ওরা দেখল লস্করুদের নৌকাটা খাড়ির কাছে যেতে পারল না। দ্বীপটার কাছে ঢেউএর সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে এক সময় উল্টে গেল। লস্কররা সাঁতার কাটতে কাটতে এগোতে লাগল।
বোল্টন বলল, এখানকার জল অগভীর।
ঝড় আর তুফানের বেগ কমে যাওয়ায় সাইগন ধীর গতিতে এগোচ্ছিল দ্বীপের দিকে। পাহাড়ে গিয়ে ধাক্কা লাগার আর দেরী নেই। তাই এবার নৌকা নামাবার হুকুম দেয়া হলো।
নাবিকরা যখন নৌকা নামানোর কাজে ব্যস্ত ছিল তখন ক্রাউজ চীৎকার করে উঠল খাঁচা থেকে, শোন গ্রোত্তে, তোমরা কি আমাদের ফেলে চলে যাবে? আমরা কি খাঁচার মধ্যে ইঁদুরের মত ডুবে মরব?
গ্রোত্তে টারজনের মুখপানে তাকাল। টারজান জেনেত্তের কাছ থেকে চাবি নিয়ে খাঁচার দরজা খুলে দিয়ে বলল, তোমাদের ছেড়ে দিলাম। এর বেশি কিছু করতে পারব না। তোমরা তোমাদের জীবন রক্ষা করবে। তোমাদের আচরণ যেন ভাল হয়। তোমাদের হত্যা করার যথেষ্ট কারণ ছিল। কিন্তু করব না।
খাঁচা খুলে দিতে ক্রাউজ, স্মিৎস আর আব্দুল্লা বেরিয়ে এল রাগে গর্জন করতে করতে।
বোল্টন চীৎকার করে উঠল, নৌকা ও ভেলা ঠিক করে রাখ। এবার জাহাজে ধাক্কা লাগবে।
জাহাজের যাত্রীরা সবাই এক গভীর ভয় আর উদ্বেগের সঙ্গে শেষ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
পাহাড়ের উপর সাইগন জাহাজটা সরাসরি ধাক্কা লাগাল না। অবশেষে একটা বিশাল ঢেউ এসে জাহাজটাকে মারতে জাহাজটা আটকে গেল পাহাড়ে। আবার পাহাড়ের কাছে টেনে আনতে থাকে।
টারজান এবার বোল্টনকে বলল, আমি ওখানে গিয়ে দেখি জল কতটা। যারা সাঁতার জানে না আমি তাদের কোন নৌকা বা ভেলায় চাপিয়ে দিয়ে কূলে উঠতে সাহায্য করব।
রেলিং-এর উপর তুলে ঝাঁপ দিল টারজান। সকলে জাহাজের উপর রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করতে লাগল টারজানকে।
প্যাট্রিসিয়াও জলে ঝাঁপ দিয়ে টারজনের পাশে গিয়ে বলল, আমি সাঁতার জানি, আমি আপনাকে সাহায্য করব।
জেনেত্তেও ঝাঁপ দিল। কিন্তু সে সাঁতার জানত না। টারজান তাকে ধরে একটা নৌকার উপর চাপিয়ে দিল।
এরপর অনেকেই এগিয়ে এল টারজনের সাহায্যে। হ্যান্স, টিবেট, কোচ, চীনা নাবিকরা আর নাইয়াদ জাহাজের অনেকেই এগিয়ে এল। বাকি সবাই জাহাজ থেকে নেমে কূলে উঠে গেছে।
টারজান প্রথমে ওরাং ওটাংদের ছেড়ে দিল। টারজান তাদের সঙ্গে তাদের ভাষায় কি সব কথা বলল, তারা ভয়ে টারজানকে জড়িয়ে ধরল। টারজান তাদের নামিয়ে দিল।
তারপর বড় বড় জন্তুর খাঁচাগুলো খুলে দেয়া হলো। প্রথমে তিনটে পোষা ভারতীয় হাতিকে ছেড়ে দেয়া হল। মাহুত একটা হাতির পিঠে চেপে রইল। হাতিটা সাঁতার কেটে কূলে গিয়ে পৌঁছল তা দেখে বাকি হাতি দুটোও তাই করল, তা দেখে আফ্রিকার বুনো হাতিগুলোও তাই করল।
