একজন চেঁচিয়ে বলল, ঠিক কথা। জন ক্লেটন, লর্ড গ্রেস্টোক।
আর একজন বলে উঠল, ওর কপালে ওই তো সেই কাটা দাগ; ছোটবেলায় এক গোরিলার সঙ্গে যুদ্ধে ওখানটা কেটে গিয়েছিল।
সকলে টারজানকে ঘিরে ধরল। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতে লাগল।
পরদিন সকালে প্রাতরাশের সময় ভ্যান প্রিন্স বলল, কিছু আগাম খবর পাবার ব্যবস্থা করতে হবে, অন্যথায় হয়তো আমরাই অতর্কিত আক্রমণের শিকার হয়ে পড়ব।
টারজান বলল, আমি তোমাকে আগাম সংবাদ এনে দেব। চার-পাঁচ মাইল এগিয়ে গিয়ে আমি লুকিয়ে থাকব। জাপানীদের দেখতে পেলেই তারা এখানে আসার অনেক আগে তোমাকে সে খবর পৌঁছে দেব।
কিন্তু তারা যদি তোমাকে দেখতে পায়?
দেখতে পাবে না।
টারজান এক লাফে গাছে উঠে অদৃশ্য হয়ে গেল।
ওলন্দাজটি মাথা নেড়ে বলল, ওর মত একদল সৈন্য হাতে পেলে জাপানীদের আমি এ দ্বীপ থেকেই তাড়িয়ে দিতে পারতাম।
জেরি, বুবোনোভিচ ও রসেটি গোরিলাদের আগেই অস্ত্রশস্ত্র ও হাত-বোমা নিয়ে নতুন পথে আত্মগোপন করল। ডালপালা ও দ্রাক্ষালতা দিয়ে ঘাড় ও মাথা ঢেকে তারা যেন জঙ্গলেরই একটা অংশ হয়ে গেল। মূল পথ ও তাদের মধ্যে যদি কয়েক ফুট ঝোপঝাড়ের ব্যবধান না থাকত তাহলে জাপানীরা
এগিয়ে আসতে আসতে তাদের একেবারে ঘাড়ের উপর পা দেবার আগে কিছুই বুঝতে পারত না।
অচিরেই গোরিলারাও পৌঁছে গেল এবং আত্মগোপনের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
এই সময় টারজান ফিরে এসে ভ্যান প্রিন্সকে বলল, তোমার বেঁটে বাদামী ভাইরা আসছে। এখন তারা মাইল দুয়েক দূরে, দেখে মনে হল দুটো বড় কোম্পানি। সঙ্গে হাল্কা মেশিন-গান ও ছোট কামান আছে। সেনাপতি একজন কর্নেল।
ভ্যান প্রিন্স বলল, তোমাকে ধন্যবাদ জানাবার ভাষা নেই। সঙ্গীদের দিকে ফিরে বলল, আর কোন কথা নয়। পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ মিনিটের মধ্যেই শত্রুরা এসে পড়বে। পরে টারজনের দিকে ফিরে বলল, একটা কথা স্যার; ওরা আসলে বাদামী নয়। ও শালারা হলদে পাখি।
গ্রামে যে সব গোরিলাদের রেখে যাওয়া হয়েছে তাদের দলপতি গ্রোয়েন ডি লেটেনহোভ। সে কোরিকে কোন নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বলল। কিন্তু কোরি বাধা দিয়ে বলল, প্রতিটি রাইফেলই তোমার দরকার সেনাপতি। তাছাড়া, জাপানীদের সঙ্গে আমার বোঝাপড়াটা এখনও বাকি আছে।
কিন্তু কোরি, তোমার আঘাত লাগতে পারে, মৃত্যুও ঘটতে পারে।
সে তো তোমার বা তোমার সৈন্যদের বেলায়ও ঘটতে পারে। তাহলে তো আমাদের সকলেরই লুকিয়ে পড়া উচিত।
তোমাকে নিয়ে পারা যায় না! আমারই ভুল হয়েছে। মেয়ে মানুষের সঙ্গে তর্ক করাই বৃথা।
আমাকে মেয়ে মানুষ ভেবো না। আমি একটি জীবন্ত রাইফেল। আর আমার নিশানাও অব্যর্থ।
