জেনেত্তে লাঁও নামে মহিলাটি ক্রাউজের সঙ্গে ডেকের উপর এসে হাজির হলো।
সাইগনের দু’নম্বর নেট উইলহেম স্মিৎস রেলিং-এর ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করছিল আধখোলা চোখে।?
মহিলাটি তাকে বলল, বন্য লোকটাকে দেখতে পারি?
স্মিৎস বলল, মনে হয় লোকটা এখনো বেঁচেই আছে। গতকাল জাহাজে তোলার সময় লোকটাকে প্রচুর মারা হয়েছে। আব্দুল্লা আমাকে যা বলল তাতে বোঝা গেল লোকটাকে পোষ মানানো কষ্টকর হবে। চল, লোকটাকে দেখে আসি।
এই বলে সে জাহাজের লস্কর নাবিককে ডেকে বলল। খাঁচা থেকে মাদুরটা সরাও।
আঁচার উপর থেকে যখন মাদুরটা সরাচ্ছিল তখন স্মিৎস এসে ক্রাউজকে জিজ্ঞাসা করল, খাঁচার ভিতরে কি আছে মিস্টার ক্রাউজ?
একটা বুনো লোক।
খাঁচার উপর থেকে মাদুরের ঢাকনাটা সরাতেই খাঁচার ভিতরে দৈত্যাকার একটা লোককে দেখা গেল। লোকটা তাদের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকাতে লাগল।
মেয়েটি বলল, লোকটা ত শ্বেতাঙ্গ।
ক্রাউজ বলল, হ্যাঁ তাই।
তুমি পশুর মত একটা লোককে খাঁচায় ভরে রাখবে?
লোকটা ইংরেজ।
স্মিৎস কথাটা শুনে ঘৃণাভরে থুথু ফেলল খাঁচার ভিতরে।
জেনেত্তে রাগের সঙ্গে পা ঠুকে বলল, এমন কাজ কখনো করো না।
ক্রাউজ চড়া গলায় বলল, তোমার তাতে কি? আমি বলেছি না লোকটা একটা নোংরা ইংরেজ শুয়োর।
লোকটা একজন মানুষ এবং শ্বেতাঙ্গ।
লোকটা মানুষের একটা মূর্তিমাত্র। কোন একটা কথাও বলতে বা বুঝতে পারে না। একজন জার্মান তার উপর থুথু ফেলেছে এটা তার পক্ষে সম্মানের কথা।
তাহলেও স্মিৎসকে এ কাজ আর কখনো করতে দেব না।
ঘণ্টা বাজতেই তার কাজে চলে গেল স্মিৎস। তার পিছন পানে তাকিয়ে জেনেত্তে বলল, লোকটা একটা শুয়োর।
এই সময় হ্যান্স দ্য গ্ৰাত্তে নামে এক ওলন্দাজ নাবিক এসে দাঁড়াল তাদের কাছে। হ্যান্স কুড়ি-বাইশ বছরের এক সুদর্শন যুবক। ও হলো জাহাজের প্রথম মেট। স্মিৎস তাকে হিংসা করে।
জাহাজের ক্যাপ্টেন লার্সেল তখন প্রবল জ্বরে শয্যাগত হয়ে পড়েছিল তার কেবিনে। ক্রাউজ জাহাজটা ভাড়া করলেও ক্যাপ্টেন লার্সেল তার সঙ্গে কথা বলত না। নাবিকদের বেশিরভাগ ছিল লস্কর আর চীনা। তাদের মধ্যে প্রায়ই ছুরি মারামারি চলত। সে তুলনায় ডেকের ভিতরে বন্দী পশুগুলো ছিল বেশ শান্ত।
হ্যান্স খাঁচাটার দিকে তাকিয়েই বলে উঠল, লোকটা শ্বেতাঙ্গ! ওকে বনের পশুর মত এভাবে আটকে রাখতে পারবে না।
জেনেত্তের মত সেও প্রতিবাদ করল।
ক্রাউজ সঙ্গে সঙ্গে বলল, আমি তাই করব। আমি কি করি না করি সেটা তোমাদের কাউকে দেখতে হবে না।
কথাটা বলার সময় জেনেত্তের উপর কটাক্ষপাত করল ক্রাউজ।
হ্যান্স বলল, অন্তত ওর হাত দুটোর বাঁধন খুলে দিন। এইভাবে বেঁধে রাখাটা এক অনাবশ্যক নিষ্ঠুরতা।
