প্রচণ্ড বেগে বাতাস বইছে। মটরের শব্দে কানে তালা লাগছে। ফটোগ্রাফারের কানের কাছে মুখ নিয়ে ক্লেটন চীৎকার করে ক্যামেরা-সংক্রান্ত কয়েকটা প্রশ্ন করল। ফটোগ্রাফারও চীৎকার করে জবাব দিল। বি-২৪ যখন আকাশে ওড়ে তখন কথাবার্তা বলাই দায়। তবু ক্লেটন তার দরকারী তথ্যগুলো জেনে নিল।
ভোরের দিকে সুমাত্রার উত্তর-পশ্চিম ভূ-খণ্ড তাদের চোখে পড়ল। দিনটিও ফটো তোলার পক্ষে চমৎকার। মালয় উপদ্বীপের দক্ষিণ থেকে পশ্চিমে বিস্তৃত এগারো শ’ মাইল দীর্ঘ এই ভূ-খণ্ডটির মেরুদণ্ড স্বরূপ পর্বত শ্রেণীর মাথার উপর মেঘ জমেছে; কিন্তু যতদূর দৃষ্টি যায় উপকূলরেখা সম্পূর্ণ নির্মেঘ। আর তাদের কাজ তো উপকূলকে নিয়েই।
জাপানীরা নিশ্চয় তাদের আগমনের খবর রাখে না। তাই প্রায় আধ ঘন্ট ধরে তারা নির্বিঘ্নে ফটো তুলল। তার পরই বাধা এল। সে বাধা কাটিয়ে আরও নিচে নামতেই শত্রুর আক্রমণ তীব্রতর হল। কয়েকটি গোলা অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ায় বিমানটা আরও বেশ কিছুক্ষণ নির্বিঘ্নে উড়ে চলল।
পাডাং-এর কাছে তিনটি জিরো বিমান যেন সূর্যের বুক থেকে গর্জে উঠে নেমে এল তাদের উপর। বুবোনোভিচের পাল্টা আক্রমণে একটা বিমান আগুন লেগে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। অপর দুটি বিমান সরে গিয়ে বেশ কিছুটা দূর থেকে উড়তে লাগল। তার পরই আবার নেমে এসে অ্যাক-অ্যাক শব্দে গোলা ছুঁড়তে লাগল। ইঞ্জিনের মাথায় পড়ে বোমাটা ছিটকে এসে পড়ল ককপিটে। লুকাস রক্ষা পেল, কিন্তু তার সহ-পাইলটের আঘাত লাগল মুখে। পাশে বসা পর্যবেক্ষকটি তার সেটি-বেল্টটা খুলে দিয়ে টানতে টানতে তাকে ককপিটের বাইরে নিয়ে গেল প্রাথমিক সাহায্যের জন্য। কিন্তু ততক্ষণে তার মৃত্যু ঘটেছে।
ক্রমেই আক্রমণ এত তীব্র হয়ে উঠল যে, মস্ত বড় বিমানটা গোঁ-গোঁ শব্দ করতে লাগল। অগত্যা আক্রমণের হাত এড়াতে লুকাস সেটাকে চালিয়ে দিল বীরভূমির ভিতর দিকে, কারণ সে জানে যে বিমানধ্বংসী কামানগুলো বসানো আছে তটরেখা বরাবর। তাছাড়া পাহাড়ের মাথার উপরকার মেঘের আড়ালে লুকিয়ে তারা সেখান থেকে দেশের দিকে পাড়ি দিতে পারবে।
দেশ! মুক্তিযোদ্ধারা অতীতেও অনেক লম্বা পথ পাড়ি দিয়েছে। তেইশ বছর বয়সের ক্যাপ্টেন একটি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল। দ্রুত হলেও সঠিক সিদ্ধান্ত। হুকুম দিল, একমাত্র প্যারাসুট ছাড়া বিমানে আর যা কিছু আছে। কামান, গোলা, লাইফ বেল্ট-সব ফেলে দেয়া হোক। ঘাঁটিতে ফিরে যাবার সেটাই একমাত্র পথ।
যেই তারা মেঘে ঢাকা পাহাড়ের দিকে মুখ ফেরাল অমনি আক্রমণকারীরাও সেই দিকেই এগিয়ে এল। লুকাসের মতলবটা জাপানীরা নিশ্চয় বুঝতে পেরেছে। লুকাস জানে এখানকার পাহাড়ের অনেক চূড়াই বারো হাজার ফুট পর্যন্ত উঁচু। তাই সে উড়তে লাগল বিশ হাজার ফুট উঁচু দিয়ে। ধীরে ধীরে সে উচ্চতা কমাতে লাগল।
