হেরাৎ আশ্চর্য হয়ে বলল, আশারীয় যোদ্ধার আজ কি হলো তা বুঝতে পারছি না।
থেটান বলল, ও হেরে গেল। বিদেশী বন্দী জিতে গেল।
হেরাৎ বলল, যদিও ও নিজের হাতে আশারীয় যোদ্ধাকে বধ করেনি তা হলেও জয়ী। ওকে ডেকে আন।
রানী মেনথেব বলল, এ ধরনের শক্তিশালী মানুষ আমি আগে কখনো দেখিনি।
টারজান তার সামনে এসে দাঁড়ালে হেরাৎ বলল, তুমি এখন থেকে স্বাধীন। অন্য দুটি শর্ত এখনো পূরণ না হলেও আমি তোমাকে স্বাধীনতা দান করলাম। অন্য দু’জন একে একে শর্ত পূরণ করতে পারলে তারাও ছাড়া পাবে।
টারজান বলল, আমাদের দলের মেয়েটির কি হবে?
হেরৎ বলল, সে ভালই আছে। অন্য শর্ত দুটি পূরণ হলে সেও ছাড়া পাবে। তুমি এখন থেটানের অতিথি হিসেবে থাকবে। তোমার সঙ্গীরা শর্ত পালন করতে পারুক বা না পারুক তাদের পরীক্ষা হয়ে গেলেই তুমি এ দেশ থেকে চলে যেতে পারবে। এখন ঠিক করো তোমার সঙ্গীদের মধ্যে কে সিংহ মারবে?
টারজান বলল, আমি মারব।
রানী বলল, তুমি ত স্বাধীনতা পেয়ে গেছ। আবার কেন জীবন দিতে যাবে?
টারজান বলল, তা হলেও আমি সিংহ মারব।
হেরাৎ রাণীর দিকে তাকিয়ে বলল, ঠিক আছে, ও যদি মরতে চায় ত তাই মরবে।
সেদিন সকালবেলায় দেখা গেল একমাত্র পিঞ্জরাবদ্ধ বন্দীরা ছাড়া মন্দিরের মধ্যে আর কোন লোকই নেই।
মাথায় অদ্ভুত শিরস্ত্রাণ পরা একটা লোক একটা ত্রিশূলের উপর একটা বড় মাছ গেঁথে ওদের সামনে এসে বলল, এই হলো তোমাদের খাবার।
বিয়ান বলল, ওর নাম হলো টোম। হোরাস হ্রদে ও মাছ ধরে বেড়ায়। সেই মাছ খেয়ে আমরা বেঁচে থাকি।
জাইথেব হেলেনকে জোর করে ধরতে গেল। হেলেন টেবিল থেকে ফুলদানিটা তুলে নিয়ে তাই দিয়ে সজোরে জাইথেবের মাথায় এমনভাবে মারল যে জাইথেব পড়ে গেল। হেলেন বুঝতে পারল জাইথেব। মারা গেছে।
জাইথেবের কোমর থেকে চাবির গোছাটা আর ছোরাটা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল হেলেন। যাবার আগে জাইথেবের মৃতদেহটা আলমারির পাশে লুকিয়ে রাখল যাতে হঠাৎ কেউ দেখতে না পায়।
মন্দিরের ভিতরে গিয়ে সে সোজা ব্রিয়ান আর দার্ণৎতের সঙ্গে দেখা করল। খাঁচার তালা খুলে ওদের। দু’জনকে মুক্ত করে দিয়ে বলল, আমি জাইথেবকে হত্যা করেছি। ও আমাকে ধরতে এসেছিল।
হেলেন বলল, এখন এখান থেকে এই মুহূর্তে পালিয়ে যেতে না পারলে মরতে হবে।
ব্রিয়ান বলল, আমার পাশের খাঁচাটায় হার্কুফ আছে। ও আগে এখানকার এই পুরোহিত ছিল। ও এখান থেকে বেরিয়ে যাবার গুপ্ত পথ জানে। ওকে মুক্ত করে দাও।
হেলেন একে একে বন্দীদের সব খুঁচাগুলো খুলে দিল। হার্কুফ সব বন্দীদের নিয়ে একটা সুড়ঙ্গ পথ ধরে অন্ধকারে আগে আগে যেতে লাগল।
ওরা ছিল সংখ্যায় মোট ন’জন সারারাত ধরে পথ চলে ওরা যখন সুড়ঙ্গ পথ পার হয়ে বাইরের জগতের মুক্ত আলো হাওয়ায় এসে দাঁড়াল তখন ভোর হয়ে গেছে।
ব্রিয়ান হার্কুফকে জিজ্ঞাসা করল, এটা কোন্ জায়গা?
