পরদিন সকালেই মাগরা গ্রেগরিদের কাছে চলে গেল। গত রাতে হেলেনের চিন্তায় ঘুম হয়নি ওদের। সকালে উঠেই দার্ণৎ বলল, আর পুলিশে খবর দেয়া ছাড়া কোন উপায় নেই।
গ্রেগরি বলল, কিন্তু পুলিশে খবর দিলে ওরা যদি হেলেনকে মেরে ফেলে?
এমন সময় দরজায় করাঘাত শুনে গ্রেগরি বলল, ভিতরে এস।
দরজা খুলে মাগরা ঘরে ঢুকল।
মাগরাকে দেখে চমকে উঠল দার্ণৎ, তুমি!
দার্ণৎতের দিকে না তাকিয়ে মাগরা টারজনের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি এসেছি তোমার বোনের সন্ধান দিতে।
গ্রেগরি বলল, কোথায় সে? তার সম্বন্ধে কি জান?
মাগরা বলল, আতন থোম তাকে বোঙ্গা হয়ে দূর জঙ্গলে নিয়ে যাচ্ছে। গত রাতে বোঙ্গা যাবার জন্য স্টীমার ধরেছে। আমারও যাবার কথা ছিল তাদের সঙ্গে। কিন্তু কেন যাইনি তা জানতে চেও না।
দার্ণৎ বলল, কিন্তু স্টীমারটা ত আজকে ছাড়ার কথা ছিল।
ওরা ঘুষ দিয়ে ক্যাপ্টেনকে বশ করেছে।
টারজান বলল, এই মেয়েটির কথা বিশ্বাস করবে না।
মাগরা বলল, আমার কথা বিশ্বাস করতে পার। বিশ্বাস না হলে আমাকে তোমাদের এখানে আটক করে রেখে দিতে পার।
গ্রেগরি হা হুতাশ করতে লাগল হেলেনের জন্য। আমার ছেলে গেছে এবার মেয়েও গেল।
দার্ণৎ তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, হতাশ হয়ো না, যা হয় একটা উপায় হবেই।
গ্রেগরি বলল, চার দিনের মধ্যেই আতন থোম বোঙ্গা চলে যাবে। নৌকাটা আবার বোঙ্গাতেই একদিন থেকে যাবে। তারপর এখানে ফিরে আসতে তার আড়াই দিন লাগবে। তারপর আমরা ক্যাপ্টেনকে সঙ্গে সঙ্গে রাজী করিয়ে স্টীমারে রওনা হয়ে পড়লেও ইতোমধ্যে থোম ছয়-সাত দিন সময়। পেয়ে যাবে। সে তখন অনেক দূর ভিতরে চলে যাবে।
দার্ণৎ বলল, টারজান যখন আছে থোম আফ্রিকার মধ্যে যেখানেই থাক টারজান তাকে খুঁজে বার করবেই। আমি একটা উপায় খুঁজে বার করেছি। নৌ-বাহিনীর কর্তৃপক্ষকে বলে আমি একটা সামুদ্রিক বিমানের ব্যবস্থা করব। তাহলে আতন থোম বোঙ্গা থেকে চলে যাবার আগে তাকে গিয়ে আমরা ধরতে পারব।
মাগরার মনে যাই থাক কথাটা শুনে চুপ করে রইল। কোন কথা বলল না।
দার্ণৎতের চেষ্টায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিমান যোগাড় করে ওরা রওনা হলো।
বিমানটা আকাশে ওড়ার আধ ঘণ্টার মধ্যেই তাদের বিমানটা এক ঝড়ের কবলে পড়ে গেল। পাইলট লাভাক ভেবেছিল ঝড়টা বেশিক্ষণ স্থায়ী হবে না এবং একটা বিশেষ অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
কিন্তু ওদের বিমানটা ক্রমেই দুলতে লাগল। এক ঘণ্টা এইভাবে কাটার পর লাভাক দার্ণৎকে তার কাছে আসার জন্য ইশারায় ডাকল। দার্ণৎ কাছে এলে সে বলল, ঝড়টা যে এত সাংঘাতিক হবে তা আগে বুঝতে পারেনি ক্যাপ্টেন।
আরো দু’ঘণ্টা ধরে ঝড়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে বিমানটাকে চালিয়ে নিয়ে গেল লাভাক। তারপর হঠাৎ ইঞ্জিন থেকে তেল বেরিয়ে আসতে লাগল। দার্ণৎ সবাইকে সাবধান করে দিল। বলল, সবাই লাইফ বেল্ট পরে তৈরি হয়ে নাও। আমার প্লেন নামতে শুরু করেছে।
দার্ণৎ লাভাককে জিজ্ঞাসা করল, আমরা এখন কোথায় আছি? এটা কোন্ অঞ্চল? কতটা উপরে আছি?
