এই বলে সে গাছ থেকে নেমে ওদের সামনে এসে দাঁড়াল। অন্য সব আদিবাসীরা এতে ভয় পেয়ে। সরে দাঁড়ালেও সর্দার পিঙ্গুর ছেলে চেমিঙ্গো একটা ছুরি হাতে এগিয়ে এসে বলল, চেমিঙ্গো অরণ্যদানবকে ভয় করে না।
টারজান হেলেনের বাঁধনগুলো খুলে দিয়ে চেমিঙ্গোর দিকে এগিয়ে গেল। একটা হাত দিয়ে চেমিঙ্গোর একটা হাত আর অন্য একটা হাত দিয়ে তার পেটটা ধরে মাথার উপর তাকে তুলে ধরল টারজান।
এবার টারজান চেমিঙ্গোকে তুলে ধরে বলল, গেট খুলে দাও, তা না হলে পিঙ্গুর ছেলে চেমিঙ্গো মরবে।
পিঙ্গু এগিয়ে গিয়ে টারজানকে বলল, তুমি আমার ছেলেকে মেরো না। আমরা গেট খুলে দিচ্ছি।
টারজান বলল, তোমরা যদি গেট খুলে দিয়ে আমাদের যাবার পথ পরিষ্কার করে দাও তাহলে তোমার ছেলের কোন ক্ষতি করব না।
পিঙ্গু গেট খোলার আদেশ দিল। গেট খুলে দিতেই টারজান হেলেনকে নিয়ে বাইরে গিয়ে পিঙ্গুকে ছেড়ে দিল।
টারজান আর হেলেন গাঁয়ের সীমানা ছেড়ে গ্রেগরিদের ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। টারজান হেলেনকে বলল, তুমি কি করে এখানে এসে পড়লে?
হেলেন বলল, আমি গতকাল রাতে আতন থোমের শিবির ছেড়ে বোঙ্গা যাবার উদ্দেশ্যে পথ চলতে থাকি। কিন্তু আমি ভুল পথে এসে পড়ি। আর এই গাঁয়ের একদল আদিবাসী আমায় ধরে আনে এখানে। কিন্তু তুমি কি করে এলে?
টারজান তখন তার সব কথা বলল।
পরদিন সকালে সূর্য ওঠার পর গ্রেগরিদের শিবিরে সবাই যখন প্রাতরাশ খাচ্ছিল তখন মাগরা বলল, টারজান এখনো ফেরেনি।
এমন সময় দার্ণাৎ দেখল টারজান আর হেলেন শিবিরের দিকে আসছে। গ্রেগরিও শিবিরের বাইরে থেকে হেলেনকে দেখতে পেয়ে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল তাকে। তার চোখে জল এসেছিল। লাভাক, দার্ণৎ সবাই আনন্দে ঘিরে দাঁড়াল তাকে। একমাত্র উলফ দূরে দাঁড়িয়ে রইল।
অবশিষ্ট হরিণের মাংসটুকু টারজান আর হেলেন খেল। খাবার পর হেলেন আতন থোমের শয়তানির কথা এবং তার সব অভিজ্ঞতা খুলে বলল। গ্রেগরি বলল, তার এই শয়তানির জন্য আতন খোমকে চরম মূল্য দিতে হবে।
দার্ণৎ আর লাভাক দু’জনেই বলল, এর জন্য তাকে মারতে হবে।
এবার ওদের দলটা আতন থোমের দলটাকে ধরার জন্য এগিয়ে যেতে লাগল আশেয়ারে পথে। দু’দিনের মত ওদের খাবার আছে দেখে একদিন টারজান গ্রেগরিকে বলল, আমি এখন যাচ্ছি। আজ বা কাল ফিরব।
তোমরা এগোতে পার। আমি ঠিক তোমাদের ধরে ফেলব।
ওরা আবার এগিয়ে চলল। দার্ণৎ বলল, টারজান আমাদের ঠিক ধরে ফেলবে।
সেদিন বিকালেই ফিরে এল টারজান।
টারজান বলল, আমি আতন থোমের সফরিটার খোঁজ করতে গিয়েছিলাম এবং খোঁজ পেয়েছি।
উলফ বলল, পথ চিনতে ভুল হতে পারে যে কোন মানুষের।
টারজান গম্ভীরভাবে বলল, ভুন নয়, ইচ্ছাকৃতভাবে তুমি আমাদের ভুল পথে চালিত করেছ। তুমি আমাদের ঠকিয়েছ। এই লোকটাকে দল থেকে তাড়িয়ে দাও গ্রেগরি।
উলফ বলল, একা আমি এই জঙ্গলের মধ্যে কোথায় যাব?
