চেমিঙ্গোই প্রথম দেখতে পেল হেলেনকে। সে তার সঙ্গীদের বলল, ঐ দেখ এক শ্বেতাঙ্গ মেয়ে আসছে। আমি ওকে আমার বাবার কাছে ধরে নিয়ে যাব।
হেলেন দেখল চার-পাঁচজন নিগ্রো বর্শা হাতে তাকে ধরতে আসছে। সে দেখল তারা এখনো বেশ কিছুটা দূরে। সে তাই উপত্যকা ছেড়ে বনের দিকে ছুটতে লাগল।
কিন্তু বনে ঢোকার মুখেই একটা সিংহ দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল হেলেন। উভয় সংকটে পড়ল সে। একদিকে মারমুখী নিগ্রোযোদ্ধা আর একদিকে মানুষখেকো সিংহ।
চেমিঙ্গোরাও সিংহটাকে দেখেই বুঝতে পারল এই মানুষখেকো সিংহটার খোঁজ করে বেড়াচ্ছে ওরা। সিংহটা তখন হেলেনের উপর ঝাঁপ দেবার জন্য উদ্যত হতেই চেমিঙ্গো তার বর্শাটা সজোরে ছুঁড়ে দিল সিংহটার বুকে।
আহত সিংহটা তখন হেলেনকে ছেড়ে চেমিঙ্গোকে আক্রমণ করল। চেমিঙ্গো তখন শুয়ে পড়ে তার উপর তার বড় ঢালটা চাপিয়ে দিল। এবার চতুর্থ সঙ্গীটি তার বর্শাটা দিয়ে আহত সিংহের বুকটা বিদ্ধ করল। সিংহটা এবার পড়ে গেল মাটিতে। চেমিঙ্গো তখন মাটি থেকে উঠে পড়ল।
এরপর চেমিঙ্গো হেলেনকে টানতে টানতে তাদের গায়ের দিকে নিয়ে যেতে লাগল।
সর্দার পিঙ্গু বলল, আজ রাতেই ওকে মারা হবে। সেই সঙ্গে নাচ গান ও উৎসব হবে।
গ্রেগরিদের সফরিটা তখন বনপথ পার হয়ে সেই ফাঁকা জায়গাটায় এসে পড়ে।
গ্রেগরি বলল, বোঙ্গায় গিয়ে আমাদের আতন থোমকে ধরতেই হবে। সেখানে তার হাত থেকে হেলেনকে উদ্ধার করতে হবে। তাছাড়া আমাদের হাতে ম্যাপ নেই। ম্যাপটা থাকলেও আমরা না হয় আশেয়ারে গিয়ে ওদের ধরতাম।
উলফ বলল, আমি ও পথ চিনি। গ্রেগরি যদি আমাকে এক হাজার পাউন্ড আর হীরের অর্ধেক ভাগ দিতে রাজী হয় তাহলে আমি আশেয়ারে ওকে নিয়ে যাব।
টারজান বলল, তুমি একটি কুটিলমনা বদমাস লোক। তারপর সেখান থেকে চলে গেল।
গ্রেগরি দার্ণৎকে জিজ্ঞাসা করল, টারজান কোথায় গেল।
দার্ণৎ বলল, ও গেল কোন এক আদিবাসীদের গায়ের সন্ধানে। সেখানে কিছু নিগ্রোভৃত্য পাওয়া যেতে পারে। এইভাবে সে তোমার ও মেয়ের কোন সন্ধান পেয়ে যেতে পারে।
টারজান গাছের ডালে ডালে যখন যেতে লাগল তখন দিন শেষ হয়ে আসছিল। সে দেখল মোট তিনটে লোক তার শত্রু। তারা হলো আতন থোম, লাল টাস্ক আর উলফ। কিন্তু মাগরা একটা রহস্য তার কাছে। তাকে সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। সে অবশ্য দু’বার বুলেটের হাত থেকে তার জীবন বাঁচিয়েছে একথা ঠিক। কিন্তু আসলে সে আতন থোমের দলের লোক এবং তার চর।
একটা হরিণ শিকার করতে যেতেই দূর থেকে আদিবাসীদের ঢাকের আওয়াজ কানে এল টারজনের।
হেলেনের হাত পা বেঁধে চেমিঙ্গোরা তাদের গায়ের একটা নোংরা কুঁড়ে ঘরে বন্দী করে রেখেছিল। হঠাৎ সে ঢাকের শব্দ শুনে চমকে উঠল। হেলেন বুঝল, ওরা, নরখাদক নিগ্রো। একটু পরেই তাকে হত্যা করে তার মাংস খাবে ওরা।
