ঠিক তখনি আশেয়ারের নগরদ্বারে টারজান তার দলবল নিয়ে যোদ্ধাদের হারিয়ে দিয়ে ঢুকে পড়ল প্রাসাদের মধ্যে। সে রানী আটকার কাছে সোজা চলে গিয়ে বলল, যে দুটি মেয়েকে বন্দী করে রাখা। হয়েছে তাদের ছেড়ে দাও। তা না হলে আমি কাউকে ছাড়ব না।
আটকা বলল, সত্যিই তুমি বিজয়ী। এই মুহূর্তে তাদের ছেড়ে দেয়া হবে।
মাগরা আর হেলেনকে টারজনের সামনে আনা হলে গ্রেগরি বলল, আবার আমরা পুনর্মিলিত হলাম। এখন আমরা সম্পূর্ণ নিরাপদ।
এমন সময় হেরাৎ আশেয়ারের সব যোদ্ধাকে হারিয়ে প্রাসাদের মধ্যে প্রবেশ করল বিজয়গর্বে। এই প্রথম থোবোজের এক রাজা শত্রুরাজ্য জয় করে আশেয়ারের মাটিতে পা দিল। চোন আর টারজান অভ্যর্থনা জানাল হেরাকে। ওরা যখন কথাবার্তা বলছিল তখন একদল থোবোজের যোদ্ধা আতন থোমকে টানতে টানতে ধরে আনল। বলল, এর কাছে একটা হীরের কৌটো রয়েছে।
চোন বলল, এটাই কি আসল হীরকদের পিতা?
কিন্তু সে জানত না আসল হীরের কৌটোটা হার্কুফ তার আগেই থোবোজে নিয়ে গেছে।
চোন কৌটোর ঢাকনাটা খুলতে গেলে আতন থোম বাধা দিয়ে বলল, খুলো না, ওটা আমি প্যারিসে নিয়ে বিক্রি করব। গোটা প্যারিস শহরটাকে কিনব। ওটা আমার।
ঢাকনা খুলে চোন দেখল আসলে একতাল কয়লা ভরা আছে তার মধ্যে।
এই দেখে আতন থোম নিজের বুক চাপড়াতে চাপড়াতে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু ঘটল তার।
ব্রিয়ান বলল, হায় হায়, এর জন্য এত কষ্ট ভোগ করলাম, কত লোক প্রাণ দিল। তবে আসলে কিন্তু কয়লাই হীরের পিতা।
টারজান বলল, মানুষ হলো প্রকৃতপক্ষে এক আশ্চর্য জন্তু।
টারজান ও বিদেশী দূত (টারজন এ্যাণ্ড দি ফরেন লিজিয়ন)
হয়তো হল্যান্ডের সব মানুষই জেদী নয়, যদিও অন্য অনেক গুণের সঙ্গে জেদী মানসিকতাকেও তাদের অন্যতম জাতীয় বৈশিষ্ট্য বলে গণ্য করা হয়ে থাকে। হেড্রিক ভ্যান ডের মিয়ার-এর চরিত্রে এই জেদটা পুরোপুরিই আছে। কর্মসূত্রে সে সুমাত্রার একজন রবার ব্যবসায়ী। আর ব্যবসাতে সফলও বটে।
ফিলিফিন আক্রান্ত হল। হংকং সিঙ্গাপুরের পতন ঘটল। সে কিন্তু তখনও স্বীকার করল না যে জাপানীরা নেদারল্যান্ড পূর্ব ভারতকে দখল করতে পারবে। ফলে, স্ত্রী ও কন্যাকে সে অন্যত্র সরিয়ে দিল না।
তাছাড়া হেড্রিক ভ্যান ডের মিয়ার জাপানীদের ঘৃণা করত। সে বলল, আরে দেখই না দু’দিন পরে আমরাই ওদের ঠেঙিয়ে গাছে চড়িয়ে দেব। ইতিহাস কিন্তু প্রমাণ করে দিল যে তার এই ভবিষ্যদ্বাণী একেবারেই ভুল।