গ্রেগরি বলল, তাড়াহুড়ো করে কিছু করা ঠিক হবে না।
টারজান বলল, ঠিক আছে। তোমরা যা খুশি করবে ওকে নিয়ে। কিন্তু পথ-প্রদর্শকের কাজ থেকে ইস্তফা দেয়া হলো আজ থেকে।
আতন থোমের সফরিটা একটা গভীর বন থেকে বেরিয়ে একটা ফাঁকা প্রান্তরে এসে পড়ল। ওরা দেখল ওদের সামনে বিস্তৃত হয়ে রয়েছে এক বিরাট শূন্য প্রান্তর আর তাদের ডান দিকে ছিল একটা নদী। ওদের সামনে দূরে প্রান্তরটার শেষ প্রান্তে যে কতকগুলো পাহাড় ছিল তার মধ্যে এটাকে একটা মৃত আগ্নেয়গিরি মনে হচ্ছিল।
থোম বলল, ঐ দেখ লাল টাস্ক, ঐটা হচ্ছে তুয়েন বাকা পাহাড়। পাহাড়টার ওপারেই আছে আশেয়ার, সেই নিষিদ্ধ নগরী।
লাল টাস্ক বলল, আর আছে হীরক দেশের পিতা মালিক।
আতন থোম বলল, আজ মাগরা থাকলে ভাল হত।
লাল টাস্ক বলল, ওরা না এলেই ভাল। হীরের ভাগ দিতে হবে না।
থোম বলল, কিন্তু মাগরার মাকে আমি কথা দিয়েছিলাম।
লালি টাস্ক বলল, সে অনেক দিনের কথা। মাগরার মা মারা গেছে আর মাগরাও সে কথা জানে না।
নিগ্রোভৃত্যরা তখন নিজেদের মধ্যে কি সব আলোচনা করছিল। মবুলু তাদের কাছ থেকে আতন থোমের কাছে এসে বলল, আমার লোকেরা এখান থেকে যাবে না মালিক।
আতন থোম বলল, সেকি, আমি ত তাদের আশেয়ারে যাবার জন্যই নিযুক্ত করেছি।
মবুলু বলল, বোঙ্গা থেকে আশেয়ার তখন অনেক দূরে থাকায় তারা রাজী হয়েছিল। কিন্তু এখান থেকে আশেয়ার অনেক কাছে বলে তারা আর যেতে চাইছে না। তুয়েন বাকা হচ্ছে নিষিদ্ধ নগরীর। আশেয়ারের অভিশপ্ত সীমারেখা তাই তারা ভয় পেয়ে গেছে।
থোম বলল, তুমি হচ্ছ তাদের সর্দার। তুমি তাদের যেতে বাধ্য করবে।
মবুলু বলল, না, আমি তা পারব না। আজ এখানেই শিবির গড়ে তোলা হোক।
সে রাতে নদীর কলতান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে অনেক হীরের স্বপ্ন দেখল আতন থোম। হীরক দেশের পিতাকে সে খুঁজে বার করবেই। সকাল হতেই সে নিগ্রোভৃত্যদের ডাকাডাকি করতে লাগল। কিন্তু কারো কোন সাড়াশব্দ পেল না। সে তখন উঠে নিজের নিগ্রোভৃত্যদের তাঁবুতে গেল। কিন্তু গিয়ে দেখল, নিগ্রোভৃত্যরা শিবির ছেড়ে সব পালিয়েছে।
সে গিয়ে তখন লাল টাস্ককে উঠিয়ে বলল, কুকুরগুলো সব আমাদের ছেড়ে হঠাৎ পালিয়েছে।
লাল টাস্ক বলল, আল্লা! তাহলে মালিক আমরা মাত্র দু’জনে সেখানে যেতে পারি না।