এরপর বাঘ আর সিংহদের খাঁচাগুলো খুলে দেয়া হলো। বিপদ বুঝে তারাও নির্বিবাদে জল কেটে কুলে গিয়ে উঠল।
সকলে দেখতে লাগল। জন্তুগুলো ছাড়া পেয়ে কূলে উঠে জঙ্গল দেখতে পেয়ে একে একে সেই জঙ্গলে চলে গেল।
বাকি রইল শুধু সাপগুলো। টারজান বলল, ওরা আমার চিরকালের শত্ৰু, ওরা মরে মরুক।
যাত্রীদের সকলকে কূলে নামিয়ে দিয়ে নাবিকরা খালি নৌকা আর ভেলাগুলো নিয়ে আবার জাহাজে ফিরে এল।
বোল্টন তাই আদেশ দিয়েছিল।
এরপর দুদিন ধরে জাহাজের মালপত্র সব নৌকায় করে কূলে নিয়ে যাওয়া হলো।
তৃতীয় দিন বিকালের দিকে যখন শিবির তৈরির সব কাজ হয়ে গেল তখন সকলের অলক্ষ্যে পাহাড়ের মাথা থেকে এক ডজন লোক বেলাভূমিতে বসে থাকা একদল অচেনা বিদেশী লোকদের দেখতে লাগল। এই প্রথম তারা তাদের দ্বীপে বিদেশী মানুষ দেখল।
পাহাড় থেকে যারা সাইগন জাহাজের বিপন্ন যাত্রীদের লক্ষ্য করছিল তারা ছিল সেই দ্বীপের আদিবাসী যোদ্ধা। তাদের কোমরে এক ধরনের লাল ছোট কাপড় জড়ানো ছিল, পায়ে ছিল চামড়ার চটি। মাথায় পালক, হাতে গয়না। তাদের সর্দার জালন দিনের বেশভূষা ছিল সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ।
তাদের হাতে ছিল তীর ধনুক। প্রত্যেকের পিঠে ছিল দুটো করে তৃণ। আর ছিল একটা বর্শা আর পাথর ছোঁড়ার গুলতি। এছাড়া ছিল একটা করে কাঠের তলোয়ার, বর্শা আর চামড়া দিয়ে মোড়া কাঠের ঢাল।
সেদিন দুপুরবেলায় জাহাজ থেকে আনা মানচিত্রটা খুঁটিয়ে দেখতে লাগল ক্যাপ্টেন বোল্টন। কিন্তু দেখল মানচিত্রে সমুদ্রের একশো মাইলের মধ্যে কোন দ্বীপের উল্লেখ নেই।
বোল্টন বলল, এমন হতে পারে যে এই দ্বীপটা এখনো পর্যন্ত অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে।
দলের সবাইকে ডেকে টারজান বলতে লাগল, এই শিবিরে স্মিৎস, ক্রাউজ, আব্দুল্লা আর উবানোভিচকে থাকতে দেব না। ক্যাপ্টেন বোল্টন বলেছে, এ দ্বীপে হয়ত আমাদের সারাজীবন কাটাতে হবে। ওরা থাকলে আবার গোলমাল বাধবে।
এরপর সে ক্রাউজ, আব্দুল্লা, স্মিৎস আর উবানোভিচকে বলল, তোমরা এখান থেকে উত্তর দিকে চলে যাও। এখান থেকে দশ মাইলের মধ্যে আসতে পারবে না তোমরা। এলে হত্যা করব আমি তোমাদের।
উবানোভিচ বলল, ঠিক আছে, আমরা যাব। কিন্তু অস্ত্রশস্ত্র ও খাবারের ভাগ নিয়ে যাব আমাদের সঙ্গে।
টারজান বলল, তোমরা জীবন নিয়ে যেতে পারছ এটাই যথেষ্ট।
শিবির গড়ার কাজ হয়ে গেলে অস্ত্র তৈরির কাজে মন দিল টারজান।
একদিন খুব সকালে অন্যরা ঘুম থেকে না উঠতেই তার অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শিকারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল টারজান। নদীটার গতিপথ ধরে এগিয়ে চলল সে। কিন্তু নিচে অনেক ঘন ঝোপঝাড় থাকায় গাছের ডালে ডালে এগিয়ে চলল সে।
