ইৎজল বলল, দুতিন দিন পর অথবা মাসখানেক পরে ওকে বলি দেবে। ততদিন আমার মনে হয় ওকে পিরামিডের উপরে কুমারীদের মন্দিরে রাখবে। ভাল পাহারার ব্যবস্থা থাকবে।
আজ রাতেই যাব।
ইৎজল চা এবার তা দু’হাত দিয়ে টারজনের গলাটা জড়িয়ে ধরে অনুনয় বিনয়ের সুরে বলল, তুমি যেও না। মেয়েটাকে তুমি উদ্ধার করতে পারবে না। ওরা তোমায় মেরে ফেলবে। আমি তোমাকে। ভালবাসি। তুমি আমাকে বনে নিয়ে যাও। এখানে আমার কাউকে ভাল লাগে না।
টারজান বলল, ওরা ত সবাই তোমাকে দয়া করে।
ওদের দয়া আমি চাই না। আজ রাতে তুমি চিচেন ইৎজ্জায় যেও না।
তার কাঁধে হাত বুলিয়ে টারজান বলল, আজ রাতেই আমি যাচ্ছি।
ইৎজল চা তখন রেগে বলল, আসলে তুমি তাকে ভালবাস এটাই হলো তোমার যাওয়ার কারণ।
টারজান বলল, এ কথা আর কখনো যেন বল না।
এই বলে সে অন্য সকলের কাছে চলে গেল।
ইৎজল চা প্রচণ্ড রাগে গজ গজ করতে করতে নিজের ঘরে চলে গেল। মাটিতে পড়ে সে নিষ্ফল আক্রোশে ছটফট করতে লাগল। তীব্র প্রতিহিংসা জাগল তার মনে।
এই সময় সে দরজার দিকে তাকাতেই দেখল হ্যান্সের দল ফিরে আসছে জয়ী হয়ে। শিবিরের সকলের দৃষ্টি তাদের উপরে পড়তেই তার ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে বনের ভিতর চলে গেল ইৎজল চা।
হ্যান্স দেখতে পেয়েই ছুটে গিয়ে তার গলাটা জড়িয়ে ধরল জেনেত্তে। বলল, আমি ভেবেছিলাম তুমি আর বেঁচে নেই।
হ্যান্স বলল, না না, আমি বেঁচে আছি। আর তোমাকে স্মিৎস বা তার দলকে ভয় করতে হবে না। ওরা সবাই এখন মৃত।
টারজান বলল, শুনে খুশি হলাম। ওরা অত্যন্ত পাজী লোক ছিল।
এদিকে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে চিচেন ইৎজা নগরের দিকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল ইৎজল চা। তখন অন্ধকার হয়ে আসছিল বলে ভয় করছিল তার। কিন্তু একই সঙ্গে ঘৃণা, প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধ বাসনায় উন্মত্ত হয়ে সব ভয় ঝেড়ে ফেলে ছুটছিল সে।
প্রধান পুরোহিতের কাছে গিয়ে তার পায়ে পড়ে গেল ইৎজল চা। তাকে চিনতে পেরে প্রধান। পুরোহিত জিউ বলল, আবার কেন ফিরে এলি?