ক্রাউজ বলল, আমি ওর হাতের বাঁধন খুলে দিতে পারি যদি কেউ একটা লোহার খাঁচা এনে দিতে পারে এখানে। এই অবস্থায় ওকে খাওয়ানো একটা কঠিন কাজ।
জেনেত্তে বলল, গতকাল থেকে কোন খাদ্য বা পানীয় পেটে পড়েনি ওর। ও যেই হোক, তুমি একটা অসহায় মানুষের উপর যে ব্যবহার করছ আমি একটা কুকুরের সঙ্গেও তা করব না।
এমন সময় পিছন থেকে আব্দুল্লা এসে বলল, লোকটা কুকুরের থেকেও হীন।
এই বলে খাঁচার কাছে গিয়ে থুথু ফেলল সে। সঙ্গে সঙ্গে তার গালের উপর জোরে একটা চড় বসিয়ে দিল জেনেত্তে। আব্দুল্লা রাগের মাথায় তার ছোরাটা বার করতে যেতেই হ্যান্স ছুটে এসে তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আব্দুল্লার হাতটা ধরে ফেলল।
ক্রাউজ বলল, এটা তোমার করা উচিত হয়নি জেনেত্তে।
আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছিল জেনেত্তের চোখ থেকে। আমি লোকটাকে এভাবে অপমান করতে কিছুতেই দেব না।
হ্যান্স বলল, আর আমি ওকে সাহায্য করব এ বিষয়ে। আপনি ওকে খাঁচায় ভরে রাখবেন কি না তা দেখতে যাব না। কিন্তু ওর সঙ্গে ভাল ব্যবহার করছেন কি না সেটা অবশ্যই আমি দেখব।
ক্রাউজ জোর গলায় বলল, কি করতে চাও তোমরা?
হ্যান্স বলল, প্রথমে তোমাকে মেরে ফাটিয়ে দেব, তারপর যে বন্দরে আমাদের জাহাজ থামবে। সেখানকার কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেব তোমায়।
জেনেত্তে বলল, লোহার খাঁচা এসে গেছে। ওকে ওটার মধ্যে ঢুকিয়ে ওর হাতের বাঁধন খুলে দাও।
হ্যান্স কর্তৃপক্ষের হাতে তাকে তুলে দেবার কথা বলায় ভয় পেয়ে গেল ক্রাউজ। তাই সে তার সুরটা নরম করে বলল, ঠিক আছে, ওর সঙ্গে ভাল ব্যবহারই আমি করব। ওর পিছনে অনেক টাকা ঢেলেছি আমি। ওর সঙ্গে ভাল ব্যবহার না করাটা বোকামি হবে আমার পক্ষে।
একটা বড় লোহার খাঁচা কাঠের খাঁচাটার পাশে এনে রাখা হল। ক্রাউজ হাতে একটা রিভলবার নিয়ে খাঁচার ভিতরকার লোকটাকে বলল, এই খাঁচাটায় ঢুকে পড়। বোকা বোবা কোথাকার।
কিন্তু লোকটা ক্রাউজের দিকে একবার তাকালও না।
ক্রাউজ তার লোকদের বলল, একটা রড এনে ওকে খুঁচিয়ে দাও।
জেনেত্তে বলল, আমাকে দেখতে দাও।
এই বলে সে খাঁচার কাছে গিয়ে বলতেই ভিতরের লোকটা কাঠের খাঁচা থেকে গুঁড়ি মেরে লোহার খাঁচায় এসে ঢুকল। হ্যান্সের কাছ থেকে ছুরিটা নিয়ে সে লোকটার হাতের বাঁধনটা কেটে দিল।
মুখে কোন কথা না বললেও নীরবে মুখটা তুলে দৃষ্টির মাধ্যমে কৃতজ্ঞতা জানাল জেনেত্তের প্রতি।
হ্যান্স জেতেত্তের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে বলল, লোকটির চেহারাটা এক সত্যিকারের পুরুষের মত।
