সাবধানে এগিয়ে একটা ছোট উপত্যকার মুখে এসে তারা দাঁড়িয়ে পড়ল। শ’খানেক গজ দূরেই একটা ছোট গ্রাম। সেখানে আদিবাসী ও জাপানী সৈনিকদের দেখা যাচ্ছে।
আমাদের ছেলে দুটো নিশ্চয় ওখানেই আছে, জেরি বলল।
কোরি ফিস্ ফিস্ করে বলল, ওই তো তারা। হায় ঈশ্বর! লোকটা যে ওদের খুন করবে!
তাদার হাতের তলোয়ার উদ্যত হতেই জেরির রাইফেল থেকে আগুন ছুটল; লেঃ কুমাজিরো তাদা ছিটকে পড়ল তাদেরই পায়ের কাছে এই মাত্রা যাদের মারতে সে তলোয়ার তুলেছিল। একটা জাপানী সৈনিক বন্দীদের দিকে ছুটে যেতেই কোরির গুলিতে তারও ভবলীলা সাঙ্গ হল। দু’জনের অবিরাম গুলিবর্ষণে একের পর এক সৈনিকরা ধরাশায়ী হল; গোটা গ্রাম আতংকে অভিভূত হয়ে পড়ল।
প্রথম গুলির শব্দেই টারজান ছুটে এসে তাদের পাশে দাঁড়াল। এক মুহূর্ত পরে এসে যোগ দিল ভ্যান ডের বস। যোগ হল আর একটা রাইফেল ও পিস্তল। পিস্তলটা টারজনের হাতে। সকলেই দে ছুট।
দু’জন বনের প্রান্তে ছোট দলটার কাছে যখন, পৌঁছে গেল ততক্ষণে গোলা-গুলি বন্ধ হয়ে গেছে। জাপানীরা হয় রণে ভঙ্গ দিয়েছে, নয়তো মরেছে। সাময়িকভাবে হলেও এখানকার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের। অবসান ঘটেছে।
খণ্ডযুদ্ধ নিয়ে এতক্ষণ সকলেই এত ব্যতিব্যস্ত ছিল যে কেউ কারও দিকে তাকাবার সময়ও পায়নি। এবার সকলেই পরস্পরকে দেখতে লাগল। কোরি ও টাক ভ্যান ডের বস পরস্পরের দিকে হা করে তাকিয়ে রইল। তারপরেই দুজন একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল ও কোরি! টাক!
ওলন্দাজ যুবকটিকে জড়িয়ে ধরে কোরি বলে উঠল, প্রিয়তম!
আদিবাসীদের কাছ থেকে টারজান গোরিলাদের সম্পর্কে বেশি কিছু জানতে পারেনি। তারা কেবল বলেছে, দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রায় পঁয়ষট্টি কিলোমিটার দূরে একটা আগ্নেয়গিরির পাশে তাদের একটা দল আছে। মাত্র সেইটুকু তথ্য সম্বল করেই টারজান গোরিলাদের খোঁজে বেরিয়েছে।
হাঁটতে হাঁটতে এক সময় একটা ছোট খাদের মধ্যে তাঁবু দেখতে পেল। একটি শাস্ত্রী খাদের ঠিক মুখেই দাঁড়িয়ে আছে। একজন দাড়িওয়ালা ওলন্দাজ। টারজান পঁচিশ-ত্রিশ গজের মধ্যে পৌঁছলে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, তুমি কে? এখানে কেন এসেছ?
আমি একজন ইংরেজ। তোমাদের সর্দারের সঙ্গে কথা বলতে চাই।
টারজানকে ভাল করে দেখে নিয়ে লোকটির নিচের দিকে তাকিয়ে হাঁক দিল, ডি লেটেনহোভ! একটি বুনো মানুষ তাৈমার সঙ্গে কথা বলতে চায়।
ইতোমধ্যে তিনটি লোক উপরে উঠে এল। সকলেই সশস্ত্র। মুখময় দাড়ি; দেখতে শক্ত-সমর্থ। জোড়াতালি মারা শতচ্ছিন্ন পোশাক; কিছুটা বেসামরিক, কিছুটা সামরিক, আবার কিছুটা পশুর চামড়া দিয়ে তেরি। একজনের জামার কাঁধের উপর ফার্স্ট লেফটেন্যান্টের প্রতীক দুটো তারা বসানো। সেই ডি লেটেনহোভ।
টারজনের দিকে ফিরে ডি লেটেনহোভ ইংরেজিতে শুধাল, তুমি কে? এখানে কি করছ?
