থোম বলল, চুপ করো, আমরা নিষিদ্ধ নগরী আশেয়ারে যাবই। মাগরা সবচেয়ে দামী হীরের গয়না পরবে। আমরা দুজনে সবচেয়ে ধনী হব। ভারতের রাজা মহারাজাদের হার মানিয়ে দেব আমি। প্যারিসের রাস্তাগুলোকে সোনা দিয়ে ভরিয়ে দেব।
এক জোর অট্টহাসিতে পাগলের মত ফেটে পড়ল থোম। বলল, এস, এই নদীর ধার দিয়ে বরাবর এগিয়ে চলব আমরা।
নদীর ধারের পথটা উঁচুনিচু এবং বড় বড় পাথরে ভরা। লাল টাস্ক থোমের পিছু পিছু যেতে লাগল নীরবে। কিছু দূর যাবার পর ওরা দেখল পথটা সরু হয়ে গেছে আর তার বাঁ দিকে খাড়াই পাহাড়। একবার পা ফসকে গেলে ওরা পড়ে যাবে খরস্রোতা নদীর জলে। নদীর ওপারেও খাড়াই পাহাড়।
লাল টাস্ক বলল, মালিক ফিরে চল। জগতের সব হীরে পেলেও এ বিপদের ঝুঁকি নেয়া উচিৎ হবে না।
থোম বলল, না এগিয়ে চল। এই পথই আশেয়ারে চলে গেছে। আমি মরে গেলে তবে ফিরে যাবে। চুপ করো। হৈ চৈ করো না। তুমি একটা কাপুরুষ।
হঠাৎ লাল টাস্ক বলল, আল্লা, শোন মালিক, বনের ভিতর থেকে কারা যেন আমাদের দেখছে। জায়গাটা খুব খারাপ। কি একটা শব্দ হচ্ছে। মনে হচ্ছে শব্দটা আসছে কবরের ভিতর থেকে।
আতন থোম আর লাল টাস্ক সেই রাতটা কোনরকমে সেই খাদের কাছে কাটিয়ে পরদিন সকালে যে পথে এসেছিল সেই পথেই ফিরতে লাগল।
আতন থোম বলল, লোকজন না হলে আশেয়ারে যাওয়া যাবে না। আমি বোঙ্গায় ফিরে গিয়ে কিছু সাহসী লোকজন যোগাড় করব।
নদীতে একটা বড় নৌকা ছিল। কুড়িজন নিগ্রো ক্রীতদাস নাবিক হিসেবে কাজ করছিল। যোদ্ধারা আতন থোম আর টাস্ককে সেই নৌকাতে চাপাল।
আতন থোম জোরে হেসে উঠল। টাস্ক বলল, হাসলে কেন মালিক?
থোম বলল, হাসলাম কারণ এ নৌকা যাবে নিষিদ্ধ নগরী আশেয়ারে।
নৌকাটা যখন আশেয়ারের দিকে এগিয়ে চলছিল তখন এক সময় থোম সেই সব যোদ্ধাদের নেতাকে বলল, তোমরা কেন আমাদের বন্দী করলে? আমাদের দিয়ে কি করবে?
