টারজানকে দেখতে পাবার সঙ্গে সঙ্গে চীৎকার করে চাঁদকে সাবধান করে দিয়ে বন্দুকের ঘোড়াটা টিপে দিল। গুলিটা ছাদে গিয়ে লাগল। টারজান তার বন্দুকটা আর টিবেট চাঁদের বন্দুকটা ছিনিয়ে নিল।
এরপর স্মিৎস আর চাঁদকে টারজান একটা খালি খাঁচার কাছে এনে তার চাবি খুলে বন্দী স্মিৎস আর চাঁদকে তার মধ্যে ঢুকতে বলল।
এমন সময় ঝড়ের গর্জনকে ছাপিয়ে একটা গুলির শব্দ নিচের থেকে কানে এল টারজনের। সে তখন সেই শব্দ লক্ষ্য করে ছুটে গেল।
ঘটনাস্থলে গিয়ে টারজান দেখল কয়েকজন সশস্ত্র লস্কর আর তার লোকদের আক্রমণ করেছিল। কিন্তু কোন ক্ষতি করতে পারেনি।
টারজান দেখল তিন-চারজন লস্কর পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। টারজান দুটো পিস্তল হাতে তাদের পিছন দিকে গিয়ে বলল, পিস্তলগুলো ফেলে দাও। তা না হলে গুলি করব।
মুখ ঘুরিয়ে টারজনের দু’হাতে দুটো পিস্তল দেখে দু’জন লস্কর তাদের পিস্তল দুটো ফেলে দিল।
এরপর প্রতিপক্ষদের সকলকে নিরস্ত্র করা হল। যার কাছে যা কিছু ছিল সব কেড়ে নেয়া হলো। সাইগনের চীনা নাবিকরা ও নাইয়াদ জাহাজের নাবিকরা কোন বাধা না দিয়ে খুশি হয়ে চলে এল। টারজনের দলে। আধপাগলা স্মিৎসের অধীনে তারা আর কাজ করতে চাইছিল না।
জাহাজটাকে সম্পূর্ণরূপে দখল করার পর টারজান একটা সেলুনের মধ্যে সবাইকে ডাকল।
টারজান দখল করা নাইয়াদ জাহাজের ক্যাপ্টেন বোল্টনকে বলল, তুমি এই জাহাজের ক্যাপ্টেন হবে। হ্যান্স দ্য গ্রোত্তে হবে তোমর প্রথম মেট আর টিবেট হবে দ্বিতীয় মেট। হ্যান্স বলেছে এ জাহাজে দুটো কেবিন আছে। একটাতে থাকবে কর্নেল আর তার স্ত্রী আর অন্যটাতে থাকবে প্যাট্রিসিয়া আর জেনেত্তে।
টারজান এবার হ্যান্স দ্য গ্রোত্তের কাছে গিয়ে সব কথা বলে বলল, উবানোভিচের খবর কি?
আমি তাকে ডেকে পাঠিয়েছি। এখনি এসে পড়বে।
গ্রোত্তে বলল, লোকটা কোন পক্ষেই নেই। ও লোকটা হাড়ে হাড়ে কমিউনিস্ট। এই যে এসে গেছে।
উবানোভিচকে দেখে রাগান্বিত আর সন্দিগ্ধ মনে হলো। সে রুষ্ট হয়ে বলল, তোমরা এখানে সব দাঁড়িয়ে কি করছ। স্মিৎস কোথায়?