আমি এই কথা তোমাদের জানাতে এসেছি, যে লোকটা আমাকে নিয়ে গিয়েছিল সে আজ রাতে শ্বেতাঙ্গ মেয়েটাকে উদ্ধার করতে আসবে।
প্রধান পুরোহিত জিউ বলল, এই কথা আমাদের জানানোর জন্য তোমাকে এক বিশেষ পুরস্কার দেয়া হবে। তোমার সম্মানের জন্যই বলি দেয়া হবে তোমাকে দেবতাদের উদ্দেশ্যে।
এরপর ইৎজল চাকে বন্দিনী হিসেবে বলির জন্য একটা খাঁচায় রাখা হলো।
টারজান সন্ধ্যার সময় চিচেন ইৎজা নগরের কাছাকাছি এসে ঠিক করল, নগরের সকলে ঘুমিয়ে না পড়লে সে নগরে ঢুকবে না।
বাতাসে গন্ধ শুঁকে টারজান বুঝল, তার বন্ধু হাতিটা নগরের আশে-পাশেই আছে। টারজান হাতিটাকে ডাকতেই সে তার কাছে এল। তারপর তাকে পিঠে চাপিয়ে নগরদ্বার পর্যন্ত পৌঁছে দিল।
নগরপ্রাচীরে উঠে প্রাচীর থেকে লাফ দিয়ে ওদিকের রাস্তার উপর পড়ল টারজান। রাস্তাগুলো তখন ছিল একেবারে ফাঁকা। টারজান অবাধে পিরামিডের মত দেখতে সেই মন্দিরটার তলায় এসে দাঁড়াল।
এদিকে কুমারীদের মন্দিরের দ্বারপথে বারোজন যোদ্ধা ছায়ায় গা-ঢাকা দিয়ে লুকিয়ে ছিল। তারা জানত আজ রাতে টারজান আসবে।
কিন্তু টারজান কাউকে দেখতে না পেয়ে মন্দিরের ভিতরে পা দিতেই একটা বড় জাল এসে ঢেকে ফেলল তাকে। সে তখন অসহায়।
দু’জন পুরোহিত তখন ভেরী বাজাতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে জেগে উঠল সমস্ত শহর। অসংখ্য মানুষ চারদিক থেকে আলো হাতে ছুটে আসতে লাগল।
টারজানকে ধরে সিঁড়ি বেয়ে নিচেতে নামিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। তারপর প্যাট্রিসিয়াকে আনানো হলো কুমারী মন্দির থেকে।
তারপর প্রধান পুরোহিত চান ইপ জিউ-এর নেতৃত্বে টারজান ও প্যাট্রিসিয়াকে নিয়ে এক বিরাট মিছিল বার হলো।
মিছিলটা সমস্ত নগর পরিক্রমা করে নগরসীমানার বাইরে একটা মৃত আগ্নেয়গিরির গহ্বরের পাশে থামল। সেই গহ্বরের তলায় অনেক জল ছিল।
ঢাক, ঢোল, ভেরী প্রভৃতি বাজনার সঙ্গে সঙ্গে পুরোহিত মন্ত্র উচ্চারণ করতে লাগল। তারপর এক সময় তারা টারজানকে ধরে ফেলে দিল সেই গহ্বরের মধ্যে।
প্যাট্রিসিয়া এই ঘটনাতে মর্মাহত হলেও ভেঙ্গে পড়ার মত মেয়ে সে নয়। টারজানকে গহ্বরের জলে ফেলে দেয়ার পর সে গহ্বরের উপর মুখ বাড়িয়ে বলল, টারজান, তুমি কোনরকমে জলে ভেসে থাক। আমি মায়া সভ্যতার লোকদের প্রথা জানি। যদি কোন অপরাধীকে এই পবিত্র কুয়োর জলে ভোরবেলায় ফেলে দিয়ে সে দুপুর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে তাহলে তাকে দেবতা হিসেবে দেখে ওরা।
টারজান হাসিমুখে হাত নাড়ল। প্যাট্রিসিয়ার ভাষা বুঝতে পারল না পুরোহিতরা।
অবশেষে সূর্য মধ্য আকাশে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অস্বস্তিবোধ করতে লাগল প্রধান পুরোহিত চান ইপ জিউ। দুপুর হলেও যদি লোকটা বেঁচে থাকে তাহলে এটাই প্রমাণিত হবে যে সে-ই-বনদেবতা চে। সেটা তার পক্ষে ক্ষতিকর হবে। তখন বনদেবতাই হয়ে উঠবে সর্বেসর্বা।
দুপুর গত হতেই জনতা এক প্রবল উল্লাসে ফেটে পড়ল। কারণ তারা নিজের চোখে দেখল বন্দী তখনো বেঁচে আছে পবিত্র কূয়োর জলে।
একটা দড়িতে ফাঁস লাগিয়ে সেটা ফেলে দেয়া হলো টারজনের কাছে। টারজান ফাসটা ছাড়াই দড়ি ধরে উঠে এল।
টারজান উঠেই রাজা ও প্রধান পুরোহিতের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে লাগল, আমিই বনদেবতা চে, আমি একজন মানুষের বেশ ধারণ করে মর্ত্যে নেমে এসেছিলাম কিভাবে তোমরা রাজ্য শাসন করছ তা দেখার জন্য। কিন্তু তোমাদের শাসনকার্যে সন্তুষ্ট নই আমি। এখন আমি যাচ্ছি। দিনকতক পর আবার এসে দেখব তোমরা কোন উন্নতি করতে পেরেছ কি না। এখন আমি এই মেয়েটিকে নিয়ে যাচ্ছি। ইৎজল চাকে ছেড়ে দাও। আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত কাউকে যেন বলি দেয়া না হয়।