হার্কুফ বলল, এটা আশেয়ার নগরীর মাথায় যে একটা পাহাড় আছে তারই পাশে এসে পড়েছি আমরা। আমরা দিনেরবেলায় পাহাড়ের গুহায় লুকিয়ে থাকব। রাত্রি হলে পথ চলব। তাহলে আমরা সকাল হতেই থোবোজে পৌঁছব। তুয়েন বাকা পাহাড় থেকে যে পথটা বেরিয়ে এসেছে সেই পথ ধরেই এগিয়ে যাব আমরা।
পরদিন দুপুরবেলায় টারজানকে দু’জন প্রহরী ডেকে নিয়ে এল প্রাসাদের উঠোনে একটা ঘেরা নিচু জায়গার কাছে। ঘেরা জায়গার মধ্যে দুটো সিংহকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। টারজানকে লড়াই করতে হবে তার মধ্যে। গোলাকার সেই নিচু জায়গাটার উপর থেকে রাজা, রানী, সামন্তরা ও অনেক দর্শক দেখতে লাগল লড়াইটা।
টারজনের বীরত্বপূর্ণ চেহারাটা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল রাজা হেরাৎ। রানীকে সে বলল, তোমার রুচিটা সত্যিই ভাল মেনথেব। লোকটা সত্যিই বীর এবং মানুষ হিসেবে মহান। তার মত লোকের এভাবে মৃত্যু হওয়া উচিৎ নয়।
টারজান দেখল দুটো সিংহ এক সঙ্গে তাকে আক্রমণ করলে জয়লাভ করা শক্ত হবে তার পক্ষে। সে দেখল দুটো সিংহের মধ্যে একটা সিংহ এগিয়ে আসছে তার দিকে। সে তাই আগে এগিয়ে আসা সিংহটাকে আক্রমণ করে ঘায়েল করে সেই সিংহটাকে অন্য সিংহটার মুখের কাছে ঠেলে দিল। তখন অন্য সিংহটা ঠেলে দেয়া সিংহটাকে আক্রমণ করে কামড়ে ছিঁড়ে মেরে ফেলল। ভাবল সেই সিংহটা তাকে শত্রু ভেবে কামড়াতে আসে।
এবার সেই বিজয়ী সিংহটা টারজানকে লক্ষ্য করতে থাকে। এখন উপরের বেড়ার ধারে ঝুঁকে দেখতে গিয়ে অসাবধানতাবশত হঠাৎ লড়াই-এর জায়গাটার মধ্যে পড়ে যায় মেনথেব; টারজান ছুটে গিয়ে মেনথেবেকে ধরে দরজার কাছে দাঁড় করিয়ে দিয়ে সিংহটার দিকে ছুরি হাতে এগিয়ে গেল।
এদিকে রানী পড়ে যাওয়ায় হেরাৎ চেঁচামিচি করে যোদ্ধাদের ডাকতে লাগল। সে বলল, সিংহটা টারজান আর রানী দু’জনকেই মেরে ফেলবে।
টারজান সিংহটার ঘাড়ে উঠে তার কালো কেশরগুলো এমনভাবে ধরল যে শত চেষ্টা করেও সিংহটা তার পিঠ থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারল না টারজানকে। টারজান তার ছুরিটা অন্য হাত দিয়ে সিংহটার পাঁজরে বসাতে লাগল বারবার। অবশেষে ছুরিটা আমূল বিদ্ধ হতেই পড়ে গেল সিংহটা।
হেরাৎ আবেগের সঙ্গে বলে উঠল, লোকটা দানব না দেবতা।
হেরাতের কাছে ওরা যেতেই হেরাৎ টারজানকে বলল, তুমি আমার রাণীর জীবন বাঁচিয়েছ। তুমি তার জন্য দ্বিগুণ স্বাধীনতা লাভ করলে। তুমি এখানে থাকতে পার, আবার ইচ্ছা করলে চলে যেতেও পার।
