বলল, শিগগিরী কর। জাপানীরা এসে পড়েছে।
ভ্যান ডের মিয়ার উঠে দাঁড়াল। বলল, আমি যাচ্ছি ওদের সঙ্গে কথা বলতে। আমরা তো ওদের কোন ক্ষতি করি নি। হয়তো ওরা আমাদের কোন ক্ষতি করবে না।
সিংতাই বলল, ওই বাঁদর-মুখোদের তুমি চেন না।
কিন্তু আমার তো আর কিছুই করার নেই। দেখ সিংতাই, আমি যদি বিফল হই, তাহলে মিসিকে নিয়ে তুমি পালিয়ে যেয়ো। সে যেন জাপানীদের হাতে না পড়ে।
সে মই বেয়ে নেমে গেল। লুম কাম্ গেল তার সঙ্গে; দু’জনই নিরস্ত্র। কোরি ও সিংতাই ঘরের ভিতর থেকেই তাদের উপর নজর রাখল।
কানে এল সাদা মানুষটির কণ্ঠস্বর আর জাপানীদের বকবকানি। তার কিছুই তারা বুঝতে পারল না। হঠাৎ দেখতে পেল, একটা রাইফেলের কুঁদো লোক দুটির মাথার উপরে উঠল আবার হঠাৎ নেমে এল। তারা জানে, রাইফেলের মাথায় আছে বেয়নেট। কানে এল একটা আর্তনাদ। আরও রাইফেলের কুঁদো উঠল ও নামল। আর্তনাদ থেমে গেল। কানে এল শুধু অমানুষদের উচ্চ হাসি।
সিংতাই মেয়েটির হাত ধরে চলে এস’ বলে টানতে টানতে তাকে ঘরের পিছন দিক নিয়ে গেল। সেখানে একট দরজা আছে, নিচে আছে শক্ত মাটি।
সিংতাই তাকে ধরে নামাল। তারপর তাকে নিয়ে চলল গ্রামের বাইরের জঙ্গলের দিকে।
অন্ধকার নেমে আসার আগেই একটা গুহা খুঁজে পেয়ে দু’দিন সেখানেই লুকিয়ে রইল। তারপর ব্যাপারটা জানতে সিংতাই গ্রামে ফিরে গেল।
দুটি বছর কেটে গেছে। কোরি ও সিংতাই আশ্রয় পেয়েছে অনেক দূরের একটা পাহাড়ি গ্রামে। সেখানকার সর্দার তিয়েং উমর।
একদিন অন্য গ্রামের একটি লোক সেখানে এল। কোরি ও সিংতাইকে অনেক্ষণ ধরে দেখল, কিন্তু কিছু না বলেই চলে গেল। সিংতাই বলল, অবস্থা খুব খারাপ। ও গিয়ে আমাদের কথা বলে দেবে আর বাঁদর-মুখোরা চলে আসবে। তুমি বরং ছেলে সাজ, তারপর আমরা অন্য কোথাও গিয়ে লুকিয়ে পড়ি।
সিংতাই কোরির সোনালী চুলকে মাপ মত করে কেটে দিল; কলপ লাগিয়ে কালো করে দিল। ভুরুও রং করে দিল। নীল ট্রাউজার ও ঢিলে ব্লাউজে তাকে একটি আদিবাসী ছেলের মতই দেখতে লাগল। তারপর দু’জন নামল এক সীমাহীন যাত্রাপথে। নতুন আশ্রয় খুঁজে দেবার জন্য তিয়াং উমর তাদের সঙ্গে কয়েকজন গাইড দিয়ে দিল। গ্রামের অনতিদূরে একটা ছোট পাহাড়ি ঝর্ণার ধারে একটা গুহায় তারা আশ্রয় পেল। সুমাত্রার জঙ্গলে নানারকম ফল-মূল পাওয়া যায়। ঝর্ণায় মাছ পাওয়া যায়। তাছাড়া তিয়া; উমর মাঝে মাঝে তাদের জন্য মুরগি ও ডিম পাঠায়। আলাম নামে একটি যুবক সে সব নিয়ে আসে। অচিরেই তিনজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠল।
