সেদিন বিকালবেলায় লুম চিপ হ্যান্সের কাছে এসে বিদ্রোহীদের ষড়যন্ত্রের কথা সব বলল। বলল, বিদ্রোহীরা আজ রাতেই জাহাজ দখল করবে। তারা লার্সেল, ক্রাউজ, আর তোমাকে খুন করবে। শুধু চীনাদের বাদ দেবে।
হ্যান্স চিন্তান্বিত হয়ে বলল, চীনা নাবিকরা? তারা কি করবে।
তারা তোমাদের মারবে না। তারা ষড়যন্ত্রে যোগ দেয়নি।
তারা কি বিদ্রোহী নাবিকদের সঙ্গে লড়াই করবে?
তাদের হাতে বন্দুক দাও। তাহলেই লড়াই করবে।
তারা বন্দুক পাবে না। রড় আর ছুরি দিয়ে লড়াই করতে বল। তোমাকে ধন্যবাদ লুম। তোমার কথা কখনো ভুলব না।
হ্যান্স সঙ্গে সঙ্গে লার্সেলের কেবিনে চলে গেল। কিন্তু দেখল লার্সেল জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকছে তারপর ক্রাউজের কেবিনে চলে গেল। সেখানে ক্রাউজ আর জেনেত্তের কাছে লুম চিপের কথাগুলো সব বলল।
ক্রাউজ বলল, এখন আমরা কি করব?
হ্যান্স বলল, আমি এখনি স্মিৎসকে গ্রেফতার করব।
হঠাৎ কেবিনের দরজাটা খুলে গেল। দেখা গেল স্মিৎস একটা স্বয়ংক্রিয় রিভলবার হাতে দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে। তার পিছনে ছয়জন বিদ্রোহী।
স্মিৎস হ্যান্সকে বলল, তুমি আমাকে গ্রেফতার করবে না? চীনাটা যখন তোমার সঙ্গে কথা বলছিল তখন আমি তা দেখি। এ সে যা বলেছে তা আমি জানি।
এরপর সে লস্করদের বলল, ওদের সাবইকে বেঁধে ফেল।
বিদ্রোহী নাবিকরা কেবিনের মধ্যে ঢুকে পড়ল। ক্রাউজ কাপুরুষের মত বিনা প্রতিবাদে আত্মসমর্পণ করল। হ্যান্স জেনেত্তের সামনে গিয়ে লস্করদের বলল, খবরদার, মেয়েছেলের গায়ে হাত দেবে না। লস্কর বা বিদ্রোহী নাবিকরা জেনেত্তেকে বাঁধতে গেলে ঘুষি মেরে দু’জনকে ফেলে দিল হ্যান্স। জেনেত্তেও তার ভারী একজোড়া বায়নাকুলার দিয়ে মেরে ফেলে দিল দু’জনকে।
তবে লড়াই শেষ হলে দেখা গেল আঘাতে অচেতন হয়ে পড়েছে হ্যান্স। বাকি সবাইকে বেঁধে ফেলেছে বিদ্রোহীরা।
ক্রাউজ অবশেষে স্মিৎসকে বলল, এটা বিদ্রোহ স্মিৎস। মনে রেখো, আমাকে যদি ছেড়ে না দাও তাহলে এর জন্য ফাঁসিতে মরতে হবে তোমায়।
স্মিৎস বলল, এটা বিদ্রোহ নয়, আমি আমাদের রাষ্ট্রের নামে এই ইংরেজ জাহাজটিকে দখল করলাম।
ক্রাউজ বলল, আমিও জার্মান। আমি জাহাজটিকে ভাড়া করি। সুতরাং এটা জার্মান জাহাজ, ইংরেজ জাহাজ নয়।
স্মিৎস বলল, তা নয়, এটা ইংলন্ডেই রেজিস্ট্রি করা হয় এবং এই জাহাজ ইংরেজ পতাকা বহন করেই ভেসে চলেছে। তুমি যদি জামান হও তাহলে তুমি বিশ্বাসঘাতক, দেশদ্রোহী। তোমাকে কি করতে হবে। তা আমরা জানি।
টারজান বুঝতে পারল জাহাজে রীতিমত একটা গণ্ডগোল হয়েছে। কিন্তু আসল ব্যাপারটা কি তা জানতে পারেনি সে। জেনেত্তে নামে সেই মেয়েটিকে ও ছোকরা অফিসার হ্যান্সকে দু’দিন দেখেনি সে। দেখছে যে মেটটা তার উপর থুথু ফেলেছিল একদিন জাহাজটা এখন তারই দখলে।
