একটা ছোট ডাল ধরে ক্লেটন একটা বড় ডালে উঠে সেখানে আশ্রয় নিল। প্যারাসুটের বাঁধন খুলে ফেলল। ইউনিফর্ম ও তলবাস ভিজে জপজপ করছে। টুপিটা আগেই কোথায় পড়ে গেছে। এবার জুতো জোড়াও খুলে ছুঁড়ে দিল। তারপর ফেলে দিল পিস্তল ও গুলি। তারপর মোজা, ট্রাউজার ও তলবাস। রইল শুধু বেল্ট ও খাপবদ্ধ ছুরিটা।
তারপর আরও উপরে উঠে সবগুলো দড়ি কেটে দিয়ে প্যারাসুটটা খুলে নিল। ভাঁজ করে বেঁধে সেটাকে কাঁধে ফেলল। ডাল থেকে ডালে ঝুলতে ঝুলতে নিচে নেমে গেল।
বিমান-দুর্ঘটনার ফলে কে যে কোথায় ছিটকে পড়ল, কে বেঁচে রইল আর কে মারা গেল, কে তার হিসাব রাখে।
বন্দী অবস্থায় লোকগুলোর সঙ্গে চলতে চলতে কোরি ভ্যান ডের মিয়ার দুটি সমস্যার কথাই ভাবতে লাগল? কেমন করে পালাবে, আর পালাতে না পারলে কেমন করে মরবে।
সকাল গড়িয়ে গেল। আকাশে ঘন মেঘ। প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে তারা পথ চলতে লাগল। পচা ঘাস পাতার গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। মাটি থেকে উঠে আসছে ভ্যাপসা মৃত্যু-বাষ্প! মেয়েটি জানে। প্রতিটি পদক্ষেপ তাকে এগিয়ে দিচ্ছে মৃত্যুর মুখে; যদি না
মাথার উপরে মোটুরের গর্জন শোনা গেল। এ রকম শব্দ তো হামেশাই শোনা যায়। জাপানীরা তো সর্বদাই উড়ে বেড়াচ্ছে। পরক্ষণেই কানে এল বিস্ফোরণের একটা কান-ফাটা শব্দ। হয়তো শত্রুপক্ষের কোন বিমানই ভেঙে পড়েছে-এ কথা ভেবে কোরি মনে মনে খুশিই হল।
ক্যাপ্টেন তোকুজো মাসুয়ো যে গ্রামে বাসা নিয়েছে সেখানে পৌঁছতে তাদের রাত হয়ে গেল। তাদের দেখেই ক্যাপ্টেন বলল, বন্দীরা কোথায়?
কোরির হাত ধরে ক্যাপ্টেনের দিকে এগিয়ে গিয়ে সোকাবে বলল, এই নিন।
আমি তোমাকে পাঠালাম একটা চীনা ও একটা সোনালী চুল ওলন্দাজ মেয়েকে আনতে আর তুমি এনে হাজির করলে একটা কালো চুল ছোকরাকে। ব্যাপারটা কি?
সোকাবে বলল, চীনাটাকে আমরা মেরে ফেলেছি। আর এটিই সেই ওলন্দাজ মেয়ে।
সোকাবে সব কথা খুলে বলল। মেয়েটির মাথার চুল তুলে নিচেকার সোনালী চুল বের করে বলল, দেখুন।
মেয়েটিকে ভাল করে দেখে মাথা নেড়ে মাৎসুয়ো বলল, ওকে আমি রেখে দিলাম।
গাছের ডালটা প্রবলভাবে নড়ে উঠতেই জেরি লুকাসের ঘুম ভেঙে গেল। বুববানোভিচ ও রসেটিরও ঘুম ভাঙল। রসেটি বলল, কথা বলো না।
চারদিকে তাকিয়ে বুবোনোভিচ বলল, তো দেখতে পাচ্ছি না।
জেরি মাথাটা বের করে উপরে তাকাল। মস্ত বড় একটা কালো জন্তু কয়েক ফুট উপরে বসে গাছটাকে দোলাচ্ছে। জেরি বলল, এবার দেখতে পাচ্ছ?
