দেখতে দেখতে বাঘটা নিস্তেজ হয়ে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। লোকটি তার উপর একটা পা রেখে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে একটা বীভৎস হুংকার ছাড়ল- গোরিলার বিজয় হুংকার।
সভ্য ও সংস্কৃতিবান এই মানুষটিকে দেখে কোরি হঠাৎ ভীষণ ভয় পেল। অন্য তিনজনের অবস্থাও তথৈবচ।
হঠাৎ জেরি লুকাস তাকে চিনতে পারল। বলে উঠল, জন ক্লেটন, লর্ড গ্রেস্টোক-গোরিলাদের টারজান।
শ্রীম্পের চোয়াল ঝুলে পড়ল। সে জানতে চাইল, এই কি সেই জনি উইসমুলার?
বুঝিবা পরিস্থিতিটাকে ঠিকমত বুঝবার জন্যই টারজান মাথাটাকে বার কয়েক ঝাঁকি দিল।
সহাস্যে কোরিকে অভ্যর্থনা জানিয়ে বলল, তাহলে শেষ পর্যন্ত ওদের হাত থেকে ছাড়া পেলে?
কোরি মাথা নাড়ল; তখনও সে ভয়ে কাঁপছে। বলল, হ্যাঁ, কাল রাতেই পালিয়েছি।
পরদিন দিনের আলো ফুটতেই পাহাড়ের উত্রাই ধরে সকলে হাঁটতে লাগল। এক জায়গায় পথটা দু’ভাগ হয়ে গেছে। টারজান সেখানে থেকে হঠাৎ একটা গাছের ডাল ধরে ঝুলে পড়ল। পরমুহূর্তেই সে উধাও। অবাক হয়ে বাকি সকলে আবার হাঁটতে শুরু করল। আগে বুবোনোভিচ, তার পিছনে রসেটি। জেরি ও কোরি চলেছে কয়েক গজ পিছনে। মোকাসিনের ফিতেটা বাঁধতে কোরি একটু থামল; জেরিও তার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। আঁকাবাঁকা পথের মোড়ে বাকি দু’জন অদৃশ্য হয়ে গেল।
উঠে দাঁড়িয়ে কোরি বলল, টারজান না থাকলে কেমন যেন অসহায় লাগে। তোমার লাগে না?….., না, তোমার, বুবোনোভিচ বা রসেটির উপরও আমার পুরো ভরসা আছে, তবু
জেরি হেসে বলল, এতো কিন্তু কিন্তু, করার কিছু নেই। আমারও তাই মনে হয়। কি জান, এখানে আমাদের সকলের অবস্থাই ডাঙ্গায় মাছের মত। কিন্তু টারজনের বেলায় তা নয়। এখানেই তাকে ভাল মানায়। সে না থাকলে আমাদের কি হত।
এই জঙ্গলে আমাদের অবস্থা হত মায়ের কোল ছাড়া ছোট শিশুর মত
হঠাৎ কান খাড়া করে জেরি বলে উঠল, শুনতে পাচ্ছ! বিচিত্র ভাষায় কর্কশ চেঁচামেচি। জাপানী! সে চেঁচিয়ে বলল। সেই দিকে ছুটে যাবার উদ্যোগ করেও সে থেমে গেল। কোনদিক সে রক্ষা করবে? দুই সহকর্মীকে, না এই মেয়েটিকে? দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সে সিদ্ধহস্ত। কোরির হাতটা চেপে ধরে তাকে টানতে টানতে পথের পাশের ঝোপঝাড়ের ভিতর দিয়ে জঙ্গলের দিকে ছুটতে লাগল। খানিকটা গিয়ে একটা ঝোপের নিচে এমনভাবে শুয়ে পড়ল যে তাদের খোঁজে কেউ এক ফুট দূর দিয়ে চলে গেলেও তাদের দু’জনকে দেখতে পাবে না।
এক ডজন সৈনিক বুবোনোভিচ ও রসেটিকে আচমকা আক্রমণ করে বেঁধে ফেলল। আত্মরক্ষার কোন সুযোগই তারা পেল না। জাপানীরা তাদের চড়-চাপড় মারল, বেয়নেট দিয়ে খোঁচা দিল। এমন সময় লেঃ তাদা তাদের কাছে ডাকল। তাদা ইংরেজি ভাষা বলতে পারে। ও কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ইউজেন-এর একটা হোটেলে কাপ-সিড ধোয়ার কাজ করত। দেখামাত্রই সে তাদের আমেরিকান। বলে চিনতে পারল। তার প্রশ্নের জবাবে প্রত্যেকেই নিজ নিজ নাম, পদবি ও ক্রমিক সংখ্যা জানিয়ে দিল।
যে বিমানটিকে আমরা গুলি করে নামিয়েছি তোমরা সেটাতেই ছিলে? তাদা প্রশ্ন করল।
যা কিছু বলা সম্ভব সবই বলেছি।
জাপানী ভাষায় তাদা একটি সৈনিককে কি যেন বলল। লোকটি এগিয়ে গিয়ে বুবোনোভিচের পেটে বেয়নেটটা ঠেকাল। তাদা বলল, এবার আমার প্রশ্নের জবাব দেবে তো?