উপকূলরক্ষী ভারী কামান বসাবার উপযুক্ত জায়গার খোঁজে এবং সেখানে যাতায়াতের পথের জরিপ করতে ক্যাপ্টেন তোকুজো মাসুয়ো এবং লেফটেন্যান্ট হাইদিয়ো সোকাবে একদল সৈন্য নিয়ে হুসিনের গ্রামে এসে হাজির হল। এই হুসিনই ভ্যান ডের মিয়ার পরিবারকে ধরিয়ে দিয়েছিল। তারা সর্দার হুসিনকে জানিয়ে দিল, আপাতত এই গ্রামেই তারা ছাউনি ফেলবে। হুসিন যেন তাদের খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করে।
কোরি ও সিংতাই গুহার মুখে বসে আছে। এক সপ্তাহ আগে আলাম তাদের জন্য খাবার নিয়ে এসেছিল। তারপর আর আসেনি। তাই খাবারের অপেক্ষাতেই দু’জন বসে আছে।
কান পেতে সিংতাই বলল, কারা যেন আসছে। অনেক লোক। ভিতরে চল।
হাইদিয়ো সোকাবে সসৈন্যে গুহায় ঢুকলো। তার হাতে উদ্যত তরবারি আর সৈন্যদের হাতে বেয়নেট। অস্পষ্ট আলোয় সোকাবে দেখতে পেল একটা চীনা ও একটা স্থানীয় ছেলেকে। সোকাবে চেঁচিয়ে বলল, মেয়েটা কোথায়? এর জন্য তোমরা সব্বাই মরবে। এটাকে শেষ করে দাও।
কে যেন বলে উঠল, এটাই মেয়ে। ছেলের পোশাক পরে আছে।
সোকাবে কোরির ব্লাউজটা টেনে ছিঁড়ে ফেলল। মুখে ফুটে উঠল কুটিল হাসি। একটি সৈনিকের বেয়নেট বিল সিংতাই-এর বুকে। সৈন্যদল ফিরে চলল বন্দিনীকে নিয়ে।
গোলন্দাজ বাহিনীর সহকারী ইঞ্জিনীয়ার ব্রুকলিনের এসি সার্জেন্ট জো ‘ডাবুম বুবোনোভিচ অন্যান্য সহকর্মীদের সঙ্গে ‘লাভলি লেডি’র ডানার ছায়ায় দাঁড়িয়েছিল।
একটা জিপ এসে দাঁড়াল বি-২৪-এর ডানার নিচে। তার ভিতর থেকে বেরিয়ে এল তিন অফিসার–আর- এ-এফ কর্নেল, এ-এ-এফ কর্নেল, ও এ-এ-এফ মেজর। লাভলি লেডি’-র পাইলট ও হোমা সিটির ক্যাপ্টেন জেরি লুকাস এগিয়ে গেল; এ-এ-এফ কর্নেল তাকে পরিচয় করিয়ে দিল কর্নেল ক্লেটনের সঙ্গে।
মার্কিন কর্নেল শুধাল, সব ঠিক আছে জেরি?
সব ঠিক স্যার।
বিদ্যুৎ ও মেরামত কর্মীরা তাদের গ্যাজেট ও কামানকে শেষবারের মত পরীক্ষা করে পিছনের জা দিয়ে উঠে পড়ল, সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধযাত্রীরাও বিমানে চড়ে বসল।
আগাম পর্যবেক্ষণ ও ফটো তোলার উদ্দেশ্যে কর্নেল জন ক্লেটন একটি বিমানঘাঁটি (সেন্সর’বিমান ঘাঁটির নামটা কেটে দিয়েছে) থেকে উড়ে চলেছে নেদারল্যান্ড পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের জাপ-অধিকৃত সুমাত্রার আকাশপথে। বিমানে উঠে প্রথমে সে দাঁড়াল পাইলটের পিছনে। তারপর দীর্ঘ যাত্রা পথে কখনও বসল সহ-পাইলটের আসনে, কখনও বা পাইলটের আসনে। কথা বলল চালক ও রেডিও ইঞ্জিনীয়ারের সঙ্গে বিমানে কোথাও কোন বোমা নেই।
ফটোগ্রাফার জনৈক এস সি সার্জেন্ট হাতের ক্যামেরাটা ঠিকঠাক করছিল। সে মুখ তুলে হাসলে ক্লেটনও হাসতে হাসতে গিয়ে তার পাশে বসে পড়ল।
