জেনেত্তে বলল, আবার সুন্দরও বটে।
এরপর ক্রাউজের দিকে তাকিয়ে সে বলল, কিছু খাদ্য আর পানীয় নিয়ে এস।
ক্রাউজ আব্দুল্লাকে বলল, ও কি খায় আব্দুল্লা?
আব্দুল্লা বলল, কুকুরটা দুদিন খায়নি। এখন ও হাতের কাছে যা পাবে তাই খাবে। জঙ্গলে থাকার। সময় ও পশু বধ করে কাঁচা মাংস খেত পশুর মত।
ক্রাউজ বলল, আমরা সেটা পরীক্ষা করে দেখব।
একজন নাকিব মাংস আর জল নিয়ে এলে জেনেত্তে তা নিয়ে বন্দীর হাতে দিল। বন্দী লোকটা মাংস নিয়ে খাঁচার এক কোণে গিয়ে দাঁত দিয়ে একটা বড় মাংস খণ্ড কামড়ে কামড়ে খেতে লাগল আর গর্জন। করতে লাগল।
আব্দুল্লা বলল, এল আদ্রিয়া জাতীয় সিংহেরা এইভাবে খায়।
ক্রাউজ বলল, ও সিংহের মত গর্জন করে। আদিবাসীরা ওকে কি নামে ডাকে আব্দুল্লা?
আব্দুল্লা বলল, বাঁদরদলের টারজান বলে ডাকে ওকে।
ভারত মহাসাগর পার হয়ে সুমাত্রা দ্বীপে গিয়ে থামল সাইগন। সেখানে আরো কিছু পশু বোঝাই করল ক্রাউজ। সে নিল একটা গণ্ডার, তিনটে ওরাং ওটাং, দুটো বাঘ, একটা চিতাবাঘ আর একটা হাতি।
হ্যান্স তাকে কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেবে বলে ভয় দেখিয়েছিল বলে বাটাভিয়াতে নামল না ক্রাউজ। সুমাত্রা থেকে সে এগিয়ে যেতে লাগল সিঙ্গাপুরের দিকে। সাইগন যাবে দক্ষিণ চীন সমুদ্রে দিয়ে ম্যানিলায়।
ক্রাউজ খুশি হলো। এতক্ষণ পর্যন্ত তার পরিকল্পনা ভালভাবেই কাজ করেছে। সে যদি একবার নিউ ইয়র্কে জাহাজটা নিয়ে যেতে পারে তাহলে মোটা লাভ করবে। তবে সে এত খুশি হত না যদি সে জানত কি ব্যাপার চলছে। জাহাজের ক্যাপ্টেন লার্সেল তখনো তার কেবিনে শয্যাগত ছিল। হ্যান্স দ্য গ্রোত্তে একজন ভাল অফিসার হলেও সে নতুন। সাইগন জাহাজে কি গোপন ষড়যন্ত্র চলছিল সে বিষয়ে তারও কোন জ্ঞান ছিল না। রাত্রিবেলায় ডেকের উপর সামনের দিকে জাহাজের দ্বিতীয় মেট স্মিৎস আর জবু সিং ও অন্যান্য লস্কর বা নাবিকদের মধ্যে কি সব গোপন কথাবার্তা হত, ক্রাউজের মত সেও তার কিছুই জানত না।
একদিন লস্কর জবু সিংকে চাঁদ নামে এক লস্কর জিজ্ঞাসা করল, পশুগুলোর কি হবে?
