প্রহরীরা থোম আর টাস্ককেও ধরতে যাচ্ছিল। কিন্তু সামন্ত আকামেন রানীর কানে কানে কি বলতে রানী বলল, আমি আকামেনের উপর এই লোকটির ভার দিলাম।
দার্ণৎকে ওরা হোরাস হ্রদের জলের তলায় সুড়ঙ্গপথ দিয়ে মন্দিরে নিয়ে গেল। সেখানে প্রহরীরা পুরোহিতদের হাতে ওকে তুলে দিয়ে এল। পুরোহিতরা আবার দার্ণৎকে প্রধান পুরোহিত বৃদ্ধ ব্রুলারের সিংহাসনের সামনে নিয়ে গিয়ে বলল, রানী আটকা এই বন্দীকে পাঠিয়ে দিয়েছে। এ হীরকদের পিতার শুচিতা নষ্ট করতে এসেছিল।
ব্রুলার রেগে গিয়ে বলল, এত লোককে আমি খাওয়াব কি করে? যাই হোক, ওকে একটা খাঁচায় ভরে রেখে দাও।
দার্ণৎ দেখল, বড় ঘরখানার মধ্যে দু’দিকে অনেক বড় বড় খাঁচায় এক একজন শীর্ণকায় লোককে বন্দী করে রাখা হয়েছে। লোকগুলোর মাথায় একরাশ করে রুক্ষ চুল আর মুখে দাড়ি গজিয়ে উঠেছে। দার্ণৎকে একটা খাঁচায় ভরা হলে পাশের খাঁচা থেকে একজন শীর্ণকায় অনশনিক্লষ্ট দাড়িওয়ালা লোক দার্ণৎকে লক্ষ্য করে বলল, তুমিও কি হীরে চুরি করতে এসেছিলে?
দার্ণৎ বলল, না, আমরা একটা লোকের খোঁজে এসেছিলাম।
খাঁচায় সেই বন্দী লোকটি বলল, কে সে লোক?
দার্ণৎ বলল, ব্রিয়ান গ্রেগরি নামে একটি লোক এখানে বন্দী আছে অনেক দিন ধরে।
লোকটি বলল, মজার কথা ত! আমিই ত ব্রিয়ান গ্রেগরি। আমাকে খুঁজতে তুমি আসবে কেন?
দার্ণৎ বলল, তুমিই তাহলে ব্রিয়ান গ্রেগরি? আমি হচ্ছি ফরাসী নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন দার্ণৎ।
ব্রিয়ান বলল, ফরাসী নৌবাহিনী আমার খোঁজ করবে কেন?
দার্ণৎ বলল, আমি যখন কোন একটা কাজে লোয়াঙ্গো গিয়েছিলাম তখন তোমার বাবা এখানে আসার জন্য এক অভিযানের প্রস্তুতি চালাচ্ছিলেন। আমি তাঁর অভিযানে যোগদান করি।
ব্রিয়ান বলল, তাহলে বাবা আসছিলেন আমার জন্য?
শুধু তোমার বাবা নয়, তোমার বোনও এসেছে। তোমার বাবা জলপথে আসার সময় নৌকা ডুবি হওয়ায় জলে পড়ে যান। তারপর কি হয়েছে জানি না। তবে তোমার বোন আমার সঙ্গে এখানে বন্দী হয়।
ব্রিয়ান বলল, আমার জন্যই এত সব কষ্ট।
দার্ণৎ বলল, ঐটাকে বলে হীরকদের পিতা?
ব্রিয়ান বলল, ঐ বড় কৌটোটাতে বিরাট একতাল হীরে আছে। প্রধান পুরোহিত ব্রুলার ওটাকেই হীরকদের পিতা বলে।
দার্ণৎ বলল, খাঁচায় যে সব বন্দী রয়েছে তারা কি সবাই বিদেশী?