সে আছে ক্রাউজের সঙ্গে একই খাঁচাতে। বিদ্রোহের সঙ্গে তোমার কোন যোগাযোগ ছিল কি না তা আমি জানি না। এখন তুমি যদি জাহাজে ইঞ্জিনীয়ার হিসেবে আগের মত কাজ করে যেতে চাও তাহলে কেউ কোন প্রশ্ন করবে না।
উবানোভিচ বলল, ঠিক আছে। তাই হবে।
টারজান বলল, বোল্টন এখন এ জাহাজের ক্যাপ্টেন। তার কাছে বল যে তুমি ইঞ্জিনীয়ার।
এমন সময় তাদের পিছন থেকে একটা গুলির শব্দ এল। ডেকের সামনের কাঁচের জানালাটা ভেঙ্গে গেল সেই গুলিটা লাগায়। তারা মুখ ঘুরিয়ে দেখল আব্দুল্লা মই-এর সবচেয়ে উপরের ধাপে একটা ধূমায়িত পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে আছে।
আব্দুল্লা আবার একটা গুলি করল। কিন্তু জাহাজটা প্রবলভাবে দুলছিল বলে লক্ষ্যভ্রষ্ট হল তার গুলি। সঙ্গে সঙ্গে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল টারজান। টাল সামলাতে না পেরে মই-এর উপর থেকে পিছন দিকের। ডেকে চিৎ হয়ে পড়ে গেল আব্দুল্লা। তার উপর টারজান পড়ে গেল।
ক্যাপ্টেন বোল্টন যে দু’জন লোককে টারজনের কাছে পাঠিয়েছিল তারা এই ঘটনা দেখতে ছুটে গেল। দেখল টারজনের গায়ে কোন আঘাত লাগেনি। সে সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়ল। কিন্তু আব্দুল্লা অচেতন হয়ে পড়ে আছে।
জেনেত্তের কাছ থেকে খাঁচার চাবি আনতে পাঠিয়ে দিল টারজান। তারপর যে আঁচাতে ক্রাউজ আর স্মিৎস ছিল সেটা খুলতে বলে আব্দুল্লার অচেতন দেহটাকে টানতে টানতে এনে সেই খাঁচার মধ্যে ঢুকিয়ে দিল।
ঝড়ের বেগ প্রচণ্ড হয়ে উঠল আবার। টারজান বুঝতে পারল নির্দিষ্ট পথ হতে অন্য দিকে সরে যাচ্ছে সাইগন। মাস্তুল ঝড়ে উড়ে গেছে।
তখন ভোর হয়ে আসছিল। বোল্টনের কথায় টারজান দূরে তাকিয়ে দেখল ঝড় আর স্রোতের আঘাতে মাস্তুলহারা সাইগন দুর্বার বেগে পাহাড়-ঘেরা এক দ্বীপের দিকে ভেসে চলেছে।
বোল্টন বলল, জাহাজটা জোরে গিয়ে ঐ সব পাহাড় প্রাচীরের গায়ে ধাক্কা লাগলে ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। তার থেকে এখন থেকে নৌকা নামিয়ে সবাইকে পাঠিয়ে দেয়া হোক। ডান দিকে একটা ফাঁক আছে খাড়ির মত। সেখান থেকে কূলে ওঠা সহজ হবে।
বোল্টন নৌকা নামানোর হুকুম দিতেই কয়েকজন লস্কর একটা নৌকা নামিয়ে কূলের দিকে চলে গেল। হ্যান্স দ্য গ্রোত্তে বাধা দেবার সুযোগ পেল না। অন্যান্য লস্কররা নৌকা নামানোর চেষ্টা করতেই বোল্টন ও টিবেট পিস্তল উঁচিয়ে তাদের সামনে দাঁড়াতেই তারা থেমে গেল।
বোল্টন বলল, যে আমাদের কথা মানবে না তাকেই গুলি করবে। এখন আমরা দেখব ওরা কোথায় কিভাবে গিয়ে কূলে ওঠে।
সাইগন অসহায়ভাবে পাহাড় প্রাচীর দিয়ে ঘেরা দ্বীপটার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। ওদিকে লস্করদের নৌকাটাও উত্তাল সমুদ্রের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে এগোতে লাগল।
টারজান বলল, ঝড় আর সমুদ্রের তুফান দুটোই শান্ত হয়ে আসছে। দ্বীপের কাছে সমুদ্র অনেক শান্ত। সেখানে গেলে নৌকা নামালে কূলে ওঠা সহজ হবে।
বোল্টন বলল, আপনি ঠিকই বলেছেন। তবে ক্যাপ্টেন হিসেবে আমি একা জাহাজে থাকব। আমাদের সকলের জীবন যেখানে বিপন্ন তখন চারটে নৌকা নামিয়ে যাত্রীদের যেতে বলব।
কিন্তু সকলেই লস্করদের নৌকাটার কি হয় তা দেখার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠল। কেউ নৌকায় করে। যাবার ঝুঁকি নিতে চাইল না।
