এরপর স্মিৎস খাঁচাটার কাছে এসে টারজানকে ভাল করে দেখে বলল, ও কি ঘুমোচ্ছে না কি ওকে খুন করেছ তুমি?
সহসা টারজান তার একটা হাত খাঁচা থেকে বার করে স্মিৎসের হাঁটুটা ধরে ফেলল। টারজান তখন স্মিৎসের হাঁটুটা খাঁচার ভিতরে টেনে আনতে স্মিৎস পড়ে গেল। সে চীৎকার করে উঠতে টারজান আর একটা হাত দিয়ে তার পিস্তলটা টেনে নিল।
স্মিৎস চীৎকার করতে লাগল, বাঁচাও, বাঁচাও। আব্দুল্লা, জবু সিং, চাঁদ, বাঁচাও।
আবদুল্লা জবু সি, চাঁদ স্মিৎসের চীৎকার শুনে ছুটে এল। কিন্তু টারজান তাদের দিকে পিস্তলটা উঁচিয়ে ধরতে তারা থেমে গেল।
টারজান বলল, খাবার আর জল এনে দাও, তা না হলে তোমার হাঁটুটা ভেঙ্গে দেব।
ক্রাউজ আর হ্যান্স দ্য গ্রোত্তে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল।
স্মিৎস খাবার আর জল আনার জন্য চীৎকার করতে লাগল। সহসা হ্যান্স টারজানকে লক্ষ্য করে বলে। উঠল, দেখ, তোমার পিছনে কি?
কিন্তু টারজান পিছনে ফিরে দেখার আগেই একটা পিস্তল গর্জে উঠল এবং টারজান পড়ে গেল। জবু সিং খাঁচার পিছন দিক দিয়ে চুপি চুপি গিয়ে গুলি করে তার পিস্তল থেকে।
স্মিৎস ছাড়া পেয়ে সরে গেল। জবু সিং টারজনের উপর আবার গুলি করতে গেলে জেনেত্তে টারজনের পিস্তলটা তুলে নিয়ে জবু সিংকে লক্ষ্য করে গুলি করল। গুলিটা তার ডান হাতে লাগল। তার পিস্তলটা হাত থেকে পড়ে যেতে জেনেত্তে খাঁচার ধার থেকে সেটা তুলে নিল।
জেনেত্তে এবার হাঁটু গেড়ে বসে টারজনের বুকের উপর কান পেতে তার হৃৎস্পন্দন শোনার চেষ্টা করতে লাগল।
স্মিৎস উঠে দাঁড়িয়ে এক নিষ্ফল আক্রোশে চেঁচামেচি করছিল। এমন সময় সে একটা জাহাজ দেখতে পেয়ে ভাল করে সেটা দেখার জন্য উপরে উঠে গেল। সাইগন জাহাজের উপর কোন পতাকা ছিল না তখন। দরকার মত যে কোন একটা জাতীয় পতাকা উড়িয়ে দেবে সে।
দেখা গেল দূরে দেখতে পাওয়া জাহাজটা এক ইংরেজ জাহাজ। সে সঙ্গে সঙ্গে সাইগনের উপর একটা ইংরেজ পতাকা উড়িয়ে দিল। তারপর বেতারে সেই জাহাজের কাছে খবর পাঠিয়ে একজন ডাক্তার পাঠাতে বলল।
সেই অচেনা জাহাজটা জানাল তাদের সঙ্গে একজন ডাক্তার আছে। স্মিৎস জানাল, সে এখনি একটা নৌকা পাঠাচ্ছে।
স্মিৎস তখন বেশ কিছু পিস্তল, রাইফেল, ছোরা, রড় প্রভৃতি অস্ত্র গোপনে একটা নৌকার উপরে তুলে নিয়ে সে নিজে কয়েকজন নাবিককে নিয়ে নৌকাটায় উঠে বসল।
জাহাজটার কাছে গিয়ে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তারা জাহাজে উঠে পড়ল। এমন সময় দেখা গেল সাইগনে জার্মান পতাকা উড়ছে।
জাহাজটাতে ছিল পঁচিশ তিরিশজন লোক আর দু’জন মহিলা। স্মিৎসের জলদস্যুসুলভ কারবার দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল জাহাজের ক্যাপ্টেন। স্মিৎসকে বলল, এ সবের মানে কি?