রসেটি বলল, গীজ! বাঁদর কখনও এত বড় হয় তা তো জানতাম না।
বুবোনোভিচ বলল, ওটা বাদর নয়। ওকে বলে বেঁটে পঙ্গো। কেন যে বেঁটে বলে তা তো বুঝি না। বলাতো উচিত পঙ্গো দানব।
শ্রীম্প বলে উঠল, মার্কিনী ভাষায় কথা বল।
লুকার্স, বলল, তাহলে বলি, ওটা ওরাংউটান।
মালয় ভাষায় উরাংউটান মানে বনমানুষ; কথাটা তার থেকেই এসেছে, বুবোনোভিচ যোগ করল।
শ্রীম্প শুধাল, ওটা কি মানুষ খায় অধ্যাপক বুবোনোভিচ?
না; ওরা প্রধানত শাকপাতা খায়।
ওরাংউটানটা ধীরে ধীরে সেখান থেকে প্রস্থান করল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে শ্রীম্প বলল, আরে, আমাদের ডিউক কোথায় গেল?
লুকাস বলল, তাই তো। কখন গেল খেয়াল করিনি তো।
শ্রীম্প বলল, কাল রাতে নির্ঘাত বাঘের পেটে গেছে।
বুবোনোভিচ আঙুল বাড়িয়ে বলল, ওটা তাহলে তার ভূত আসছে।
সকলেই তাকাল। রসেটি বলল, হায় পিটার! কি মানুষ রে বাবা!
গাছের ডালে ডালে ঝুলতে ঝুলতে কাঁধে একটা মরা হরিণ নিয়ে ক্লেটন এসে নামল গাছের ডালে। বলল, এই নাও প্রাতঃরাশ। লেগে যাও।
হরিণটাকে নামিয়ে ছুরি বের করে একটা বড় টুকরো সে কেটে নিল নিজের জন্য। তারপর একটু সরে গিয়ে তাতে দাঁত বসিয়ে দিল।
সিংতাই মরে নি। জাপানী বেয়নেট তার বুকে বিঁধেছিল কিন্তু কোন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে বিদীর্ণ করে নি। দু’দিন সিংতাই সেই রক্তাপুত গুহার মধ্যেই পড়ে ছিল। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে এল। প্রচুর রক্তপাত এবং খাদ্য-পানীয়ের অভাবে দুর্বল দেহে কোন রকমে টলতে টলতে এগিয়ে চলল তিয়াং উমরের গ্রামের দিকে।
ভাবতে ভাবতে পথ চলছে, এমন সময় প্রায় উলফঙ্গ একটি দৈত্য তার পথের সামনে এসে হাজির হল। দৈত্যটার দেহ ব্রোঞ্জ-কঠিন, কালো চুল, ধূসর চোখ। সিংতাই ভাবল, এখানেই তার জীবনের অবসান হবে।
গাছ থেকে লাফিয়ে নেমেই ক্লেটন ইংরেজিতে সিংতাই-এর সঙ্গে কথা বলল। সিংতাইও ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে জবাব দিল। হংকং-এ থাকতে অনেক বছর সে একটি ইংরেজ পরিবারে বাস করেছিল।
ক্লেটন জিজ্ঞাসা করল, তোমার এ অবস্থা কি করে হল?
জাপানী বাঁদরগুলো একটা বেয়নেট বসিয়ে দিয়েছিল-ঠিক এইখানে।
কেন?
সিংতাই সব ঘটনা খুলে বলল।
জাপানীরা কি কাছাকাছি আছে?
মনে তো হয় না।
তুমি যে গ্রামের দিকে চলেছ সেটা কতদূর?
আর বেশি দূর নয়-এক কিলোমিটারের মত হতে পারে।
সে গ্রামের লোকেরা কি জাপানীদের বন্ধু?
না। জাপানীদের তারা ঘৃণা করে।
ক্লেটনের সঙ্গীরা এতক্ষণে রাস্তার মোড় ঘুরে তাদের দেখতে পেল।
লুকাস বলল, দেখছ, এবারও সে ভুল করেননি।
সকলে এগিয়ে আসতেই সিংতাই সভয়ে তাদের দিকে তাকাল।
ক্লেটন বলল, ভয় নেই। এরা আমার বন্ধু-মার্কিন বৈমানিক।
মার্কিন! সিংতাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এতক্ষণে মনে হচ্ছে মিসিকে বাঁচাতে পারব।
