হঠাৎ একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়াল দিন। দেখল তাদের সামনে কিছু দূরে বিরাট একটা জন্তু পড়ে রয়েছে। জন্তুটা মৃত আর তার উপর একটা পা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অদ্ভুত একটা অস্ত্র হাতে এক আশ্চর্য পোশাক পরা এক নারীমূর্তি।
জালন বুদ্ধিমান। সে তাই সামনে না গিয়ে বনের আড়াল থেকে লুকিয়ে ঘিরে ফেলতে বলল সেই নারীকে।
তারপর একদিক থেকে জালন দিন তার তলোয়ারে একটা শব্দ করতে সেদিকে তাকাল প্যাট্রিসিয়া আর সঙ্গে সঙ্গে জালন দিনের দু’জন যোদ্ধা গিয়ে তার পিছন থেকে একটানে তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিল তার রাইফেলটা।
এরপর এক মুহূর্তে চারদিক থেকে একশোজন যোদ্ধা এসে ঘিরে ফেলল তাকে।
প্যাট্রিসিয়া তাদের দেখে তারা কারা তা বুঝতে পারল। সে শুধু টারজনের মুখ থেকে এই ধরনের লোকদের কথা শোনেনি। সে প্রাচীন মায়া সভ্যতা সম্বন্ধে অনেক বইও পড়েছে।
ইৎজল চার কাছ থেকে শেখা মায়াদের ভাষায় ভাঙ্গা ভাঙ্গা ভাবে সে বলল, তোমরা আমাকে নিয়ে কি করবে?
জালন দিন বলল, সেটা আমাদের প্রধান পুরোহিত জিউ ঠিক করবে। এই বলে সে তার চারজন যোদ্ধাকে চিচেন ইৎজ নগরে বন্দিনীকে বয়ে নিয়ে যেতে লাগল।
প্যাট্রিসিয়াকে চারজন যোদ্ধা ধরে নিয়ে গেলে জালন দিন তার বাকি যোদ্ধাদের নিয়ে শিবির সাইগনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।
এদিকে কর্নেল লে ও তাঁর সঙ্গীরা যে পথে প্যাট্রিসিয়া নেমে এসেছিল পাহাড় থেকে সেই পথে দ্রুতবেগে এগিয়ে যেতে লাগল। হঠাৎ তারা মাথায় পালকের পোশাক পরা একদল আদিবাসী যোদ্ধার সম্মুখীন হলো।
আদিবাসী যোদ্ধারা তাদের দেখতে পেয়েই পাথর ছুঁড়তে লাগল চীৎকার করতে করতে।
কর্নেল তাঁর সঙ্গীদের বললেন, এমনভাবে গুলি করো যাতে গুলিগুলো ওদের মাথার উপর দিয়ে চলে যায়।
কিন্তু জালন দিন যখন দেখল ওদের অস্ত্রগুলো শুধু শব্দ করছে, আঘাত করতে পারছে না তখন সে তার যোদ্ধাদের আক্রমণ চালিয়ে যেতে বলল।
কর্নেল তখন হুকুম দিলেন, ওদের হত্যা করার জন্য গুলি করো।
ওদের রাইফেলগুলো গর্জে উঠল। এক ঝাঁক গুলি ছুটে গেল। তাতে চারজন যোদ্ধা মারা গেল। জালন দিন তবু এগিয়ে যেতে থাকলেও তার যোদ্ধারা গুলির ভয়ে পালাতে লাগল। তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে বিভিন্ন দিকে বনের মধ্য দিয়ে ছুটে পালাতে লাগল।
কর্নেলরা প্রথমে পথ হারিয়ে উল্টোদিকে যাচ্ছিল। তারপর কিছুটা ঘোরাঘুরি করার পর অবশেষে তারা সমুদ্রের বেলাভূমিতে তাদের শিবিরের কাছে এসে পড়ল।
তারা শিবিরের কাছে এলে টিবেট বিষণ্ণ মুখে এগিয়ে এসে একটা দুঃসংবাদ দিল।
টিবেট বলল, বড়ই দুঃসংবাদ স্যার। আমি এই মাত্র শিবির থেকে আসছি। স্মিৎস আর তার বন্দীরা আমাদের শিবির থেকে সব অস্ত্রশস্ত্র এবং বেশ কিছু রসদ নিয়ে পালিয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, ওরা জেনেত্তেকেও ধরে নিয়ে গেছে।
হ্যান্স দ্য গ্রোত্তে টিবেটকে বলল, কোন্ পথে তারা গেছে টিবেট?
