আমরা মধ্য আফ্রিকায় গিয়ে নামবার মত একটা ভাল জায়গার খোঁজ করতে লাগলাম। কিন্তু ক্রমেই কুয়াশায় ঢাকা এক পার্বত্য এলাকায় গিয়ে পড়লাম। বিমানটা কোথায় নামাব তা ঠিক করতে পারলাম না। তার আগেই র্যান্ড টারজনের মত বেশভূষা পরে ও অস্ত্র নিয়ে তৈরি হয়েছিল। এক সময় ব্যান্ড আমাকে ঝাঁপ দিতে বলল। বলল, পাহাড়ের উপর দিয়ে আমরা যাচ্ছি। তখনই ঝাঁপ দিলাম আমি। তারপর দু’বছর ধরে আর র্যান্ডের দেখা পাইনি।
সেখানে আমি র্যান্ডের জন্য অপেক্ষা করলাম অনেকক্ষণ ধরে। কিন্তু সে না আসায় আমি একটা গাঁয়ের দিকে এগিয়ে গেলাম। পরে বুঝলাম সেটা নিগ্রো মুসলমানদের গাঁ। সুলতান আলি আমাকে বন্দী করে রাখল। ক্রীতদাস হিসেবে আমি সোনার খনিতে কাজ করতাম। তারপর আলেমতেজোর যোদ্ধারা। আমায় বন্দী করে। সেখান থেকে যুদ্ধের সময় পালিয়ে এলে টারজনের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়।
সান্দ্রা র্যান্ডের কাছে গিয়ে বলল, তারপর তোমার কি হলো র্যান্ড? তোমার কি সে কথা কিছুই মনে নেই?
র্যান্ড বলল, আমি ঝাঁপ দিয়ে আলেমতেজোর রাজপ্রাসাদের কাছে গিয়ে পড়ি। ওখানকার লোকেরা বলতে থাকে আমি আকাশ থেকে পড়ি; আমি মানুষ নই, দেবতা। এরপর আর কিছু মনে নেই আমার। বিমান চালানোর কথাও মনে নেই আমার।
সান্দ্রা বলল, কিন্তু বিমানটা পড়ল কোথায়? এও এক রহস্য।
সে রাতটা সেখানে কাটিয়ে পরদিন সকাল হতেই উপত্যকার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল ওরা।
ওরা কিন্তু সহজ পথটা খুঁজে পেল না। তার থেকে অনেক দূরে গিয়ে পড়ল। মালভূমি থেকে অনেকটা নিচে এক মাইল বিস্তৃত গাছপালাহীন একটা জায়গায় ওরা যেতেই টারজান ওদের দেখাল, ঐ দেখ বিমানটা।
বোল্টন লাফিয়ে উঠল আবেগের সঙ্গে। বলল, এটাই ত র্যান্ডের বিমান।
সান্দ্রা বলল, তা কি করে হবে? এটা ত ভেঙ্গে-চুরে যায়নি।
বোল্টন বলল, বিমানটা যদি কোনরকমে আবার চালাতে পারতাম।
এক ঘণ্টা ধরে চেষ্টা করার পর বিমানটার দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতে পারল বোল্টন। দরজাটায় জং ধরেছিল। পরে দেখল বিমানটার যন্ত্রপাতি সব ঠিকই আছে। শুধু চাকার টায়ারগুলো বসে গেছে।
বোল্টন বলল, আমি বইতে পড়েছি বিমানবাহিনীর অনেক বিমান আপনা থেকে নেমে পড়ে।
কি মনে হতেই র্যান্ড বিমানটার মধ্যে ঢুকে কেবিনে গিয়ে পাইলটের সীটে বসে পড়ল। সে যন্ত্রপাতি সব পরীক্ষা করে দেখল। কেবিনের ভিতরে নানারকম যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করতে গিয়ে হঠাৎ পূর্ব জীবনের কথা সব মনে পড়ে গেল র্যান্ডর। সে চীৎকার করে বলতে লাগল, ও সান্দ্রা! আমার সব কথা মনে পড়েছে।
বোল্টন বলল, আমি জানতাম মনে পড়বে। এই কেবিনটাতে তুমি জীবনের অনকগুলো দিন কাটিয়েছ। তুমি সত্যিই বিমানটাকে ভালবাসতে।
র্যান্ড বলল, একে একে এবার সব মনে পড়ছে আমার। বোল্টন ঝাঁপ দেবার পর মিনিট পাঁচেক আমি বিমানে ছিলাম। তারপর আমি ঝাঁপ দিয়ে আলেমতেজোর প্রাসাদের উঠোনে গিয়ে পড়ি। আমার মাথায় আঘাত লাগে। আর তার জন্যই আমার স্মৃতিশক্তি লোপ পায়।
সান্দ্রা, র্যান্ডকে বলল, তোমার কি মনে হয় বিমানটা আবার উড়তে পারবে?