লাভাক বলল, এটা অরণ্য অঞ্চল, জায়গাটা কি তা বলা শক্ত। তাছাড়া কম্পাসটা ঠিক নেই। এখন আমরা প্রায় তিনশো ফুট উপরে আছি।
কিছুক্ষণের মধ্যে জাহাজটা একটা বড় লেকের ধারে জঙ্গলের গা ঘেঁষে পড়ে গেল। ওদের কারো কোন আঘাত লাগল না। শুধু ওগাবি ভয়ে অচেতন হয়ে পড়ল।
আজ চারদিন ধরে তারা এই জঙ্গলে বন্দী হয়ে আছে। উড়োজাহাজটাকে আর ওড়াতে পারেনি ওরা।
দার্ণৎ একদিন টারজানকে জিজ্ঞাসা করল, এখন বুঝতে পারছ আমরা কোথায় আছি?
টারজান বলল, এ জায়গাটা হলো বোঙ্গার পূর্ব দিকে আর কিছুটা দক্ষিণ দিকে। আমাদের আর বোঙ্গা যেতে হবে না। আমরা এখান থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে গেলেই পথে ওদের সঙ্গে দেখা হবে। তাছাড়া সঙ্গে আমাদের বোঝা না থাকায় ওদের থেকে তাড়াতাড়ি পথ চলতে পারব।
এদিকে বোঙ্গা থেকে রওনা হয়ে একদল লোকের একটি সফরি উত্তর-পূর্ব দিকে এগিয়ে চলেছিল। সেই দলে ছিল তিনজন শ্বেতাঙ্গ।
সে দলের নেতা ছিল আতন থোম আর যুবতী মেয়েটি ছিল হেলেন। এক সময় আতন থোম হেলেনকে বলল, চালাকি করে আমরা বোঙ্গা থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি। বোঙ্গায় এসে আশেয়ারের পথে রওনা হতে তোমার বাবার এক সপ্তা অথবা তারও বেশি সময় লাগবে। ততক্ষণে আমরা এত দূরে গিয়ে পড়ব যে তারা আর আমাদের ধরতে পারবে না।
হেলেন বলল, তুমি বোকার মত কাজ করছ। তুমি যদি বুদ্ধিমান হতে তাহলে আমাকে ছেড়ে দিয়ে বোঙ্গায় পাঠিয়ে দিতে। আমাকে ছেড়ে না দিলে বাবা তোমাকে ছাড়বে না। তোমাকে যেমন করে তোক ধরবেই।
সন্ধ্যা হতেই ওরা এক জায়গায় শিবির স্থাপন করল রাতেরবেলায় হেলেন তাঁবুর পিছন দিক দিয়ে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে পালিয়ে গেল। চাঁদের আলোয় পথ চিনে চিনে এগিয়ে চলেছিল সে। অদূরে একটা সিংহ গর্জন করছিল। কিন্তু সিংহের থেকে তার বেশি ভয় হচ্ছিল আতন থোমকে।
না জেনেই একটা পথ পেয়ে গিয়েছিল হেলেন। সেই পথটা ধরে সারারাত যেতে লাগল সে। সে ভেবেছিল সে বোঙ্গার পথেই যাচ্ছে। কিন্তু সকাল হতেই সে যখন বন পার হয়ে একটা বিরাট ফাঁকা প্রান্তরে এসে পড়ল তখন সে বুঝতে পারল পথ হারিয়ে ফেলেছে সে।
বুইরু নামে এক নরখাদক জাতীয় নিগ্রো আদিবাসীদের সর্দার পিঙ্গুর ছেলে চেমিঙ্গো সেদিন তিন জন নিগ্রো যোদ্ধাকে নিয়ে একটা মানুষখেকো সিংহ শিকার করতে বেরিয়ে এসেছিল গা থেকে।