ব্রিয়ান বলল, না, কিছু আশেয়ারের লোকও আছে যারা রানীর বিরাগভাজন হয়ে পড়ে কোনক্রমে। কিছু থোবোজের লোক আছে। আমার পাশে আছে হার্কুফ। সে ছিল এই মন্দিরেরই এক পুরোহিত। ব্রুলারের সঙ্গে কোন কারণে ঝগড়া হওয়ার জন্যই তার এই অবস্থা।
এদিকে থোবোজের রাজপ্রাসাদের একটি ঘর থেকে টারজান, থেটান, লাভাক আর গ্রেগরিকে রাজদরবারে রাজা হেরাতের সিংহাসনের সামনে বন্দী অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হলো। রাজার পাশে রানী মেনথেব বসে ছিল। সিংহাসনের দু’পাশে কালো পালক মাথায় যোদ্ধারা দাঁড়িয়েছিল।
হেরাতের চেহারাটা বেশ উঁচু আর পুরু। তার চিবুকে অল্প একটু দাড়ি ছিল।
হেরাৎ থেটানকে বলল, তুমি আমাদের দেশের সব আইন কানুন জেনেও বিদেশীদের সঙ্গে করে এনেছ। তুমি আমার ভাইপো হলেও তোমাকে আইনের খাতিরে ক্ষমা করতে পারি না।
থেটান বলল, তুয়েন বাকার পাদদেশে একদিন এক বিরাট সরীসৃপের কবলে পড়ে আমার জীবন চলে যাচ্ছিল। তখন টারজান নামে এই লোকটি তার নিজের জীবন বিপন্ন করে সেই জন্তুটাকে বধ করে আমাকে বাঁচায়। পরে জানলাম, এই লোকটি আর তার সঙ্গীরা আশেয়ারের শত্রু। ওরা বিদেশী হলেও আমাদের শত্রু নয়। তাই তাদের বন্ধু ভেবে নিয়ে এসেছি।
থেটানের কথা শুনে নরম হলো হেরা। বলল, তোমার অপরাধ আমি ক্ষমা করলাম। কিন্তু বিদেশীদের এখন বন্দী থাকতে হবে। তাদের অবশ্য আমি বাঁচার একটা সুযোগ করে দেব। তিনটি শর্ত পূরণের উপর তাদের জীবন নির্ভর করছে। প্রথমতঃ তাদের একজনকে এক আশেয়ারের যোদ্ধাকে হত্যা করতে হবে লড়াই করে। দ্বিতীয়তঃ তাদের একজনকে একটা সিংহকে বধ করতে হবে। তৃতীয়তঃ তাদের একজনকে আশেয়ারের মন্দির হতে হীরকদের পিতাকে নিয়ে আসতে হবে।
হেরাৎ বলল, মেয়েটিকে অন্দরমহলে মেয়েদের কাছে নিয়ে যাও। তার যেন কোন ক্ষতি না হয়। পুরুষদের এখন বন্দী করে রাখ। শর্ত পালনের জন্য পরে তাদের একে একে ডেকে পাঠাব।
পরদিন সকালে কারাগারের মধ্যে ওদের ঘুম ভাঙ্গলে একজন প্রহরী ঘরের মধ্যে ঢুকে বলল, তোমাদের মধ্যে একজন এস, আশেয়ারের সেই যোদ্ধার সঙ্গে লড়াই করে তাকে মারতে হবে।
লাভাক আর গ্রেগরি একে একে দু’জনেই যেতে চাইল।
কিন্তু টারজান তাদের কথা না শুনে প্রহরীর সঙ্গে চলে গেল।
প্রাসাদের উঠোনে এক জায়গায় লড়াইয়ের ব্যবস্থা হয়েছিল। আশেয়ারের সেই যোদ্ধাকে আনা হলো টারজনের সামনে। থেটান উৎসাহ দিল টারজানকে। হেরাৎ বলল, এ লড়াইয়ে ওর জীবন যাবেই।
আশারীয় যোদ্ধাটা এসে টারজানকে প্রথমে বুকের উপর সমস্ত শক্তি দিয়ে চেপে ধরল। ভাবল এইভাবে সে তাকে চেপে মেরে ফেলবে। টারজান চুপচাপ দাঁড়িয়ে মজা দেখতে লাগল। আশারীয় যোদ্ধা যখন দেখল তাতে কিছুই হলো না তখন সে আশ্চর্য হয়ে বলল, তুমি কি মানুষ না কোন পশু?
টারজান বলল, আমি হচ্ছি বাঁদরদলেল রাজা টারজান। আমি তোমাকে বধ করব।
আশারীয় যোদ্ধা আবার টারজানকে আক্রমণ করতে টারজান তাকে মাথার উপর তুলে একপাকে ঘুরিয়ে মাটির উপর আছড়ে ফেলে দিল। তাকে মেরে ফেলতে পারত টারজান তখনি। কিন্তু তাকে নিয়ে সে খেলা করতে চাইল। টারজান লোকটার দিকে ধীর গতিতে এগিয়ে গেলে লোকটা উঠে টারজনের কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে পালিয়ে গিয়ে বসে পড়ল। টারজান আবার তার কাছে গেলে লোকটা তার কোমর থেকে একটা ছুরি বার করে নিজের বুকে বসিয়ে দিল।