র্যান্ড বলল, ও না চাইলেও আমি ওকে ওড়াব।
দু’ঘণ্টা কেটে গেল। র্যান্ড প্রথমে কার্বুরেটারের মধ্যে যে জট পাকিয়ে গিয়েছিল তা ঠিক করল। তারপর তেল কতটা আছে তা দেখে নিল। তারপর ইঞ্জিনটা স্টার্ট দিল। সঙ্গে সঙ্গে প্রপেলারের ঘর্ঘর আওয়াজ শোনা গেল। টায়ারে পাম্প দেয়া হল।
র্যান্ড বলল, তোমরা কেউ সোনার পুঁটলিগুলো নিতে চাও ত নিতে পার।
বোল্টন বলল, আমার কোন দরকার নেই। র্যান্ড বা টিমথি পিকারেলের মেয়ে সান্দ্রারও কোন সোনার দরকার হবে না। টারজান মনে করলে নিতে পারে।
টারজান হেসে বলল, আমি সোনা নিয়ে কি করব?
টায়ারগুলো ঠিক হয়ে যেতেই বিমান ছেড়ে দিল। র্যান্ড বিমানটা মাটি ছেড়ে উপরে উঠলে সান্দ্রা বলল, ঈশ্বরকে সবকিছুর জন্যই ধন্যবাদ।
টারজান ও দলচ্যুতরা (টারজান এ্যাণ্ড দি কাস্টএ্যাওয়েজ)
সেদিন সাইগন নামে একটা মালবাহী ছোট জাহাজ আমেরিকায় যাবার পথে জীবজন্তু বোঝাই এর জন্য অপেক্ষা করছিল মোম্বাসা বন্দরে। ডেকের ভিতর থেকে সিংহ, হাতি, হায়েনা প্রভৃতি বিভিন্ন জীবজন্তুর বিচিত্র ক্ষুব্ধ ধ্বনি শোনা যাচ্ছিল।
জাহাজের রেলিংয়ের ধারে দু’জন লোক কথা বলছিল। তাদের মধ্যে একজন বলছিল, জাহাজ ছাড়ার জন্য আমরা প্রায় প্রস্তুত। প্রতিদিন আমার খরচ বেড়ে যাচ্ছে। যদি তাকে ধরতে পার তাহলেও তাকে আনতে এক মাস লেগে যাবে।
আবদুল্লা আবু নেজিম বলল, শোন ক্রাউজ সাহেব, এ কাজ আমি পারবই। সে এখন নদালোদের দেশেই আছে। ফলে তাকে ধরা সহজ হবে। তার কথাটা একবার ভেবে দেখ সাহেব। একটা আসল বন্য লোক, ছোট থেকে বাঁদরদের কাছে মানুষ হয়েছে। সে কত সিংহ মেরেছে, বুনো হাতিরা তার খেলার সাথী। তুমি জাহাজে বোঝাই করে যত জীবজন্তু নাসারায় নিয়ে যাবে, তার একার দাম হবে সেই সব জীবজন্তুর থেকে বেশি। তার থেকে তুমি ধনী হয়ে উঠবে সাহেব।
পরদিন সকাল থেকে আবহাওয়াটা ভালই ছিল। অনুকূল বাতাসে সাইগন জাহাজটা ভারত মহাসাগরের উপর দিয়ে উত্তর-পূর্বদিকে এগিয়ে যেতে লাগল। ডেকের উপর জন্তু-জানোয়ারগুলো শান্ত ও নীরব হয়েই ছিল। মাদুর ঢাকা কাঠের বিরাট খাঁচাটা থেকে বন্য লোকটির কোন সাড়া শব্দ আসছিল না।
