কয়েকজন নাবিক ও লস্কর খাবার ও জল নিয়ে এল বন্দীদের জন্য।
খাবারগুলো ছিল পরিমাণে কম এবং বাজে। টারজানকে একখণ্ড কাঁচা মাংস দেয়া হলো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই টারজনের গলা থেকে বেরিয়ে আসা সিংহের গর্জনের মত একটা শব্দ শুনতে পেয়ে পেনিলোপ বলে উঠল আশ্চর্য হয়ে, দেখ, দেখ, লোকটা কাঁচা মাংস খাচ্ছে আর সিংহের মত গর্জন করছে।
টারজান জেনেত্তের মুখপানে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
টারজান প্রতিদিন লক্ষ্য করত রাতের একজন প্রহরী রোজ রাত চারটের সময় খাঁচার বন্দীদের পরিদর্শন করে যায়। সে তখন একাই আসে। তবে স্মিৎস তার নিরাপত্তার জন্য একটা পিস্তল দিয়েছিল তাকে।
রাত গম্ভীর হলে মুষলধারে বৃষ্টি নামল। ঝড়ের বেগ হয়ে উঠল প্রবল। ভয়ানকভাবে দুলতে লাগল সাইগন জাহাজটা।
টারজান তার খাঁচার মধ্যে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে এই দুর্যোগটা দেখছিল। সে দেখল তাদের পাশের খাঁচাটায় সেই ইংরেজ মেয়ে প্যাট্রিসিয়াও দাঁড়িয়ে আছে।
টারজান অপেক্ষা করছিল পরিদর্শনকারী সেই পাহারাদারটার জন্য। কিন্তু সে রাতে পাহারাদার এল না।
ইংরেজ মেয়েটিকে পায়চারি করতে দেখে টারজনের মনে হলো, সত্যিই কাজের। যে কোন অবস্থার সম্মুখীন হতে পারে সাহসের সঙ্গে। মুখ বুজে সব দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে পারে।
টারজান বুঝতে পারল মেয়েটি সুযোগ আসার অপেক্ষায় আছে। সুযোগ এলেই সাহস আর বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাজ করে যাবে সে।
টারজান প্যাট্রিসিয়ার খামার কাছে এসে দেখল, মেয়েটির ঝড় বৃষ্টির বেগ ও জাহাজের দোলানিটাকে সহজভাবে মেনে নিচ্ছে।
টারজান মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করল, আপনি একজন ইংরেজ?
হ্যাঁ।
৪১৫
আমার নাম প্যাট্রিসিয়া লে বার্ডেল। আপনার নামটি জানতে পারি কি?
আমার নাম টারজান।
আপনাকে কিভাবে খাঁচায় ভরা হলো তা বলবেন কি মিস্টার টারজান?
আব্দুল্লা আবু নেজিম আমার উপর প্রতিশোধ নেবার জন্যই আমাকে এই খাঁচায় এনে ভরে। সে আমাকে আফ্রিকার এক সর্দারের সহায়তায় ধরে। আব্দুল্লা আমাকে ক্রাউজ নামে একটা লোকের কাছে। বিক্রি করে। ক্রাউজ আমেরিকায় বিক্রি করার জন্য কিছু জন্তু জানোয়ার সংগ্রহ করে। আমার খাঁচার পাশে একটা খাঁচায় বন্দী আছে ক্রাউজ। স্মিৎস একদিন ক্রাউজের এই জাহাজের দ্বিতীয় মেট ছিল। সে ক্রাউজের জাহাজ দখল করার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ও তার জন্তু জানোয়ারগুলো সব তার দখলে আসে। ক্রাউজও এখন তার হাতে বন্দী।
তবে সমুদ্রের অবস্থা যদি আরো খারাপ হয় তাহলে সে আমাদের বেশিদিন আটকে রাখতে পারবে বলে মনে হয় না।
