হ্যান্স চীৎকার করে বলতে লাগল, এ কাজ করো না স্মিৎস।
ধমক দিয়ে হ্যান্সকে থামিয়ে দিয়ে স্মিৎস আবার বলল, যাও বলছি।
এরপর তার লোকদের বলল, রড় দিয়ে ওকে খুঁচিয়ে খাঁচায় ঢুকিয়ে দাও।
কিন্তু একজন জেনেত্তেকে লোহার রড় দিয়ে খোঁচাতে গেলে টারজান গর্জন করতে করতে এগিয়ে এল। সঙ্গে সঙ্গে তিনটে পিস্তল তার দিকে ধরা হলো।
জেনেত্তে ভয় পেয়ে গেলেও সে ওদের পীড়নের ভয়ে ঢুকে পড়ল খাঁচার মধ্যে। সঙ্গে সঙ্গে খাঁচার দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
হ্যান্স, স্মিৎস, ক্রাউজ, নাবিকরা সবাই স্তব্ধ বিস্ময়ে দেখতে লাগল ব্যাপারটাকে।
খাঁচার ভিতরে ঢুকেই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কি হয় তা দেখতে লাগল জেনেত্তে। সে টারজনের মুখপানে তাকাল এবং টারজানও তার মুখপানে তাকাল। জেনেত্তে দেখল টারজনের মুখে হাসি ফুটে উঠেছে একফালি। হাসিটা দেখে আশ্বস্ত হলো জেনেত্তে। তার মনে হলো টারজনের হাসিটা বন্ধুত্বপূর্ণ। তা দেখে সে নিজেও হাসল।
টারজান এবার স্মিৎসের দেয়া হারপুনটা তুলে নিয়ে জেনেত্তের হাতে দিল সেটা।
হ্যান্স প্রথমে ভাবল টারজান হয়ত খুন করতে যাচ্ছে জেনেত্তেকে। তাই সে চীৎকার করে উঠেছিল ভয়ে। স্মিত্সকে বলল, লোকটাকে গুলি করো স্মিৎস।
কিন্তু টারজান কিছুই করল না দেখে সকলেই আশ্বস্ত হলো।
জেনেত্তের প্রতি টারজনের বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব দেখে হতাশ হয়ে পড়ল স্মিৎস। সে ভেবেছিল তাকে হয়ত ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে টারজান। তাই সে আব্দুল্লাকে বলল, লোকটা আসলে বন্য নয়, ওর বেশ টনটনে জ্ঞান আছে। আব্দুল্লা তুমি একটা মিথ্যাবাদী।
আবদুল্লা স্মিৎসকে বলল, তুমি যদি মনে করো লোকটা বন্য বর্বর নয়, তাহলে তুমি নিজে তার খাঁচায় গিয়ে ঢুকতে পার।
পরদিন সকালে লোহার খাঁচার দু’জন বন্দী হাসিখুশিতে মেতে উঠল। যে বন্য লোকটিকে আব্দুল্লা নরখাদক বলে অভিহিত করেছে, যে কাঁচা মাংস খাবার সময় সিংহের মত গর্জন করে, যে তিনজন আফ্রিকান যোদ্ধাকে হত্যা করেছে সেই লোকটির সঙ্গে খাঁচার ভিতরে একটি রাত্রি কাটানো সত্ত্বেও জেনেত্তে দেখল তার দেহ অক্ষত আছে। কোন ক্ষতি হয়নি তার।
তা দেখে জেনেত্তে সকালে উঠেই এত খুশি হলো যে আনন্দের আবেগে একটা জনপ্রিয় ফরাসী গান গাইতে লাগল।
এদিকে টারজান খুশি হলো মেয়েটি ফরাসী বুঝতে পারার জন্য।
ফরাসী ভাষায় টারজান জেনেত্তেকে বলল, সুপ্রভাত!
বহুদিন আগে একজন ফরাসী লেফটেনেন্টের কাছে ফরাসী ভাষা শেখার সময় কথাটা শেখে টারজান।
জেনেত্তে তাকে সুপ্রভাত জানিয়ে আশ্চর্য হয়ে টারজনের মুখপানে তাকাল। তারপর বলল, ওরা যে বলেছিল তুমি নাকি কথা বলতে পার না।
টারজান বলল, একটা দুর্ঘটনায় আমি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম। এখন ঠিক হয়ে গেছি।
এতে আমি আনন্দিত।
টারজান বলল, তুমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলে। আমাকে ভয় পাবার কিছু নেই।
ওরা কত ভয়ঙ্কর কথা বলেছিল। তুমি হয়ত শুনেছ তাদের কথা।
আমি কোন কথা বলতে পারিনি। তাদের কথা বুঝতেও পারিনি। তারা কি কি বলেছিল?
