কিছুদূর এইভাবে যাবার পর টারজান দেখল দুটো ওরাং ওটাং তার পিছু পিছু আসছে। তারা ওর ভাষা বুঝত এবং শিবিরেই ছিল। টারজান তাদের বলল, গোলমাল করো না। টারজান শিকার করবে।
তারা তাই গাছে চড়ে ডালে ডালে বনের গভীরে চলে গেল।
পাহাড়ের ঢালু জায়গায় টারজান দেখল কয়েকটা হাতি গাছের ডালপালা খাচ্ছে। একটা হাতির গায়ে হাত বুলোতে সে টারজানকে শুড় দিয়ে তার পিঠে চাপিয়ে নিল।
টারজান তখন নালা নালা’ বলে চীৎকার করতেই সে তাকে নামিয়ে দিল।
এরপর সে কিছুদূর গিয়ে হাতিটাকে ডাকতেই সে উত্তর দিল।
ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় ঘন জঙ্গল আর কাছে জল দেখে টারজান বুঝল এটা শিকারের একটা ভাল জায়গা।
সকাল হতেই নাকে শুয়োরের গন্ধ পেল টারজান। এর পরই সে পেল আরো দুটো গন্ধ-একটা সিংহের আর একটা মানুষের।
টারজান এবার গাছের উপর ডালে ডালে সেই গন্ধের সূত্র ধরে এগোতে লাগল।
এদিকে যে লোকটা একটা সিংহ ধরতে যাচ্ছিল সে হলো ঠাক চান। ঠাক চান সিংহ শিকার করতে আসেনি। জীবনে সে সিংহ দেখেনি কখনো। সে এসেছিল একটা শুয়োর শিকার করতে। কিন্তু শিকার করতে এসে হঠাৎ একটা সিংহকে দেখে ছুটে পালাতে থাকে সে।
চাক টুটুল জিউ নামে ঠাক চানের এক পূর্ব-পুরুষ জুকাতান থেকে এই দ্বীপে এসে চিচেন ইজ্জা নামে এক নগর স্থাপন করে। তার আগে সমুদ্রের মধ্যে এই দ্বীপটা দেখে সে তার নাম দেয় উজান বা উক্সনাল।
ঠাক চান শিকারে এসেছিল সেই চিচেন ইজ্জা নগর থেকে।
সিংহটাকে দেখে ভয়ে পালাতে থাকে ঠাক চান। ক্ষুধিত সিংহটার গতির সঙ্গে পেরে ওঠেনি সে। তাই একটা ফাঁকা জায়গা দেখে সেখানে হতাশ হয়ে বসে পড়ে। মৃত্যুর প্রতীক্ষা করতে থাকে। সিংহটা তার কাছে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে।
এমন সময় ঠাক চান দেখল দেবতার মত দেখতে গৌরবর্ণ এক নগ্ন মানুষ গাছ থেকে হঠাৎ সিংহটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
সিংহটা মাটিতে পড়ে যেতেই তার গলাটা একটা হাত দিয়ে ধরে আর একটা হাতে ধরা ছুরিটা সিংহটার পাঁজরে বসিয়ে দিতে লাগল বার বার। সিংহটা কিছুতেই পেরে উঠল না। অবশেষে বার বার ছুরির আঘাতে লুটিয়ে পড়ল সিংহটা।
সিংহটা মরে যেতেই লোকটা তার মৃতদেহের উপর একটা পা রেখে আকাশের দিকে মুখ তুলে এমন ভয়ঙ্করভাবে চীৎকার করে উঠল যা শুনে ভয় পেয়ে গেল ঠাক চান। লোকটা আসলে দেবতা না শয়তান তা বুঝতে পারল না। ভয়ে আচ্ছন্ন হয়ে উঠল তার মনটা।
টারজান বনদেবতা ভেবে ঠাক চান মধুর সম্ভাষণে কৃতজ্ঞতা জানাল তাকে। কিন্তু তার উত্তরে টারজান যা বলল তার কিছুই বুঝতে পারল না সে। ভাবল দেবতারা হয়ত এই ভাষাতেই কথা বলে।
