এবার ক্লেটনই সব কথা সকলকে শুনিয়ে দিল। সকলেই একমত হয়ে তিয়াং উমরের গ্রামের দিকে এগিয়ে চলল।
সিংতাই-এর মুখে সব কথা শুনে তিয়াং উমর সকলকে সাদর অভ্যর্থনা জানাল। সিংতাইকে দোভাষী করে বলল, আগের দিন সকালেই ওলন্দাজ মেয়েটি ও তাদের গায়ের একটি যুবককে নিয়ে জাপানীরা গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে। কোথায় গেছে তা সে জানে না।
সিংতাই অশ্রুসিক্ত চোখে ক্লেটনকে মিনতি জানাল, কোরিকে তারা জাপানীদের হাত থেকে উদ্ধার করে দিক। আলোচনার পরে সকলেই তাতে সম্মত হল।
তারা চলেছে ধীরে ধীরে, খুব সতর্ক হয়ে। সকলের আগে ক্লেটন।
গ্রামে পৌঁছতে অন্ধকার হয়ে গেল। সকলকে অপেক্ষা করতে বলে ক্লেটন এগিয়ে গেল। গ্রামের মুখে কোন রক্ষীই নেই। সহজেই ভিতরে ঢুকে গেল। আকাশে চাঁদ নেই। তারাগুলো মেঘে ঢাকা পড়েছে। কয়েকটি ঘরে আবছা আলো জ্বলছে।
ক্লেটনের তীক্ষ্ণ নাকে যে গন্ধ এল তাতেই সে সাদা মেয়েটির অবস্থান বুঝতে পারল। দুটি জাপানীর ক্রুদ্ধ তর্জন-গর্জনও কানে এল। নিশ্চয় সেই দুই অফিসার এখনও ঝগড়া করছে।
ক্লেটন সঙ্গীদের কাছে ফিরে গেল। ফিসফিস্ করে কিছু নির্দেশ দিয়ে তাদের নিয়ে গ্রামের পিছন দিকটায় ফিরে গেল। বলল, তোমাদের ৪৫ গুলোতে যে কার্তুজ ভরা সেগুলো নিশ্চয়ই ছোঁড়া যাবে। যতক্ষণ পারবে গুলি ছুঁড়বে। আটকে গেলে সমানে পাথর ছুঁড়তে থাকবে। আর সারাক্ষণ নারকীয় চীৎকার করতে থাকবে। মোটকথা এই দিকেই সকলের মনোযোগ টেনে রাখবে। তিন মিনিটের মধ্যে কাজ শুরু করবে, আর চতুর্থ মিনিটেই এখান থেকে সরে পড়বে। বলেই সে চলে গেল।
গ্রামের উঁচু দিকটায় পৌঁছে সে অফিসারদের বাড়িটার পিছনে লুকিয়ে পড়ল। এক মিনিট পরেই অপর প্রান্তে গুলি ছোঁড়া শুরু হয়ে গেল। হৈ-চৈ চীৎকারে রাতের স্তব্ধতা ভেঙ্গে খান্খা হয়ে গেল। ক্লেটনের মুখে হাসি দেখা দিল।
এক সেকেন্ড পরেই অফিসার দু’জন হাঁক-ডাক করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সব বাড়ি থেকে সৈনিকরা ছুটল শব্দ লক্ষ্য করে। ক্লেটন ছুটে গিয়ে মই বেয়ে উপরে উঠে গেল। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মেয়েটি মাদুরে শুয়ে আছে। নিচু হয়ে তাকে কোলে তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ক্লেটন ছুটল জঙ্গলের দিকে। মেয়েটি ভয়ে সারা। এ আবার কি নতুন বিপদ!
জঙ্গলের পথে কিছুদূর চলেই ক্লেটন মেয়েটিকে নামিয়ে দিল। তার হাতে-পায়ের বাঁধন কেটে ফেলল।
ওলন্দাজ ভাষায় মেয়েটি বলল, কে তুমি?
চুপ! ক্লেটন ধমক দিল।
আরও চারজন এসে তাদের সঙ্গে যোগ দিল। অন্ধকার পথ বেয়ে তারা নিঃশব্দে এগিয়ে চলল। ইংরেজি ভাষায় চুপ’ কথাটা মেয়েটিকে কিছুটা আস্বস্ত করেছে। আর যাই হোক, এরা জাপানী নয়।
একটি ঘণ্টা তারা নীরবে পথ চলল, এবার কোরি ইংরেজিতে শুধাল, তোমরা কারা?
ক্লেটন বলল, বন্ধু। সিংতাই তোমার কথা আমাদের জানিয়েছে। তাই আমরা এসেছি।
তাহলে সিংতাই মারা যায় নি?
