ঘটনার স্রোত এইভাবে প্রতিকূলে যাওয়ায় হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল ঠাক চান। তবু সে প্রতিবাদের সুরে বলল, এঁর কাজ আপনি দেখেননি হুজুর। আপনি দেখেননি একটা জন্তু আমাকে গ্রাস করতে এলে ইনি তার পিঠের উপর লাফ দিয়ে পড়ে তাকে মেরে ফেলেন। দেবতা ছাড়া কোন মানুষ সে কাজ করতে পারে না।
প্রধান পুরোহিত ঠাক চানকে বলল, এখান থেকে চলে যাও, তা না হলে তোমাকেও বলি দেয়া হবে অথবা কূয়োর জলে ডুবিয়ে মারা হবে।
ঠাক চান ভয়ে সেখান থেকে চলে গেল।
প্রধান পুরোহিতের কথা টারজান বুঝতে না পারলেও তার হাবভাব এবং ঠাক চানের চলে যাওয়া অর্থ সে বুঝতে পেরেছিল।
টারজান চারদিকে তাকিয়ে বুঝতে পেরেছিল, মন্দিরের বাইরে একটা বাগান আছে। তার ওপারে নগর প্রাচীরের ওধারে শুরু হয়েছে গভীর বন। টারজান দেখল সেখান থেকে নগরপ্রাচীর খুব একটা দূরে নয়।
টারজান এবার প্রধান পুরোহিতকে ফেলে দিয়ে যোদ্ধাদের হাতগুলো সরিয়ে দিয়ে মন্দিরের পাঁচিলে উঠে লাফ দিয়ে বাগানে পড়ল। তারপর বাগান থেকে একটা বড় বাড়ির ছাদে উঠে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে নগরের রাজপথে পড়ল।
রাজপথে যে সব মানুষ ছিল তারা টারজনের নগ্নপ্রায় বাদামী রঙের চেহারাটা দেখে ভয়ে ও বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল।
রাজপথের প্রান্তে ছিল নগরদ্বার। সে দ্বারে কয়েকজন প্রহরী পাহারা দিচ্ছিল। নগরদ্বারের ওপারেই ছিল বন। নগরদ্বারটা কোনরকমে পার হয়ে গেলেই মুক্ত হয়ে যাবে টারজান। কিন্তু প্রহরীরা তাকে বাধা দিল।
টারজান তখন তাদের একজনকে ধরে তার দেহটা দিয়ে ঠেলে অন্যদের সরিয়ে পার হয়ে এগিয়ে যেতে থাকল। কিন্তু হঠাৎ পিছন থেকে একটা পাথর খণ্ড এসে সজোরে তার মাথার পিছন থেকে লাগতেই অচৈতন্য হয়ে মাটিতে পড়ে গেল টারজান।
চেতনা ফিরে পেয়ে টারজান দেখল সে একটা ঘরে একটা কাঠের খাঁচার মধ্যে বন্দী হয়ে আছে। ঘরের মধ্যে ছিল একটা মাত্র জানালা। সেই জানালা দিয়ে অল্প কিছু আলো আসছিল বাইরে থেকে।
টারজান দেখল তার খাঁচার রেলিংগুলো কাঠের এবং সে চেষ্টা করলেই খাঁচা থেকে মুক্ত করতে পারে নিজেকে। কিন্তু খাঁচা থেকে কি করে বেরোবে সেইটাই হলো সমস্যা।
খাঁচার দুটো কাঠের রেলিং খুলে খাঁচা থেকে বার হলো টারজান। একটি রেলিং হাতে লাঠির মত ধরে দরজার কাছে অপেক্ষা করতে লাগল।
সহসা দরজা খুলে একজন যোদ্ধা ঘরের মধ্যে ঢুকতেই টারজান তাকে এমনভাবে মেরে ফেলল যে। সে কোন শব্দই করতে পারল না। খোলা দরজা দিয়ে মুখ বার করে সে দেখল বাইরে অনেক লোক জড়ো হয়েছে। কতকগুলো জয়ঢাক রয়েছে এক জায়গায়। তাদের কোন একটা উৎসব হচ্ছে।
