জেরি এক লাফে পথে নামল। খোলা ছুরিটা দু দু’বার বসিয়ে দিল তার বুকে। লোকটা বার দুই হেঁচকি তুলেই নিথর হয়ে গেল।
অপর জাপানীর দেহ থেকে কোরি তার রাইফেলটা খুলে নিল। পর পর তিনবার বেয়নেটটাকে ঢুকিয়ে দিল মৃতদেহের বুকে। জেরির দিকে তাকিয়ে বলল, আমি নিজের চোখে দেখেছি এইভাবে আমার বাবাকে ওরা খুন করেছিল। আজ আমি তৃপ্ত। আহা, আজ যদি বাবা বেঁচে থাকত!
পথের উপরকার গাছ থেকে ঝুলতে ঝুলতে টারজান হঠাৎ থেমে গেল; জমাট বরফের মত নিশ্চল হয়ে গেল। তার ঠিক আগেই গাছের ডালের উপর লতাপাতা বিছানো মঞ্চের উপর বসে আছে একটি লোক। তার মুখময় ঘন দাড়ি-গোঁফ, সঙ্গে বিস্তর অস্ত্রশস্ত্র। লোকটি শ্বেতকায়। নিশ্চয়ই সে কোন শত্রুর গমনাগমনের উপর লক্ষ্য রেখেছে।
পথ থেকে সরে গিয়ে টারজান একটা ঘুরপথে শাস্ত্রীটিকে এড়িয়ে পিছনের দিকে চলে গেল। সেখানে একটা ছোট পাহাড়ি উপত্যকার এক প্রান্তে দেখতে পেল একটা নোংরা, পুরোনো ছাউনি। জনা বিশেক লোক গাছের ছায়ায় শুয়ে আছে। একটা বোতল তাদের হাত থেকে হাতে, মুখে থেকে মুখে ঘুরছে। পুরুষদের সকলের সঙ্গেই আছে পিস্তল ও ছুরি; হাতের কাছেই একটা করে রাইফেল। দলটা সুবিধার নয়।
টারজান স্থির করল, এদের সঙ্গ যত এড়ানো যায় ততই মঙ্গল। হঠাৎ যে ডালে সে বসেছিল সেটা ভেঙে পড়ল। টারজান শ’খানেক ফুট নিচে মাটিতে পড়ে গেল। মাথায় চোট লেগে সে জ্ঞান হারাল।
জ্ঞান ফিরে এলে দেখল সে একটা গাছের নিচে শুয়ে আছে। হাত-পা বাঁধা। তাকে ঘিরে অনেক পুরুষ ও নারী বসে আছে, নয়তো দাঁড়িয়ে আছে। জ্ঞান ফিরে এসেছে বুঝতে পেরে তাদের একজন ওলন্দাজ ভাষায় কি যেন বলল। টারজান তার কথা বুঝল, কিন্তু না বোঝার ভান করে মাথা নাড়ল।
আর একজন ফরাসী ভাষায় কথা বলল। টারজান এবারও মাথা নাড়ল। যুবকটি ইংরেজিতে কিছু বলল। টারজান এবারও না বোঝার ভান করল।
তাকে নিয়ে আর বেশিক্ষণ মাথা না ঘামিয়ে লোকগুলো গাছতলার দিকে চলে গেল নতুন করে গলা ভেজাতে। রয়ে গেল শুধু একটি যুবক। সকলে বেশ কিছুটা দূরে চলে গেলে যুবকটি নিচু গলায় ইংরেজিতে বলল, তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পার। আমি নিজেও ওদের হাতে একজন বন্দী। একদল নরঘাতক ডাকাতের হাতে তুমি পড়েছ। দু’একজন ছাড়া তারা সকলেই জেল-ফেরৎ আসামী; জাপানীরা এ দ্বীপ আক্রমণ করার পরেই তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়া হয়েছে। দলের অধিকাংশ নারীও জেল-ফেরৎ আসামী। আর কিছু এসেছে সমাজে একেবারে নিচুতলা থেকে।
কি জান, এই পাহাড়ে অনেক দেশভক্ত গোরিলাও আত্মগোপন করে আছে। তারা জাপানীদের মত এই দেশদ্রোহীদের পেলেও খুন করে ফেলবে। তাদের ভয়, আমি হয়তো গোরিলাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের ধরিয়ে দেব। আসল কথা হল, তারা আমাকেও জাপানীদের হাতে তুলে দেবে। তুমি যখন অজ্ঞান হয়ে ছিল তখনই অরা এটা স্থির করেছে। তোমাকে হাতে পেলে জাপানীরা ভাল দামই দেবে।
টারজান ভাবল, তার ভাগ্য যখন স্থির হয়েই গেছে তখন আর এই যুবকটিকে মিথ্যে পরিচয় দিয়ে কি হবে।
বলল, আমি একজন ইংরেজ।
যুবকটি মুচকি হাসল। আমাকে বিশ্বাস করার জন্য ধন্যবাদ। আমার নাম টাক ভ্যান ড়ের বস। আমি একজন রিজার্ভ অফিসার।
আমার নাম ক্লেটন। তুমি এই লোকগুলোর হাত থেকে পালাতে চাও?