স্মিৎস তার সাইগন জাহাজে উড়তে থাকা জার্মান পতাকাটা দেখিয়ে বলল, এর মানে হলো আমি জার্মান সরকারের পক্ষ থেকে তোমাদের গ্রেফতার করলাম। এ জাহাজ এখন আমাদের দখলে। তোমাদের ইঞ্জিনীয়ার এবং জাহাজ চালক জাহাজ চালিয়ে নিয়ে যাবে। আমার প্রথম মেট জবু সিং দেখাশোনা করবে। সে কিছুটা আহত। তোমাদের ডাক্তার তার ক্ষতটা বেঁধে দেবে। বাকি তোমরা সবাই আমার সঙ্গে জাহাজে গিয়ে উঠবে। মনে রাখবে এখন তোমরা যুদ্ধবন্দী। সেই মত আচরণ করবে।
দখল-করা জাহাজের ক্যাপ্টেন স্মিৎসকে বলল, কিন্তু আমাদের জাহাজ ত যুদ্ধ জাহাজ নয়, কোন পণ্যবাহী জাহাজও নয়। এটাকে কি জন্য দখল করবেন?
লম্বা চেহারার একজন যুবক বলল, হ্যাঁ, এটা দখল করতে পারেন না।
স্মিৎস তাকে ধমক দিয়ে বলল, চুপ করো। তোমরা ইংরেজ। এইটাই জাহাজ দখল করার যথেষ্ট কারণ। এখন এস। তোমাদের ডাক্তার কই?
ডাক্তার যখন জবু সিং-এর ক্ষতটা বেঁধে দিচ্ছিল তখন স্মিৎস আর তার লোকজন জাহাজের ভিতরটা খোঁজাখুঁজি করে কতকগুলো পিস্তল আর শিকারের রাইফেল পেল। সেগুলো নিয়ে তার লোকজনকে কিছু নির্দেশ দিয়ে সে বন্দীদের নিয়ে তার জাহাজে চলে গেল।
জবু সিং-এর গুলিটা টারজনের মাথার একটুখানি চামড়া ছিঁড়ে দিয়ে চলে যায়।
সে তাই কিছুক্ষণের জন্য অজ্ঞান হয়ে থাকে। আঘাতটা জোর হয়নি। তাই সে কিছুক্ষণ পরেই উঠে বসল।
অন্য জাহাজ থেকে স্মিৎস কয়েকজন লোককে বন্দী করে নিয়ে এলে জেনেত্তে বলল, স্মিৎস জলদস্যু হয়ে গেছে। ঐ সব লোকগুলোকে নিয়েও কি করবে তা বুঝতে পারছি না। ওরা সংখ্যায় প্রায় পনেরজন হবে।
বন্দীদের মধ্যে থেকে আটজনকে স্মিৎস জাহাজ চালানোর কাজে পাঠিয়ে দিল। তারপর দুটো খাঁচা এনে বন্দীদের বলল, কে কার সঙ্গে কোন্ খাঁচায় থাকবে বেছে নাও।
একটি মেয়ে তার কাকা ও কাকিমাকে নিয়ে ছোট খাঁচাটায় ঢুকল। অন্য খাঁচাটায় ঢুকল দখল করা জাহাজের ক্যাপ্টেন বোল্টন, দ্বিতীয় মেট টিবেট, ডাক্তার ক্রোক আর এ্যালজারনন নামে এক যুবক।
যে খাঁচাটায় কর্নেল উইলিয়াম সিসিল লে, তার স্ত্রী পেনিলোপ লে আর ভাইঝি প্যাট্রিসিয়া ছিল সেই খাঁচাটা ছিল টারজানদের খাঁচাটার ঠিক পাশে। ৭৭
পেনিলোপ লে টারজানকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে তার ভাইঝিকে বলল, কি ভয়ঙ্কর ব্যাপার! লোকটা প্রায় উলফঙ্গ।
প্যাট্রিসিয়া বলল, লোকটা কিন্তু দেখতে খুব সুন্দর কাকিমা।
স্মিৎস এবার চীৎকার করে বলতে লাগল, এবার এই সব জন্তুদের খাবার দেয়া হবে।