হেলেনকে এবার কয়েকজন নিগ্রোযোদ্ধা হাত পা বাঁধা অবস্থায় ঘর থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে সর্দার পিঙ্গুর ঘরের সামনে একটা লম্বা বাঁশের খুঁটোর সঙ্গে বেঁধে দাঁড় করিয়ে রাখল। এই ভয়ঙ্কর দৃশ্যটাকে এক দুঃস্বপ্নের মত মনে হচ্ছিল হেলেনের। হঠাৎ একটা বর্শার ফলকের অগ্রভাগ তার গায়ের এক জায়গায়। চামড়াটা ভেদ করতেই তার হুঁস হলো।
আতন থোম তখন তাদের শিবিরে লাল টাস্কের সঙ্গে কথা বলছিল। তারাও ঢাকের আওয়াজটা শুনেছিল।
লাল টাস্ক বলল, ঐ ঢাকের আওয়াজ শুনলে আমার বড় ভয় হয়।
আতন থোম বলল, আগামীকাল রাতে আর এ ঢাকের আওয়াজ শুনতে হবে না। কারণ তখন আমরা আশেয়ারের পথে অনেক দূর এগিয়ে যাব।
এদিকে গ্রেগরিদের শিবিরে তখনো টারজান ফিরে না আসায় মাগরা ব্যস্ত হয়ে বলল, টারজান এখনো ফিরে এল না।
লাভাক বলল, এতক্ষণ ধরে যে ঢাকগুলো বাজছিল দূরে তা হঠাৎ থেমে গেল।
অসহায় হেলেনকে ঘিরে যখন নরখাদক আদিবাসীরা নাচতে লাগল এক বন্য বর্বর উল্লাসে আর মাঝে মাঝে তাদের বর্শার ফলকের অগ্রভাগ দিয়ে হেলেনের গাটাকে স্পর্শ করছিল তখন তার মনে হচ্ছিল।
এর থেকে বর্শার আঘাতে তার মৃত্যু ঘটলে ভাল হত।
এদিকে টারজান ঢাকের শব্দ লক্ষ্য করে পিঙ্গুদের গাঁটার সামনে এসে পড়ল। সে বন্ধ গেটটা লাফ দিয়ে পার হয়ে গাঁয়ের মধ্যে পড়ে একটা গাছের উপর উঠে পড়ল। তাকে কেউ দেখতে পেল না। নাচের জায়গায় যে আগুন জ্বলছিল তার আলোয় টারজান দেখল যাকে ঘিরে আজ এই হত্যার উৎসব শুরু হয়েছে। সে হচ্ছে বন্দিনী হেলেন। নাচতে নাচতে একজন আদিবাসী মুহূর্তের উত্তেজনায় তার বর্শা উঁচু করে হেলেনের বুকটাকে বিদ্ধ করার জন্য উদ্যত হলো। হেলেন তার চোখদুটো বন্ধ করে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হলো।
সহসা কোথা থেকে একটা তীর রহস্যময়ভাবে এসে সেই আদিবাসীর বুকটা বিদ্ধ করতেই সে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে সব বাজনা থেমে গেল। আহত লোকটার আর্ত চীৎকার হেলেন চোখ খুলে দেখল তার পায়ের তলায় একটা লোক তীর বিদ্ধ অবস্থায় মরে পড়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে আর একজন একটা ছুরি হাতে এগিয়ে এল হেলেনের দিকে। টারজান তখন গাছের উপর থেকে এমন ভয়ঙ্করভাবে বিজয়োল্লাসসূচক এক চীৎকার করে উঠল যে আদিবাসীরা স্তব্ধ হয়ে গেল সবাই।
সে চীৎকার শুনে যে লোকটা ছুরি হাতে হেলেনকে বধ করতে এসেছিল সে থেমে গেল। এমন সময় গাছের উপর থেকেই টারজান বলতে লাগল, শ্বেতাঙ্গ বনদেবতাকে নিয়ে যাবার জন্য অরণ্যদানব এসেছে। সাবধান সবাই।