যোদ্ধাদের নেতা বলল, তোমাদের বন্দী করেছি কারণ নিষিদ্ধ নগরী আশেয়ারের খুব কাছে তোমাদের পেয়েছি। এই নিষিদ্ধ নগরীতে একবার কেউ এলে আর সে ফিরে যেতে পারে না। আমরা আমাদের রানী আটকার কাছে নিয়ে যাব। যা করার তিনিই করবেন।
এরপর নৌকা নদী ছেড়ে একটা বিরাট হ্রদে গিয়ে পড়ল। তার দু’দিকে বন আর প্রান্তর দেখা যাচ্ছিল। তার ফাঁকে ফাঁকে দুদিকে দুটো নগরের বড় বড় প্রাসাদ দেখা যাচ্ছিল।
অবশেষে নিষিদ্ধ নগরী আশেয়ারের ঘাটে এসে নৌকাটা ভিড়তেই যোদ্ধারা আতন থোম আর লাল টাস্ককে নামতে বলল।
আতন থোম বলল, আমি একবার রানীর সঙ্গে দেখা করতে চাই। এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের কথা তাঁকে নিজের মুখে জানাতে চাই।
অফিসার গিয়ে প্রহরীদের বলল, ওদের অনেক বেয়াদবি সহ্য করেছি। আর না। ওদের একটা ঘরের মধ্যে তালাবন্ধ করে রেখে দাও। বেঁচে থাকার জন্য যেটুকু প্রয়োজন সেই রকম খাদ্য তাদের দেবে।
শিকল বাঁধা অবস্থায় ওদের একটা অন্ধকার ঘরে ঠাণ্ডা পাথরের মেঝের উপর ফেলে রাখা হলো।
একদিন দরজা খুলে কয়েকজন প্রহরী সেই কারাকক্ষের মধ্যে এসে বলল, চল আমাদের সঙ্গে। রানী তোমাদের ডেকেছেন।
বিরাট প্রাসাদের একটি বড় ঘরের মধ্যে তাদের নিয়ে যাওয়া হলো। একটা বড় পাথর কেটে তৈরি করা সিংহাসনে রানী বসে ছিল। তার দু’দিকে যোদ্ধারা অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়েছিল। তার সামনে অনেক ক্রীতদাস যে কোন হুকুম তামিল করার অপেক্ষায় ছিল নতজানু হয়ে।
রানীকে দেখতে সুন্দরী, বয়স তিরিশ থেকে পঁয়ত্রিশ। তার মাথার চুলগুলো বিন্যাস্ত অথচ ছড়ানো ছিল মাথার চারদিকে। তার উপর সাদা পালকের একটা মুকুট ছিল।
রানী থোমকে জিজ্ঞাসা করল, তোমরা আশেয়ারে এসেছ কেন?
থোম বলল, আমরা এখানে আসতে চাইনি। আমরা পথ হারিয়ে তুয়েন বাকার কাছে এসে পড়ি। তারপর ফিরে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ তোমার যোদ্ধারা আমাদের ধরে বন্দী করে।
রানী বলল, তোমরা নাকি বলেছ তোমাদের হাতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে। সেটা কি? বাজে কথা বলে আমার সময় নষ্ট করলে তার ফল কিন্তু ভাল হবে না।
আতন থোম বলল, আমাদের একদল শক্তিশালী শত্রুর কবল থেকে পালিয়ে আসছিলাম আমরা। আমরা জানতে পারি তারা আশেয়ারে আসছে। তারা এখানে এসে হীরে চুরি করে নিয়ে যেতে চায়। আমি তাদের ধরতে সাহায্য করতে চাই তোমাদের।
রানী আটকা বলল, তাদের সঙ্গে সেনাদল আছে কি?
থোম বলল, সম্ভবত আছে। তাদের প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র আছে।
রানী আটকা তার এক সামন্তকে বলল, এই লোকটি যদি সত্যি কথা বলে থাকে তাহলে একে কারাগারে না রেখে নগরের মধ্যে ঘোরাফেরার স্বাধানী দিয়ে আটক রাখা হোক।
সেদিন দুপুরের দিকে হঠাৎ বাতাসে কিসের গন্ধ পেয়ে সচকিত হয়ে উঠল টারজান। বলল, একদল আদিবাসী আসছে।
গ্রেগরি বলল, ওরা এসেগেছে। ওদের দলে অনেক কুলী আর মালপত্র রয়েছে।
ওগাবি বলল, বোঙ্গাতে এই লোকগুলোকেই প্রথমে আপনারা ঠিক করেছিলেন। পরে আতন থোম চালাকি করে তার দলে নিয়ে যায়। ওরা তাদের দল ছেড়ে এসেছে।
টারজান বলল, শ্বেতাঙ্গদের সফরি ত্যাগ করার জন্য তোমাদের শাস্তি পেতে হবে। তার জন্য তোমাদের সকলকে আমাদের সঙ্গে আশেয়ারে যেতে হবে।
মবুলি বলল, তুয়েন বাকা হচ্ছে নিষিদ্ধ নগরী যাবার পথে অভিশপ্ত সীমারেখা। আমার লোকেরা যেতে চায়নি সেখানে। তাই তারা সফরি ছেড়ে পালিয়ে এসেছে।
