিয়া পৌঁছতে ইচ্ছুক তাদের মধ্যে আমেরিকান, ওলন্দাজ, ইংরেজ ও ইউরেশিয়ান থাকায় গোরিলারা তাদের নাম দিয়েছে বিদেশী সেনাদল। নামটাকে আরও সার্থক করে তুলতে জেরি আরও জানিয়েছে যে বুবোনোভিচ একজন রুশ, রসেটি ইতালীয়। আর সে নিজে আধা ভারতীয়।
কোরি বলল, বেচারি বুড়ো সিং যদি আমাদের সঙ্গে থাকত তাহলে মিত্রশক্তির চার প্রধান দেশের প্রতিনিধিই সেনাদলে থাকত।
শিবিরের ঠিক মাথার উপরে একটা পাহাড়ের চূড়ায় একটি শান্ত্রীকে মোতায়েন রাখা হয়েছে। সেখান থেকে উপত্যকার বহুদূর পর্যন্ত নজর রাখা যায়। ফলে দূর থেকে কাউকে আসতে দেখে সংকেত করা। মাত্রই সকলে গুহা থেকে বেরিয়ে এসে তাকে তাড়া করতে পারে।
এই শিবিরে এসে বিদেশী সেনাদলটি বেশ নিরাপদ বোধ করছে। বেশ আরামের সঙ্গে তারা দিন কাটাতে লাগল।
টারজান প্রায়ই সুলুক-সন্ধান জানতে বেরিয়ে পড়ে। কখনও বা শিকারে যায়। তার কৃপাতেই শিবিরের লোকদের মুখে তাজা মাংস জুটছে।
তিয়াং উমরের গ্রামে সিং তাইকে লুকিয়ে রেখে আসার পর থেকেই কোরি তাকে নিয়ে অনেক ভাবে; তার কি হয়েছে জানতে চায়। তাই টারজান স্থির করল, গোরিলাদের শিবিরে ফিরে যাবার আগে একবার গ্রামটাকে দেখে যাবে। ফলে তাকে অনেকটা পথ ঘুরে যেতে হবে; কিন্তু সময় বা দূরত্ব টারজনের কাছে কোন ব্যাপারই নয়; যখন যে কাজ সে করতে চায়, সময় অথবা দূরত্বের হিসেব না করতেই তা করে।
ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল। পথে একটা হরিণ মেরে খেয়ে রাতটা ঘুমিয়ে কাটাল। তিয়াং উমরের গ্রামের কাছে যখন পৌঁছল তখন অনেকটা বেলা হয়েছে। বন্য প্রাণীর স্বাভাবিক সতর্কতা ও সন্দেহের বশে টারজান গাছে চড়ে নিঃশব্দে এগোতে লাগল। আদিবাসীরা দৈনন্দিন কাজকর্মে ব্যস্ত।
তাকে চিনতে পেরে গ্রামবাসীরা সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে নানারকম প্রশ্ন করতে লাগল। কিন্তু টারজান তাদের কথা বুঝতে না পেরে সিংতাইয়ের খবর জানতে চাইল।
তাকে বলা হল, সে এখনও গ্রামেই আছে, তবে দিনের বেলা বাইরে আসতে সাহস পায় না। কারণ জাপানী স্কাউটরা অতর্কিতে গ্রামে ঢুকে পড়ে।
টারজানকে সিংতাই এর কাছে নিয়ে যাওয়া হল। তার আঘাত সম্পূর্ণ সেরে গেছে; বেশ সুস্থ হয়ে উঠেছে। কোরি ভাল আছে জেনে খুশিতে তার মুখটা ঝলমলিয়ে উঠল।
টারজান বলল, সিংতাই তুমি কি এখানে থাকতে চাও, না আমাদের সঙ্গে যেতে চাও? আমরা এই দ্বীপ থেকে পালাবার চেষ্টা করছি।
আমিও তোমাদের সঙ্গে যাব, সিংতাই জবাব দিল।
বেশ ভাল কথা, টারজান বলল। আমরা এখনই রওনা হব।
বিদেশী সেনাদল ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠেছে। জেরি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছে, গায়ে জোর পাচ্ছে, সেও এখান থেকে চলে যেতে চাইছে। এখন অপেক্ষা কেবল টারজনের।
পাহাড়ের চূড়া থেকে শান্ত্রী হাঁক দিল, দুটি লোক আসছে। এখনও ঠিক চিনতে পারছে না। কেমন যেন অদ্ভুত মনে হচ্ছে।
কয়েক মিনিট পরে আবার হাঁক দিলঃ প্রত্যেকের কাঁধে একটা করে বোঝা। একজন উলফঙ্গ।
নির্ঘাৎ টারজান, জেরি বলল।
সত্যি টারজান। সঙ্গে সিংতাই। শিবিরে পৌঁছে দু’জনইে কাঁধ থেকে একটা করে হরিণ মাটিতে রাখল। সুস্থদেহে সিংতাইকে দেখে কোরির সুখের সীমা নেই। আর টারজানকে পেয়ে জেরি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। বলল, তুমি এসে পড়েছ, ভালই হয়েছে। আমরা যাবার জন্য প্রস্তুত, কেবল তোমার জন্যই অপেক্ষা করে আছি।
টারজান বলল, যাবার আগে আর একটা কাজ করার আছে। উপত্যকার ভঁটিতে হুটের দলের আস্তানা দেখে এসেছি। জাপানীরা এখনও সেখানে আছে। সেখানে কাঁটাতারের বেড়ার মধ্যে দুটি বন্দীকে দেখে এসেছি। তাদের আমি চিনতে পারিনি, কিন্তু এখানে আসতে আসতে সিংতাই বলেছে, কয়েকদিন আগে দুটি আমেরিকান বন্দীকে সঙ্গে নিয়ে জাপানীরা গ্রামে এসেছিল। তারা নাকি গ্রামবাসীদের বলেছেন, কিছুদিন আগে যে বিমানটিকে তারা গুলি করে নামিয়েছিল ওরা সেই বিমানের যাত্রী।