জবু সিং বলল, স্মিৎস বলেছে পশুগুলোকে আমরা সমুদ্রে ফেলে দেব জাহাজ থেকে।
চাঁদ আপত্তির সুরে বলল, কিন্তু ওগুলোর অনেক দাম। আমরা পশুগুলোকে রেখে দিয়ে পরে বিক্রি করতে পারি।
অন্য একজন লস্কর বলল, আমরা ধরা পড়ে যাব এবং আমাদের ফাঁসিকাঠে ঝুলতে হবে তার জন্য।
জবু সিং বলল, আমরা যখন সিঙ্গাপুরে ছিলাম তখন স্মিৎস জানতে পারে ইংলন্ড ও জার্মানির মধ্যে যুদ্ধ চলেছে। এটা এক ইংজের জাহাজ। স্মিৎস বলেছে একজন জার্মান হিসেবে ইংরেজ জাহাজ দখল করার অধিকার আছ তার। আমরা তাহলে পুরস্কার হিসেবে কিছু করে টাকা পাব। তবে তার মতে এক্ষেত্রে জন্তু জানোয়ারগুলোর কোন দাম হবে না, ওগুলো শুধু এক আবর্জনা মাত্র।
চাঁদ বলল, ইল্লিনি দ্বীপে একজন লোক আছে সে পশুগুলোকে কিনবে। সুতরাং স্মিৎসকে তাদের সমুদ্রে ফেলে দিতে দেব না।
নাবিকরা এইভাবে তাদের নিজেদের ভাষায় কথা বলত। তারা ভাবত জাহাজের চীনা নাবিকরা বুঝতে পারবে না তাদের কথা। কিন্তু তাদের এ ধারণা ভুল ছিলো। সাইগন জাহাজে লুম চিপ নামে এক চীনা নাবিক ছিল। সে চীন উপসাগরে ফেলুক্কা নামে একটা জাহাজে কাজ করেছে। তখন সে লস্করদের। ভাষা শেখে। সে লস্করদের বিশ্বাস করত না, বরং তাদের ঘৃণা করত: কারণ তারা একবার ফেলুক্কা। জাহাজটা দখল করে তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। তারা যা যা লুট করে তার ভাগ দেয়নি তাকে।
তবে নাবিকদের ষড়যন্ত্রের কথাগুলো শোনার সময় উদাসীনভাবে পাইপ খেয়ে যাচ্ছিল সে। তার মুখ দেখে বোঝাই যাচ্ছিল না সে তাদের সব কথা শুনেছে কি না।
এদিকে খাঁচার ভিতরে বন্দী লোকটা খাঁচার ভিতরে ইতস্তত পায়চারি করতে করতে মাথার উপর লোহার রড়টা ধরে প্রায়ই ঝুলত। খাঁচার কাছে কেউ এলে সে থেমে যেত।
জেনেত্তে লাও প্রায়ই তার খাঁচাটার কাছে এসে দেখত তার খাওয়া হয়েছে কি না। তারপর তাকে ফরাসী ভাষা শেখানোর চেষ্টা করত। কিন্তু বন্দী টারজনের তাতে বিশেষ কোন আগ্রহ ছিল না। সে মুখে কোন কথা কারো সঙ্গে না বললেও মনে মনে ঠিক সঙ্গতভাবেই চিন্তা করে যেত। তার একমাত্র চিন্তা ছিল সে কিভাবে উদ্ধার করবে নিজেকে এই অবস্থা হতে। তাকে নিয়ে ভবিষ্যতে এরা কি করবে তা সে সব বুঝতে পেরেছে। তবে সে যে এই খাঁচা থেকে যেমন করে তোক পালাবেই সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই তার।
খাঁচার লোহার রেলিংগুলোকে পরীক্ষা করে সে দেখে সেগুলোকে বাঁকিয়ে তার দেহটাকে খাঁচা থেকে বার করতে এমন কোন কষ্ট হবে না। কিন্তু জাহাজ থেকে সমুদ্রে সে ঝাঁপ দিলেই তাকে গুলি করা হবে। কারণ ওরা তাকে ভয় করে। গুলির কথা ভেবেই সে নীরবে বন্য পশুর মত ধৈর্য ধরে থাকে।
আব্দুল্লা বা স্মিৎস যখন ডেকের উপর আসে টারজান তখন তাদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করে। কারণ তারা দুজনেই তার উপর থুথু ফেলে। তাকে ঘৃণা করার কারণ ছিল আব্দুল্লার। আব্দুল্লার দাস ব্যবসা আর হাতির দাঁতের কারবারের সে-ই অবসান ঘটায়। আর স্মিৎসের সে জাতীয় শত্রু।
আব্দুল্লা ক্রাউজ আর জেনেত্তেকে ঘৃণার চোখে দেখত আর হ্যান্স তাকে ঘৃণা করত। সে তাই স্মিৎসের পক্ষে চলে আসে। ক্রমে তারা অন্তরঙ্গ হয়ে ওঠে পরস্পরের। আব্দুল্লা ক্রাউজের উপর প্রতিশোধ নেবার সুযোগ খুঁজছিল বলে সে স্মিৎসের দ্বারা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে ফেলে নিজেকে।