প্রচণ্ড ঝড়ে ও তুফানে জাহাজটা তখন দুলছিল ভীষণভাবে।
রাত্রি শেষ হলো অবশেষে। কিন্তু ঝড়ের বেগ কমল না। মাঝে মাঝে এক একটা ঢেউ এসে জাহাজের ডেকটাকে ভাসিয়ে দিচ্ছিল। যারা খাঁচার ভিতরে বন্দী ছিল তারা সবাই ভিজে গেল।
সেদিন বন্দীদের কেউ খাবার দিয়ে গেল না। ডেকের নিচে ক্ষুধার্ত পশুগুলো গর্জন করতে লাগল। দুর্যোগের তৃতীয় দিনের বিকালের দিকে দু’জন চীনা নাবিক বন্দীদের কিছু খাবার দিয়ে গেল। খাবার বলতে ছিল ঠাণ্ডা সঁতসেঁতে বিস্কুট।
এদিকে টারজান যার জন্য অপেক্ষা করছিল সে এসে গেল অবশেষে। অশোকা নামে এক লস্কর খাঁচাগুলো পরিদর্শন করতে এল।
অশোকা ডেকের উপর এলে জাহাজের আলোয় তাকে দেখতে পেল টারজান।
অশোকা যখন খাঁচাগুলোর সামনে দিয়ে চলে গেল টারজান তখন খাঁচার দুটো রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে। ছিল। জেনেত্তেও তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে বুঝতে পারল কিছু একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটবে।
জেনেত্তে দেখল টারজান খাঁচার রেলিং দুটোর উপর তার গায়ের সব শক্তি প্রয়োগ করছে। খাঁচার রেলিং দুটো বেঁকে ফাঁক হয়ে গেল এক সময়।
টারজান বেরিয়ে পড়ল খাঁচা থেকে।
অশোকা যখন শেষ খাঁচাটার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল তখন তার পিছন থেকে কে এসে তার গলাটা টিপে ধরল। তার বন্দুকটা ছিনিয়ে নিল সঙ্গে সঙ্গে।
তা দেখে জেনেত্তে খাঁচার সেই ফাঁক দিয়ে দু’হাতে দু’টো পিস্তল নিয়ে বেরিয়ে এল।
অশোকা চীৎকার করার চেষ্টা করলে টারজান তাকে বলল, চেঁচালে মেরে ফেলব।
টারজান পিছন ফিরে দেখল জেনেত্তে তার পিছু পিছু আসছে। সে তখন অশোকার কাছে থেকে খাঁচাগুলোর চাবির গোছাটা নিয়ে জেনেত্তের হাতে দিয়ে বলল, সব খাঁচার দরজাগুলো খুলে দাও।
টারজান নিচু গলায় বন্দীদের বলল, তোমরা আমার সঙ্গে চলে এস। শুধু কর্নেল আর মেয়েরা থাকবে।
তারপর অশোকাকে খাঁচার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে জেনেত্তেকে বলল, খাঁচাটায় চাবি দিয়ে দাও।
নাইয়াদ জাহাজ থেকে আসা লোকগুলোকে পিছন ফিরে দেখে চিনতে পারল টারজান। অশোকার থেকে উদ্ধার করা পিস্তলটা হ্যান্স দ্য গ্রোত্তেকে দিল টারজান। তারপর জেনেত্তেকে বলল, দখল করা নাইয়াদ জাহাজের দ্বিতীয় মেট টিবেটকে একটা পিস্তল দিতে বল।
টারজান টিবেটকে বলল, তুমি আমার সঙ্গে এস। হ্যান্স জাহাজ চালাবে।
এরপর সে অন্যান্য লোকদের বলল, তোমরা যে যা পার যা হোক একটা করে অস্ত্র তুলে নিয়ে আমার সঙ্গে এস। কারণ লড়াই হবেই।
ঝড়টা আবার নতুন করে শুরু হল। সাইগন জাহাজটা আবার দুলতে লাগল আগের মত। টারজান তার দলবল নিয়ে মই বেয়ে ব্রিজের উপরে উঠল। সেখানে লস্কর চাঁদ চাকা ধরে ছিল আর স্মিৎস পাহারা দিচ্ছিল।