সমুদ্রের তীর দিয়ে তাদের পুরনো শিবিরে বোধ হয়।
হ্যান্স মর্মাহত ও ক্রুদ্ধ হয়ে সেই পথে যেতে লাগল।
কর্নেল বললেন, কোথায় যাচ্ছ?
হ্যান্স বলল, আমি তাদের ধরব।
কিন্তু তাদের হাতে এখন অনেক অস্ত্রশস্ত্র। তুমি একা কিছু করতে পারবে না। এখন আমাদের হাতে বাড়তি লোক নেই। ওরা যে কোন সময় আমাদের শিবির আক্রমণ করতে পারে।
গ্রোত্তে অনমনীয়ভাবে বলল, আমি যাবই।
তখন টিবেট বলল, আমিও যাব।
নাইয়াদ জাহাজের দু’জন নাবিকও যেতে চাইল তাদের সঙ্গে। কর্নেল ওদের সাবধান করে দিলেন, খুব সাবধান। সামনের দিকে ওদের শিবিরে না গিয়ে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে লুকিয়ে ওদের শিবিরে যাবে।
ওরা চারজন তখনি সমুদ্রের ধার দিয়ে যাত্রা শুরু করল।
আদিবাসীদের সঙ্গে কর্নেলদের যখন যুদ্ধ হয় তখন রাইফেলের গুলির যে শব্দ হয় সেই শব্দ বনের মধ্যে শুনতে পেয়েছিল টারজান। সেই শব্দ লক্ষ্য করে এগিয়ে আসতে থাকে সে। কিন্তু শব্দটা ঠিক কোন দিক থেকে আসছিল তা ধরতে না পেরে ভুল পথে গিয়ে পড়ে সে।
টারজান দেখল সে শিবির সাইগনের পরিবর্তে স্মিৎসদের শিবিরের কাছে এসে পড়েছে। সে অতি সাবধানে বনের ভিতর দিয়ে ওদের শিবিরের কাছে এসে পড়ল। দেখল স্মিৎসরা প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র ও মালপত্র নিয়ে কোথা হতে ফিরল শিবিরে। সে আরও দেখল ক্রাউজ জেনেত্তেকে টানতে টানতে নিয়ে আসছে। সে তখন বুঝল স্মিৎসদের সঙ্গেই তার শিবিরের লোকদের যুদ্ধ হয়েছে এবং স্মিৎসরাই জয়ী হয়েছে। তবে কি তাদের শিবিরের সব লোক নিহত হয়েছে?
প্যাট্রিসিয়া কোথায়? ইৎজল চারই বা কি হলো?
এদিকে উভয় সংকটে পড়লেন কর্নেল। এখন তার হাতে মাত্র চারজন সশস্ত্র লোক। এই লোক দিয়ে শিবির রক্ষা করা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় প্যাট্রিসিয়ার খোঁজ চিচেন ইজ্জা নগরেও যাওয়া সম্ভব নয়।
কর্নেল যখন এই সব ভাবছিলেন তখন প্যাট্রিসিয়াকে চারজন যোদ্ধা উক্সমাল দ্বীপের রাজা আর প্রধান পুরোহিতের সামনে হাজির করল।
যোদ্ধারা রাজাকে বলল, জালন দিন এই বিদেশী বন্দিনীকে পাঠিয়ে দিল। জালন দিন বাকি যোদ্ধাদের নিয়ে বিদেশীদের শিবিরের দিকে এগিয়ে গেছে। তাদের সঙ্গে যুদ্ধ হয়েছে। আমরা শব্দ শুনতে পেয়েছি।
রাজা বলল, জালন দিন ভালই কাজ করেছে।
প্রধান পুরোহিত জিউ বলল, এই নারীকেই বলি দেয়া হবে দেবতার কাছে।