আমার নাম ক্লেটন। আর-এ-এফ-এর একজন কর্নেল। আমি জানতে পেরেছি, একদল ওলন্দাজ গোরিলা এখানে আস্তানা গেড়েছে। তাদের সি,ও-র সঙ্গে কথা বলতেই আমি এখানে এসেছি।
ক্যাপ্টেন ভ্যান প্রিন্স আমাদের দলপতি। আজ সে এখানে নেই। আশা করছি কালই এসে পড়বে। তাকে তোমার কি দরকার?
এমন কিছু লোকের সঙ্গে আমি যোগাযোগ করতে চাই যারা আমাকে জাপানী ঘাঁটির অবস্থান এবং বন্ধু স্থানীয় আদিবাসীদের খবর দিতে পারবে। আমি চেষ্টা করছি, কোন রকমে উপকূলে পৌঁছে একটা জাহাজ যোগাড় করে এ দ্বীপ থেকে পালাব।
ডি লেটেনহোভ। টারজানকে নিয়ে নিচের তাঁবুতে গেল। শিবিরটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সুরক্ষিত। সামরিক কায়দায় নির্মিত একসারি খড়ড়া ঘর। একটা ঘরের সামনে উড়ছে নেদারল্যান্ডের লাল-সাদা-নীল পতাকা। বিশ-ত্রিশটি লোক নানা কাজে ব্যস্ত; অধিকাংশই রাইফেল ও পিস্তল পরিষ্কার করছে। তাদের পরনে শতচ্ছিন্ন নোংরা পোশাক, কিন্তু অস্ত্রশস্ত্রগুলো ঝকঝক করছে। টারজান বুঝল, এটা একটা সুপরিচালিত সামরিক শিবির। এদের বিশ্বাস করা চলে।
টারজান ঢুকতে সকলেই কাজ থামিয়ে তাকে দেখতে লাগল। কেউ কেউ তার সঙ্গের লোকদের নানা রকম প্রশ্ন করতে লাগল।
টারজান লেটেনহেভের দিকে ফিরে বলল, নিজেকে সনাক্ত করার মত কোন প্রমাণ আমার সঙ্গে নেই; কিন্তু আমার এমন সব বন্ধু আছে যারা আমাকে সনাক্ত করতে পারবে-তিনজন আমেরিকান ও দু’জন ওলন্দাজ বন্ধু। শেষের দু’জনকে তুমি হয়তো চেন।
কোরি ভ্যান ডের মিয়ার এবং টাক ভ্যান ডের বস। তাদের তুমি চেন?
খুব ভাল চিনি; কিন্তু তারা তো মারা গেছে।
গতকাল পর্যন্তও তারা মরে নি, টারজান বলল।
ডি লেটেনহোভ বলল, তার আগে বল তুমি সুমাত্রায় এলে কেমন করে? আর আমেরিকানরাই বা এখানে কি করছে? আমাদের এই ডেরার খবরই বা তুমি জানলে কেমন করে?
টারজান বলল, যে বোমারু বিমানটাকে গুলি করে নামানো হয়েছে আমিও সেটাতে ছিলাম। যে তিনজন জীবিত আমেরিকানের কথা বলেছি তারাও সেই বিমানে ছিল। গতকাল একটা গ্রামে গিয়ে তোমাদের এই শিবিরের একটা মোটামুটি ধারণা আমি পাই।
ডি লেটেনহোভ হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, এবার তোমাকে বিশ্বাস করলাম। কিন্তু একটা কথা জানতে বড়ই ইচ্ছা করছে; সত্যিকারের টারজনের মতই তুমি এরকম প্রায় নগ্নদেহে থাক কেন?
কারণ আমি সত্যি টারজান। তোমরা কেউ কেউ হয় তো জান যে টারজান একজন ইংরেজ, আর তার নাম ক্লেটন। আমি তো সেই নামটাই তোমাদের বলেছি।