তারা বলেছিল তুমি বড় হিংস্র। তুমি নাকি মানুষ খাও।
টারজনের মুখে আবার হাসি ফুটে উঠল। বলল, তারা তাই তোমাকে আমার খাঁচায় ভরে দেয়। ভেবেছিল আমি তোমাকে খেয়ে ফেলব। কে তোমাকে খাঁচায় ভরেছিল?
স্মিৎস, যে বিদ্রোহী হয়ে উঠে জাহাজ দখল করে।
টারজান বলল, ঐ লোকটাই আমার মুখের উপর থুথু ফেলেছিল।
টারজনের গলার মধ্যে সিংহের গর্জনের একটা আভাস পেল জেনেত্তে। আব্দুল্লা ঠিকই বলেছে। লোকটা সিংহের কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে এখন আর কোন ভয় পায় না সে।
স্মিৎস কেন তোমায় ঘৃণা করে?
জেনেত্তে বলল, আমি তা জানি না। সে এক দুঃখবাদী বাতিকগ্রস্ত লোক। সে বেচারা লুম চিপের কি অবস্থা করেছে তা তুমি দেখেছ। সে অন্যান্য চীনা নাবিকদের কথায় কথায় লাথি মারে ও আঘাত করে।
আমি আশা করি জাহাজে কি কি ঘটেছে তা তুমি আমায় বলবে। আমি তা বুঝতে পারিনি। ওরা আমাকে নিয়ে কি করতে চায় তা যদি জেনে থাক তাও বলবে।
ক্রাউজ ত তোমাকে তার অন্যান্য পশুদের সঙ্গে একজন লোক হিসেবে শহরের লোকদের দেখাবার জন্য আমেরিকায় নিয়ে যাচ্ছিল।
ক্রাউজই এখন প্রথম মেটের সঙ্গে একটা খাঁচায় বন্দী হয়ে আছে। তাই না?
হ্যাঁ।
এবার তুমি ওদের বিদ্রোহের কথাটা ভেঙ্গে বল। স্মিসের পরিকল্পনাটাই বা কি সে সম্বন্ধে যা জান বল।
জেনেত্তের সব কথা বলা শেষ হলে টারজান বুঝতে পারল সাইগন জাহাজে কি নাটক চলছে। সে বুঝল জেনেত্তে, খাঁচায় ভরা হ্যান্স দ্য গ্রোত্তে, ক্রাউজ আর চীনা নাবিকরা তাদের দিকে।
হ্যান্স ঘুম থেকে উঠেই জেনেত্তেকে ডেকে বলল, তুমি ভাল আছ ত? ও তোমার কোন ক্ষতি করেনি ত?
জেনেত্তে তাকে আশ্বাস দিয়ে বলল, না, কোনভাবে কোন ক্ষতি করেনি।
হ্যান্স বলল, আমি আজ স্মিৎসের সঙ্গে কথা বলব। আমি ও ক্রাউজ যদি তাকে কথা দিই তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আনব না তাহলে সে হয়তো তোমাকে খাঁচা থেকে মুক্ত করে দিতে পারে।
জেনেত্তে বলল, জাহাজের মধ্যে এইটাই আমার পক্ষে সবচেয়ে নিরাপদ স্থান। স্মিৎস যতদিন জাহাজের কর্তা হয়ে থাকবে ততদিন আমি খাঁচা থেকে বেরোব না।
স্মিৎস এসে দেখল টারজান খাঁচার ভিতরে শুয়ে ঘুমোচ্ছে।
স্মিৎস জেনেত্তেকে বলল, তুমি এখনো বেঁচে আছ দেখছি। আমার মনে হয় বাঁদরটার সঙ্গে রাতটা ভালভাবেই কাটিয়েছ এবং ওকে কিছু খেলা শিখিয়েছ। আমি তাহলে তোমায় ওর প্রশিক্ষক হিসেবে প্রদর্শনীতে দেখাতে পারব।