জাপানীরা এসে হাজির হল। হেড্রিক ভ্যান ডের মিয়ার পাহাড়ে আশ্রয় নিল। সঙ্গে তার স্ত্রী এজে ভাঙ্কুর; আঠারো বছর আগে তাকে সে হল্যান্ড থেকে সঙ্গে করে এনেছিল; আর ছিল তার মেয়ে কোরি। দুটি চীনা চারক লুম কাম এবং সিংতাইও ওদের সঙ্গ নিল। সঙ্গ নিল দুটি কারণে-প্রথমটা জাপানী-ভীতি; তাদের হাতে যে কী হাল হবে সেটা তারা ভালই জানে; আর দ্বিতীয় কারণ, ভ্যান ডের মিয়ার পরিবারের প্রতি তাদের সত্যিকারের ভালবাসা। জাপানী রবার-শ্রমিকরা থেকেই গেল। তারা জানত, আক্রমণকারীরা রবারের ব্যবসা চালাবে, আর তাদেরও কাজ জুটবে।
যাই হোক, জাপানীরা এল, আর হেড্রিক ভ্যান ডের মিয়াররাও পাহাড়ে আশ্রয় নিল। কিন্তু কিছুটা দেরী করে ফেলল। জাপানীরা তাদের তাড়া করে ফিরতে লাগল। সব নেদারল্যান্ডবাসীদেরই তাড়া করতে লাগল।
পাহাড়ের আরও উপরে উঠতে গিয়ে ক্রমেই কষ্ট বাড়তে লাগল। রোজ বৃষ্টি হচ্ছে। পথঘাট কর্দমাক্ত। ভ্যান ডের মিয়ারের যৌবন পার হয়েছে; তবু এখনও সে কর্মক্ষম আছে। কোরির বয়স ষোল। স্বাস্থ্য, শক্তি ও পরিশ্রমের অভ্যাস তার আছে। সে দলের অন্য সকলের সঙ্গে সমান তালেই চলেছে। কিন্তু এলজে ভ্যান ডের মিয়ার কথা আলাদা। মনের বল থাকলেও দেহের বল নেই। তার উপর বিশ্রামের অভাব। একটা গ্রামে পৌঁছে কুঁড়ে ঘরের সঁাতসেঁতে মেঝেতে বসে ক্লান্ত দেহটা এলিয়ে দিয়েছে, এমন সময় আদিবাসীরা এসে খবর দিল, এই মুহূর্তে পালাতে হবে।
তিন সপ্তাহ ধরে চলল একটানা হাঁটা একটা নির্ভরযোগ্য গ্রামের সন্ধানে। এলজে ভ্যান ডের মিয়ার আর চলতে পারছে না। দুদিন কোন গ্রামের দেখা মেলেনি। বন-জঙ্গলে যা জোটে তাই একমাত্র খাদ্য। জামা-কাপড় সব সময়ই বৃষ্টিতে ভেজা।
মাঝে মাঝেই পাহাড়ি নদী। কখনও হেঁটে পার হল, কখনও বা ভঙ্গুর দড়ির ঝুলন্ত সেতু বেয়ে।
এলজে ভ্যান ডের মিয়ার আর হাঁটতে পারল না। লুম্ কাম্ তাকে পিঠে তুলে নিল। গাইডরা বার বার তাড়া দিচ্ছে তাড়াতাড়ি পথ চলতে, কারণ ইতোমধ্যেই দু’দুবার তারা বাঘের ডাক শুনেছে।
বার বার থেমে হাঁপাতে হাঁপাতে পাহাড়ের মাথায় উঠে কুকুরের ডাক শুনেই বুঝতে পারল তারা একটা গ্রামের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। গাইডদের মুখে সব কথা শুনে গ্রামের সর্দার তাকুমুদা তাদের সাদর অভ্যর্থনা জানাল।
তারা তাদর খাবার দিল; ঘুমবার জন্য শুকনো ঘর দিল। কিন্তু এজে ভ্যান ডের মিয়ার কিছুই খেতে পারল না। জ্বরে তার গা পুড়ে যাচ্ছে। হেনড্রিক ভ্যান ডের মিয়ার ও কোরি সারা রাত তার পাশে জেগে কাটাল। দুপুরের আগেই এজে ভ্যান ডের মিয়ার মারা গেল।
বাপ-মেয়েতে শুকনো চোখে পাথরের মত মৃতার পাশেই বসে রইল। এমন সময় বাইরে একটা হৈ চৈ শোনা গেল। ছুটে ঘরে ঢুকল সিংতাই।