চীনা নাবিকরা মুখ বুজে জাহাজ চালানোর কাজ করে যাচ্ছে। আব্দুল্লা তার ভয়ে খাঁচার কাছে আসে না।
এখন বিদ্রোহী নাবিকরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায় জাহাজে। চীনা নাবিকরা সব কাজ করলেও অল্প কোন ত্রুটি অথবা বিনা দোষেই স্মিৎস তাদের লাথি মারে। একদিন এক চীনাকে বেত মেরে লঘু দোষে ভয়ঙ্কর শাস্তি দেয়া হয়।
স্মিৎস খাঁচার কাছে গিয়ে টারজানকে গালাগালি দেয় দাঁত খিঁচিয়ে। তার প্রতি স্মিসের এই ঘৃণার কোন সঙ্গত কারণ খুঁজে পায় না টারজান।
একদিন স্মিৎস একটা হারপুন নিয়ে এসে খাঁচার ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে টারজানকে মারার জন্য সেটা খাঁচার ভিতরে ঢুকিয়ে দেয়। টারজান সেটা ধরে সঙ্গে সঙ্গে এক হ্যাঁচকা টানে কেড়ে নেয় স্মিৎসের হাত থেকে। সেই থেকে সশস্ত্র টারজনের কাছে আসতে ভয় পায় স্মিৎস।
একদিন একটা অদ্ভুত ঘটনা দেখল নিজের চোখে। নিচের কয়েকজন নাবিক একটা কাঠের আর একটা লোহার খাঁচা উঠিয়ে এনে তার খাঁচাটার পাশে রাখল। তারপর জেনেত্তে নামে সেই দয়ালু। মেয়েটাকে কাঠের খাঁচাতে আর ক্রাউজ ও হ্যান্সকে লোহার খাঁচাটাতে ভরে রাখা হলো।
হ্যান্স স্মিৎসকে প্রশ্ন করল, এ সবের অর্থ কি স্মিৎস?
স্মিৎস বলল, নিচের তলায় তালাবন্ধ থাকার জন্য অভিযোগ করছিলে তোমরা। তাই এখানে এনে রাখা হলো। অনেক আলো হাওয়া পাবে। এ জন্য আমাকে ধন্যবাদ দেয়া উচিত তোমাদের।
এই বলে হাসতে লাগল স্মিৎস।
হ্যান্স বলল, আমাদের নিয়ে যা খুশি করো। কিন্তু একজন শ্বেতাঙ্গ মহিলাকে এভাবে লস্করদের চোখের সামনে রাখা উচিৎ কি?
স্মিৎস হ্যান্সের কথা উত্তরে বলল, জেনেত্তে চাইলে আমার কেবিনে এসে থাকতে পারে। লার্সেলকে অন্য জায়গায় রাখা হয়েছে।
জেনেত্তে এমন সময় পিছন থেকে বলে উঠল, তার থেকে জেনেত্তে থাকবে বন্য লোকটির সঙ্গে একই খাঁচায়।
স্মিৎস বলল, আমি তোমাদের সবাইকে বন্য পশুদের সঙ্গে বার্লিনে নিয়ে গিয়ে সবাইকে দেখাবার জন্য এক প্রদর্শনীর আয়োজন করব। তুমি যদি তোমার প্রিয় বন্য লোকটির সঙ্গে এক খাঁচাতে থাক তাহলে সে দৃশ্য দেখে লোকে আনন্দ পাবে। আব্দুল্লা বলেছে লোকটা নাকি নরখাদক। তোমাকে ওর কাছে রাখলে ও তোমাকেই খাবে। আমাকে খাবার দিতে হবে না।
হ্যান্স স্মিত্সকে দেখে আপন মনে হাসতে হাসতে বলল, লোকটা পাগল।
একটু পরেই পিস্তল হাতে লোকজন নিয়ে ফিরে এল স্মিৎস। প্রথমে জেনেত্তের খাঁচার দরজা খুলে দেয়া হলো, তারপর টারজনের খাঁচার দরজা খোলা হলো। শেষে স্মিৎস জেনেত্তেকে হুকুম করল, যাও, লোহার খাঁচার মধ্যে চলে যাও।