এরপর বনদেবতা টারজানকে সঙ্গে করে সে চিচেন ইৎজা নগরের প্রান্তে এসে হাজির হলো। ঠাক চান হাত বাড়িয়ে নগরটাকে দেখিয়ে বলল, চিচেন ইৎজা।
নগরের বাইরে মাঠে অনেক নারী পুরুষ চাষের কাজ করছিল। নগরদ্বারে যোদ্ধারা পাহারা দিচ্ছিল।
টারজানকে দেখল এক বিরাট প্রাচীর দিয়ে গোটা নগরটা ঘেরা। নগরের মাঝখানে আছে পিরামিডের মত একটা উঁচু মন্দির। নগরের মধ্যে অনেক বড় বড় বাড়ি আছে। নগরের লোকগুলো ঠাক চানের মত বেঁটে খাটো আর বাদামী রঙের।
টারজনের নগ্ন দৈত্যাকার মূর্তির পানে তাকিয়ে সকলেই আশ্চর্য হয়ে গেল। ঠাক চান নগরদ্বারের প্রহরীদের কাছে গিয়ে বনদেবতা চে হিসেবে টারজনের পরিচয় দিল। বলল, একটা বিরাট আকারের হিংস্র জন্তুর কবল থেকে এই দেবতা বাঁচিয়েছে তাকে।
কিছুদিন আগে পাহাড় থেকে যে একদল আদিবাসী সাইগন জাহাজের বিপন্ন যাত্রীদের দেখতে পায়। সেই দলের সর্দার জালন দিনও নগরদ্বারের প্রহরীদের মধ্যে ছিল।
জালন দিন টাজনকে বলল, তুমি যদি বনদেবতা চে হও তাহলে তার প্রমাণ দাও। তাহলে আমাদের রাজা তোমাকে ভক্তি ও সম্মানের সঙ্গে বরণ করে নেবে।
ঠাক চান বলল, দেবতারা মানুষের ভাষা বুঝতে পারে, কিন্তু তাদের সঙ্গে কথা বলে না।
ঠাক চানের কথায় আর টারজনের দেবতার মত চেহারাটা দেখে কিছুটা মুগ্ধ হলো জালন দিন। সে তাই তাদের সঙ্গে করে রাজপ্রাসাদ সংলগ্ন মন্দিরে নিয়ে গেল তাদের।
সেখানে অনেক যোদ্ধা, পুরোহিত ও সর্দার ছিল। জালন দিন একজন পুরোহিতকে ঠাক চানের সব কথা বুঝিয়ে বলল।
টারজান যোদ্ধাদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে ভাবল এই নগরে প্রবেশ করা বুদ্ধিমানের কাজ হয়নি। তাকে তারা ফাঁদে ফেলতে পারে এবং তার থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এরপর প্রধান পুরোহিত চান ইপ প্রথমে টারজনের চেহারা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল। তাকে সম্মানের সঙ্গে সম্বোধন করল। কিন্তু সর্দার জালন দিন তাকে জানাল এই দেবতা কোন মর্ত মানবের সঙ্গে কথা বলেন না।
চান ইপ তাকে বলল, তুমি সমুদ্রের বেলাভূমিতে একদল বিদেশীকে দেখেছিলে। এ তাদেরই একজন নয় ত?
সর্দার জালন দিন বলল, তা হতে পারে হুজুর।
চান ইপ বলল, এ যদি দেবতা হয় তাহলে তারাও সবাই দেবতা। কিন্তু তুমি বলেছিলে এক ভগ্ন জাহাজ কূলের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।
জালন দিন বলল, এ কথা সত্য।
প্রধান পুরোহিত বলল, তাহলে এরা সবাই মানুষ। কারণ দেবতা হলে তারা ঝড় তুফানকে জয় করতে পারত।
এ কথা খুব সত্য।
চান ইপ তখন বলল, তাহলে এই লোকটাকে দেবতার কাছে বলি দেয়া হবে। একে নিয়ে যাও এখান থেকে।