এমন সময় টারজনের চোখে পড়ল সেই ঘরের দরজার বাইরে, একটা মেয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। তাকে ঘিরে আছে চারজন পুরোহিত। একজন পুরোহিত একটা ছুরি ধরে আছে শায়িত মেয়েটির বুকের উপর। মেয়েটিকে তারা হয়ত বলি দেবে। তারই জন্য এ উৎসবের আয়োজন।
যে পুরোহিতের হাতে ছুরি ছিল সে তার ছুরিটা মেয়েটির বুকে বসিয়ে দেবার জন্য হাতটা তুলতেই তার হাত থেকে ছুরিটা কেড়ে নিল টারজান।
তারপর সেই পুরোহিতটাকে দু’হাতে ধরে অন্য দু’জন পুরোহিতের উপর এমনভাবে ফেলে দিল যে তারা মন্দিরের মেঝের উপর মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। বাকি দু’জনকে সে তার হাতের লাঠি দিয়ে মেরে ধরাশায়ী করে দিল।
সমবেত জনতা টারজনের কাণ্ড দেখে ভয়ে ও বিস্ময়ে স্তব্ধ ও হতবাক হয়ে গেল। তারা তাকে কোনরকম বাধা দিতে পারল না।
টারজান তখন বন্দিনী মেয়েটিকে কাঁধের উপর তুলে নিয়ে যে পথে এসেছিল সেই পথে নগর প্রাচীরের দিকে এগিয়ে চলল।
ইৎজল চা নামে যে মেয়েটিকে কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছিল সে নিজেকে মুক্ত করার কোন চেষ্টা করল না। সে ভাবল বনদেবতা চে তাকে উদ্ধার করে যখন বয়ে নিয়ে যাচ্ছে তখন তাকে বাধা দিয়ে কোন লাভ হবে না।
নগর প্রাচীর পার হয়ে মাঠে গিয়ে পড়ল টারজান। মাঠের ওপারেই বন। অবাধে বনের ভিতরে চলে গেল টারজান।
ইৎজল চাকে নিয়ে বনের গভীরে ঢুকে বনদেবতা চে এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসল। সে একটা গাছে। উঠে তার মুখ দিয়ে জোর গলায় এক বিকট চীৎকার করল। সেই চীৎকার শুনে দুটো কিম্ভূকিমাকার জন্তু এসে বনদেবতা চে-র সঙ্গে মিলিত হলো। ইৎজল চা ভাবল ওই দুটো জন্তুও দেবতা; বনদেবতার সহচর। তাদের ভাষা ইৎজল চা কিছুই বুঝতে পারল না।
এবার টারজান চাকে বন থেকে এক পার্বত্য পথে নিয়ে নামিয়ে দিল। ইশারায় তাকে হাঁটতে বলল।
যেতে যেতে পথে এক জায়গায় টারজান ‘ট্যান্টর ট্যান্টর’ বলে ডাকতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে আফ্রিকার এক পুরুষ হাতি ডালপালা ভেঙ্গে ছুটে এল। তার বিরাট চেহারা দেখে মূৰ্ছিত হয়ে পড়ল ইৎজল চা।
চেতনা ফিরে পেয়ে চা দেখল তারা এক বিরাটাকার জন্তুর পিঠে চেপে আছে। বনদেবতা তার পিছনে বসে আছে তাকে ধরে। তার সঙ্গী দু’জন অপদেবতা জন্তুটার পাশে পাশে পথ চলছে।
এইভাবে মাত্র দু-এক ঘণ্টার মধ্যে জীবনে এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা লাভ করল ইৎজল।
তখন বিকাল শেষ হয়ে আসছিল। প্যাট্রিসিয়া ও জেনেত্তে কয়েকজন লোকের সঙ্গে শিবিরের উঠোনে বসে টারজনের কথাটা তখন সকলেই আলোচনা করতে লাগল।
প্যাট্রিসিয়া বলল, ঐ দেখ।
সকলে দেখল বনের ভিতর থেকে এক বিরাট হাতি এগিয়ে আসছে তাদের শিবিরের দিকে। হাতির পিঠে ছিল টারজান। দুটো ওরা; ওটাং হাতিটার দু’পাশে হেঁটে আসছিল।