বনের দিক থেকে একটা রাইফেলের শব্দ আসায় তাদের কথায় বাধা পড়ল।
জেরি দেখল, মূল সেনাদল এগিয়ে আসছে। সকলের সামনে উদ্যত সামুরাই তরবারি হাতে কর্নেল স্বয়ং। বাকি পথটা প্রথম কোম্পানির সৈন্যে আগাগোড়া ঠাসা। তখনই গর্জে উঠল ভ্যান প্রিন্স-এর রাইফেল। সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি এসে পড়তে লাগল বিস্মিত সৈন্যদের উপর। জেরি পর পর তিনটে হাত-বোমা ছুঁড়ল দ্বিতীয় কোম্পানিকে লক্ষ্য করে।
জাপানীরা এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে লাগল জঙ্গলের দিকে। যারা গুলি খেল তারা সারি ভেঙে পালাতে লাগল।
যারা পাগলের মত দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছুটে পালাল তাদের মধ্যে ছিল কর্নেল। তাকে পালাতে দেখে। রসেটি চেঁচিয়ে বলল, এবার আর পার পাবি না হলদে ভূড়ি। তার পিস্তলের গুলি কর্নেলকে বিদ্ধ করল।
সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল অবস্থায় বাকি জাপানীরা জঙ্গলের মধ্যে পালিয়ে গেল। মৃত ও আহতরা সেখানেই পড়ে রইল। ভ্যান প্রিন্স কয়েকজন গোরিলাকে পশ্চাৎ-রক্ষী হিসেবে মোতায়েন করল, কয়েকজনকে লাগাল শত্রুপক্ষের অস্ত্র ও গুলি-গোলা হাতাবার কাজে, আর বাকিদের লাগালে উভয় পক্ষের আহতদের গ্রামে নিয়ে যাবার কাজে।
জাপানীদের অস্ত্রশস্ত্রগুলো সংগ্রহ করতে করতেই রসেটি ও বুবোনোভিচ হঠাৎ খেয়াল হল, জেরি কোথাও নেই। ছুটে ঝোপের ভিতরে গিয়ে দেখল, রক্তাপুত দেহে জেরি চিৎ হয়ে পড়ে আছে। দু’জনই তার পাশে নতজানু হয়ে বসল।
রসেটি বলল, মরে নি; এখনও নিঃশ্বাস পড়ছে।
বুবোনোভিচ বলল, ওকে মরতে দেয়া হবে না।
সযত্নে তাকে তুলে নিয়ে দু’জন গ্রামের দিকে চলল। ওলন্দাজরা তাদের তিনজন মৃত ও পাঁচজন আহতকে বয়ে নিয়ে চলল।
নিহত ও আহতদের নিয়ে তারা গ্রামে ঢুকল। সেখানকার গোরিলারা তাদের ঘিরে দাঁড়াল। নিহতদের দেহ ঢেকে দেয়া হল, আর আহতদের শুইয়ে দেয়া হল গাছের ছায়ায়। গোরিলাদের মধ্যে একজন ছিল ডাক্তার। কিন্তু তার কাছে না আছে ওধুষ, না আছে অ্যানেস্থেটিক। তবু সে যথাসাধ্য চেষ্টা করতে লাগল। কোরি তাকে সাহায্য করল।
বুবোনোভিচ ও রসেটি জেরির পাশেই বসে ছিল। কোরিকে নিয়ে ডাক্তার সেখানে এল।
ডাক্তার পরীক্ষা করতে বসল।
কোরি শুধাল, অবস্থা কি খুবই খারাপ?
সে রকম মনে হচ্ছে না। গুলি হৃৎপিণ্ডে লাগেনি। ফুসফুসটাও বেঁচে গেছে। শিগগিরই ভাল হয়ে উঠবে। এস তো, ওকে একটু উপুড় করে শুইয়ে দি।
গরম জল দিয়ে ঘাটা ধুইয়ে দিয়ে হাল্কা করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়ে ডাক্তার বলল, একজন ওর কাছে থাক। জ্ঞান ফিরলে চুপচাপ থাকতে বলল।