একটা পাহাড়ের ঠিক উপরে পৌঁছতেই চূড়ার উপর থেকে গর্জে উঠল কামান। লুকাসের কানে এল। একটা প্রচণ্ড শব্দ। একটা আহত জন্তুর মত বিমানটা কাত হয়ে পড়ল। লুকাস সাধ্যমত চেষ্টা করতে লাগল বিমানটাকে চালিয়ে নিতে। সংযোগ-রক্ষাকারীর সঙ্গে কথা বলতে চেষ্টা করল। কোন জবাব এল না। লোকটি মারা গেছে। সহ-পাইলটের সামনে বসে ক্লেটনও সাধ্যমত চেষ্টা করতে লাগল। পর্যবেক্ষককে ডেকে বলল, সব কিছু দেখে নাও। সকলেই যাতে লাফিয়ে পড়ে সেদিকে নজর রেখো। তারপর তুমি লাফ দিও।
পর্যবেক্ষক মুখ বাড়িয়ে দেখল, সামনের গোলন্দাজটিও মারা গেছে। বেতারে লোকটি ডেকে ফিরে গিয়ে বলল, পিছন দিকটাও উড়ে গেছে। সেই সঙ্গে বুচ ফটোগ্রাফারও হাওয়া।
লুকাস বলল, ও কে। তুমি লাফ দাও। ক্লেটনের দিকে ফিরে বলল, এবার আপনার পালা স্যার।
ক্লেটন বলল, তোমার আপত্তি না থাকলে আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব ক্যাপ্টেন।
লুকাস সঙ্গে সঙ্গে বলল, লাফ দিন।
ক্লেটন হেসে বলল, রাইট-ও!
লুকাস বলল, বোমা ছুঁড়বার জানালাটা খুলে দিয়েছি; সেদিক দিয়েই সহজ হবে। তাড়াতাড়ি করুন।
ক্লেটন জানালায় গিয়ে দাঁড়াল। বিমানটি কাত হয়ে নিচে পড়ছে। তার ইচ্ছা, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লুকাস লাফ দেয়ার আগে পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। শেষ মুহূর্ত সমাগত। বিমানটি উল্টে গেল। ক্লেটন ছিটকে পড়ে বাতাসে মিলিয়ে গেল।
অজ্ঞান অবস্থায় সে ছুটে চলল মৃত্যুর দিকে। ভারী মেঘের ভিতর দিয়ে সে চলেছে। তিনটে গর্জনমুখর ইঞ্জিন নিয়ে লাভলি লেডি’ গর্জন করতে করতে তার পাশ কাটিয়ে ছুটে গেল। মাটিতে ভেঙ্গে পড়ার আগেই সেটা জ্বলে-পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। শত্রুরা কিছুই জানতে পারবে না, কিছুই উদ্ধার করতে পারবে না।
কিছুক্ষণ পরেই ক্লেটনের জ্ঞান ফিরে এল। মেঘের স্তর পার হয়ে এখন সে পড়েছে মুষলধারা বর্ষণের মধ্যে। হয়ত সেই ঠাণ্ডা বৃষ্টির জন্যই সে বেঁচে গেল। জ্ঞান হতেই সে প্যারাসুটের দড়িটা ধরে টান দিল।
প্যারাসুটটা ফুলে উঠল। অদ্ভুতভাবে ঝুলতে লাগল তার শরীরটা। নিচে বৃষ্টিভেজা সবুজের সমুদ্র। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার শরীরটা নিচে ডালপালা ও লতার মধ্যে ছিটকে পড়ল। প্যারাসুটটা আটকে গেল। সে নিজে ঝুলতে লাগল মাটি থেকে শ’ দুই ফুট উপরে। মৃত্যু আর দূরে নয়।
একই সঙ্গে কয়েকশ গজ দূরে একটা প্রচণ্ড শব্দ হল-একটা বিস্ফোরণে আগুন জ্বলে উঠল দাউ দাউ করে। লাভলি লেডি’-র অন্তিম চিতার আগুনে জলে-ভেজা অরণ্য ঝিলমিল করতে লাগল।