না; তবে মারাত্মক রকম জখম হয়েছে।
তিয়াং উমরের গ্রামে পৌঁছতে ভোর হয়ে গেল। সেখানে কিছু সময় অপেক্ষা করে খাওয়া-দাওয়া সেরে তারা আবার যাত্রা করল।
দীর্ঘ পথ হাঁটার মত অবস্থা সিংতাই-এর ছিল না; তাই তাকেও তিয়াং উমরের গ্রামে রেখে যেতে তারা বাধ্য হল।
একদিন সকালে দলের পুরুষরা সকলেই শিকারে বেরিয়ে গেল। কোরি একা বসে হরিণের চামড়া দিয়ে একটা চটি বানাতে বসল। সেই সুযোগে জনদশেক সুমাত্রাবাসী এসে কোরিকে তুলে নিয়ে গেল। তাদের কথাবার্তা থেকেই কোরি জানতে পারল, তাকে ও সিংতাইকে ধরে দেবার জন্য জাপানীরা পুরস্কার ঘোষণা করেছে।
সূর্যাস্তের পরেই শিকারীরা গুহায় ফিরল। ঘরে ঢুকতেই বুঝতে পারল, মেয়েটি নেই। কোথায় গেল?
নানা জনে নানা কথা বলতে লাগল। তাদের থামিয়ে দিয়ে ক্লেটন বলল, না, সে শিকারেও যায় নি, পালিয়েও যায় নি। একদল আদিবাসী তাকে জোর করে ধরে নিয়ে গেছে। পায়ের দাগ দেখিয়ে বলল, তারা ঐদিকে গেছে। যেমন করে হোক, মেয়েটিকে আমরা উদ্ধার করবই। রাতটা কাটিয়ে ভোরেই আমরা যাত্রা করব।
আলো ফুটে উঠতেই কোরির অপহরণকারীদের পথ ধরে তারা যাত্রা করল। আমেরিকানদের চোখে কোন পায়ের দাগ দেখা না দিলেও ইংরেজিটির অভ্যস্ত চোখে তা স্পষ্ট হয়েই ধরা দিল।
রাতের অন্ধকার নেমে আসতেই কোরির অপহরণকারীরা একটা পাহাড়ি উপত্যকার এক প্রান্তে ছাউনি ফেলল। বড় বিড়ালকে দূরে রাখতে একটা ধুনি জ্বালিয়ে সকলে সেটাকে ঘিরে বসল; শুধু একটি লোক পাহারায় রইল।
ক্লান্ত মেয়েটি বেশ কয়েক ঘণ্টা ঘুমল। যখন ঘুম ভাঙল তখন ধুনি নিভে গেছে, পাহারাদারটিও ঘুমিয়ে পড়েছে। এই সুযোগে পালাতে হবে। বাইরে তাকাল-বিপদসংকুল ঘন অন্ধকার, অন্ধকারের একটা নিরেট প্রাচীর যেন। তার মধ্যে লুকিয়ে আছে সম্ভাবিত মৃত্যু। কোরি সিদ্ধান্ত নিতে দেরী করল না।
নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল। রক্ষীটি শুয়ে আছে নেভা আগুনের ছাইয়ের পাশের সকলকে পাশ কাটিয়ে কোরি জঙ্গলে প্রবেশ করল। হোঁচট খেতে খেতে অন্ধকারে এগিয়ে চলল।
পথের উপরকার গাছের ডালে বসে লাভলি লেডি’র জীবিত যাত্রীরা বাঘের জন্য অপেক্ষা করে আছে। কতক্ষণে সে এসে চলে যাবে, তবে তারা গাছ থেকে নামতে পারবে।
গাছের উপর থেকে নিচে পথের দু’দিকের দুটো মোড় পর্যন্ত শ’খানেক ফুট পরিষ্কার দেখা যায়-যে কোন দিকেই প্রায় পঞ্চাশ ফুট করে। হঠাৎ নিঃশব্দ পায়ে দেখা দিল সেই বাঘ। আর সঙ্গে সঙ্গে উল্টোদিকে মোড়ে দেখা দিল কোরির চিকন দেহ। বাঘ ও মেয়েটি যুগপৎ দাঁড়িয়ে পড়ল-দু’জনের মধ্যে ব্যবধান একশ’ ফুটেরও কম। চাপা গর্জন করে বাঘটা সামনে পা বাড়াল। কোরি বুঝি বা ভয়ে জমে গেল। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে দেখল, একটি প্রায় উলফঙ্গ মানুষ গাছ থেকে লাফিয়ে পড়ল বাঘটার পিঠে। সঙ্গে সঙ্গে আরও তিনটি লোক খাপ-খোলা ছুরি হাতে ছুটে এল বড় বিড়ালের সঙ্গে যুদ্ধরত মানুষটির দিকে। তাদেরই একজন এস সার্জেন্ট রসেটি।