রসেটি জবাব দিল, বলার তো কিছু নেই।
তোমাদের দলে পাঁচজন ছিল-চারটি পুরুষ ও একটি মেয়ে। বাকি তিনজন কোথায়? মেয়েটিই বা কোথায়?
আমাদের দলে ক’জন ছিল তা তো দেখতেই পাচ্ছ। আমাদের কি পাঁচজন বলে মনে হয়? না কি তুমি গুণতেই জান না? আমাদের দু’জনকে দেখে কি সুন্দরী বলে মনে হয়? না, দেখছি তোমার মাথাটি কেউ খেয়েছে তোজো।
তাদা বলল, ও, কে। কাল সকাল পর্যন্ত ভাববার সময় দিলাম। কাল সকালে হয় আমার প্রশ্নের জবাব দেবে। আর না হয় তোমাদের দুজনেরই মাথা কাটা যাবে। তাদা কোমরে ঝোলানো অফিসারদের লম্বা তলোয়ারে হাত রাখল।
দু’জনকে দলের অন্য লোকদের খোঁজে পাঠিয়ে বাকি সৈন্যদের নিয়ে তাদা বন্দীদ্বয়সহ আমাতের গ্রামের দিকে যাত্রা করল।
জেরি ও কোরি ঝোপের নিচে শুয়ে সব কথাই শুনল। দলটা যেদিক থেকে এসেছিল সেই দিকেই তাদের চলে যাবার শব্দ তারা শুনতে পেল, কিন্তু দু’জনকে যে তাদের খোঁজেই পাঠানো হয়েছে সেটা জানতে পারল না। আর ধরা পড়ার ভয় নেই ভেবে ঝোপের নিচে থেকে বেরিয়ে এসে তারা আবার পথে। পা বাড়াল।
চলতে চলতে এক সময় হঠাৎ কে যেন আসছে, বলে মেয়েটিকে টেনে নিয়ে জেরি আবার ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে পড়ল।
একটু পরেই দুটি জাপানী সৈন্য আলস্যভরে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে এল। রাইফেল দুটো ঝুলছে। তাদের পিঠের উপর।
জেরির আরও কাছে মাথাটা নিয়ে কোরি চুপি চুপি বলল, আমি বাঁদিককার লোকটিকে তাক করছি, তুমি অন্যটিকে নাও। জেরি মাথা নেড়ে ধনুক তুলল। বলল, ওদের বিশ ফুটের মধ্যে আসতে দাও। তারপর আমি এবার’ বলতেই দু’জন এক সঙ্গে তীর ছুঁড়ব।
তারা অপেক্ষা করতে লাগল। আপন মনে বক্ করতে করতে জাপানীরা এগিয়ে এল।
জাপানীরা মৃত্যু নিশানার মধ্যে এসে গেল। জেরি বলল, ‘এবার? শা করে দুটো তীর ছুটে গেল। লক্ষ্য ভেদ হল। কোরির তীরটা বিধল বুকে। জেরির তীরটা বিধল গলায়।