চাই। কিন্তু কোথায় যাব? সেই তো জাপানীদের হাতেই গিয়ে পড়ব, নয় তো বাঘের পেটে। আমাদের গোরিলাদের কোন খোঁজ যদি জানতাম তাহলে নিশ্চয় পালাবার ঝুঁকি নিতাম। কিন্তু আমি যে কিছুই জানি না।
টারজান বলল, আমার দলে আছে পাঁচজন। আমরা চেষ্টা করছি এই দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে পৌঁছতে। ভাগ্য প্রসন্ন হলে একটা জাহাজ ভাড়া করে একদিন অন্দ্রেলিয়ায় পৌঁছতে পারব।
ভ্যান ডের বস কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে মাথা তুলে বলল, আমিও আছি তোমাদের সঙ্গে। সাধ্যে যতটা কুলোয় তা আমি করব।
যত্র-তত্র চড়-থাপ্পড়, পাছায় বেয়নেটের খোঁচা, গায়ে থুথু-সব কিছু সয়ে রাগে ফুলতে ফুলতে বসেটি ও বুবোনোভিচ এক সময় একটা আদিবাসী গ্রামে পৌঁছে গেল। সেখানে জনৈক আদিবাসীর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে হাত-পা বেঁধে ঘরের কোণে দু’জনকে ঠেলে দিল।
সারা রাত ঘুম হল না। হাত-পায়ের বাঁধন শরীরে কেটে বসে গেছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। না খাদ্য, না পানীয়। রাতটা যেন অন্তহীন। তবু এক সময় রাত শেষ হল।
ঘরে ঢুকল দুটি সৈনিক। হাত-পায়ের বাঁধন কেটে দু’জনকে টেনে তুলল। দুজনই টলতে টলতে মাটিতে পড়ে গেল। হো-হো করে হাসতে হাসতে সৈনিকরা তাদের টানতে টানতে মইয়ের মাথায় নিয়ে ছেড়ে দিল। গড়াতে গড়াতে দু’জন মাটিত পড়ে গেল।
তাদা এসে তাদের পরীক্ষা করে শুধাল, আমার প্রশ্নের জবাব দিতে তোমরা রাজী?
না, বুবোনোভিচ জবাব দিল।
তাদের নিয়ে যাওয়া হল গ্রামের মাঝখানে। সৈনিক ও আদিবাসীরা তাদের ঘিরে দাঁড়াল। খোলা তলোয়ার হাতে তাদা এসে দাঁড়াল তাদের পাশে। তার হুকুমে দু’জনকে নতজানু করানো হল। তাদের মাথা দুটি এগিয়ে দেয়া হল। তাদার হাতের তলোয়ার ঝলসে উঠল।
জেরি ও কোরি সঙ্গীদের জন্য অপেক্ষা করে করে শেষ পর্যন্ত তাদের খোঁজে পথে নামল।
দু’জন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। মাঝে মাঝেই তাদের হাতে হাত ছুঁয়ে গেল। একবার কোরি কাদার মধ্যে পড়ে যাচ্ছিল, জেরি তাড়াতাড়ি তাকে জড়িয়ে ধরে ফেলল। তারপর ঘন অন্ধকারে দু’জন অনেক। কষ্টে এগোতে লাগল।
