সান্দ্রা তাদের দুজনের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে বলল, আমার কথা শোন টারজান, তুমি একে খুন করো না।
টারজান বলল, কেন করব না? সে ত তোমাকেও চুরি করেছিল।
সান্দ্রা বলল, দয়া করে আমার কথাটা শোন। লোকটা আসলে খারাপ নয়। কোন কারণে সে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলে। ও জানত ও-ই টারজান। আমিই ওকে বুঝিয়ে দিয়েছি ও টারজান নয়। আলেমতেজোর রাজা দা গামাই ওকে দিয়ে এই সব কাজ করিয়েছে।
টারজান বলল, আর কিছু তোমার বলার আছে?
সান্দ্রা বলল, আমি ওকে ভালবাসি।
টারজান এবার লোকটার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, তোমার কিছু বলার আছে?
লোকটা বলল, মিস পিকারেল যা বলেছে তা সব সত্যি। আমি জানি না আমি কে, কি আমার পরিচয়? আমি জানতাম না আমি যা যা করেছি তা অন্যায়। আমি তার প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই। আমি পিকারেলকে তার বাবার কাছে দিয়ে আসতে চাই। আমি যাদের মৃত্যুর জন্য দায়ী তাদের জীবন অবশ্য ফিরিয়ে দিতে পারব না। কিন্তু আমি সত্যিই অনুতপ্ত।
টারজান লোকটাকে খুঁটিয়ে দেখল। লোক-চরিত্র সে বুঝত। সে বুঝল লোকটা আসলে খাঁটি এবং সে যা বলছে তা সত্যি এবং বিশ্বাসযোগ্য।
টারজান বলল, ঠিক আছে, আমি তোমাদের ফিরে যেতে সাহায্য করব। তোমাদের দলের অন্য সব লোকরা কোথায়?
সান্দ্রা বলল, পেলহ্যাম ডাটন মারা গেছে বাঁদর-গোলিরাদের হাতে। অন্য দু’জনকে আমি দেখিনি।
টারজান বলল, ক্রাম্প আর মিনস্কি তৃষ্ণায় মারা গেছে। গতকাল তাদের মৃতদেহ আমি দেখেছি।
সেদিন সকালে উঠে টারজানকে দেখতে না পেয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ল বোল্টন। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরও যখন সে ফিরে এল না তখন সে নিজেই বেরিয়ে পড়ল টারজনের খোঁজে। টারজান কোন্দিকে যেতে পারে তা অনুমান করে সেইদিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
সান্দ্রা বোল্টনকে প্রথম দেখতে পায়। টারজানও তখন তাকে দেখতে পেয়ে বলে, ও আমার বন্ধু।
বোল্টন টারজনের মত অনেকটা দেখতে আর একটা লোককে দেখে আশ্চর্য হয়ে যায়। সে তাদের কাছে আরো এগিয়ে এসে টারজনের মত লোকটাকে চিনতে পেরে বলে উঠল, র্যান্ড তুমি! আমি ত ভেবেছিলাম দু’বছর আগেই তুমি মারা গেছ।
র্যান্ড হতবুদ্ধি হয়ে বলল, তুমি হয়ত ভুল করছ। আমি তোমাকে কখনো দেখিনি।
বোল্টন হতাশ হয়ে বলল, তুমি আমাকে চিনতে পারছ না? আমি ফ্রান্সিস বোল্টন শিল্টন।
সান্দ্রা আগ্রহের সঙ্গে বোল্টনকে বলল, আপনি একে চেনেন?
বোল্টন বলল, আমি অবশ্যই ওকে চিনি। ও আমাকে চিনতে পারছে না কেন বুঝতে পারছি না।
সান্দ্রা বলল, কিছু একটা হয়েছে। ও মাত্র দু’বছরের ঘটনা ছাড়া তার আগের কোন কিছু মনে করতে পারছে না।
বোল্টন বলল, আমেরিকার পশ্চিম ভার্জিনিয়ায় ওর বাড়ি। ওর নাম কলিন র্যান্ডম্ফ।
সান্দ্রা র্যান্ডকে বলল, দেখলে আমি তোমায় বলেছিলাম তুমি একজন আমেরিকান।
র্যান্ড বলল, তবু ভাল একজন আমাকে চেনে। হয়ত আমার স্মৃতিশক্তি অচিরেই ফিরে আসবে।
সান্দ্রা বোল্টনকে বলল, আপনি তাহলে ওর বিষয়ে সব জানেন? ও কি বিবাহিত?
বোল্টন বলল, না বিবাহিত নয়। আমি ওর সবকিছু জানি। স্পেনে আমরা একসঙ্গে বছরখানেক ছিলাম আফ্রিকায় আসার আগে।
টারজান সবকিছু শুনে ভাবল সে লোকটাকে খুন না করেই ভালই করেছে। এখন যেমন করে হোক এখান থেকে তাদের নিরাপদে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সে তাই বলল, এখন চল। এখান থেকে বেরিয়ে যাবার সহজ পথ একটা খুঁজছি।
টারজান পা চালিয়ে পথ চলতে লাগল। কেউ কোন কথা বলার সুযোগ পেল না। সন্ধ্যার আগে ওরা একটা জায়গায় রাতটা কাটাবার জন্য বিশ্রাম করতে লাগল। খুব ঠাণ্ডা কথায় ওরা আগুন জ্বালাল।
সান্দ্রা বোল্টন আর র্যান্ডের কাছে বসল। সে র্যান্ডকে বলল, অবশেষে তোমার একটা নাম পেলাম। এতদিন তোমায় নাম ধরে ডাকতে পাইনি।
বোল্টন বলল, ও খুব কথায় কথায় বাজী ধরত। এই বাজী ধরাই হলো ওর আফ্রিকা আসার কারণ।
সান্দ্রা বলল, কিন্তু আফ্রিকায় এসে আমাকে অপহরণ করার জন্য নিশ্চয় বাজী রাখেনি। ও ত আমার নামই জানত না।
বোল্টন বলল, তাহলে তার আগের কথা সব খুলে বলতে হবে। র্যান্ড টারজনের খুব ভক্ত ছিল। টারজনের বই পড়ে ও টারজনের মত হবার চেষ্টা করে। ওর দেহটা বলিষ্ঠ হয়ে ওঠে। ও ধনুর্বিদ্যা শিখতে শিখতে পারদর্শী হয়ে ওঠে তাতে। ও আফ্রিকায় এসে টারজনের মত একা একা বন্য জীবন যাপন করার কথা বলে। স্পেন থেকে আমরা ইংলন্ডে এলাম। সেখানে একদিন একটা ক্লাবে বসে থাকতে থাকতে একটা কাগজে পড়লাম দক্ষিণ আফ্রিকায় একটা আদিবাসী ছেলে একদল বেবুন বা বনমানুষ জাতীয় জন্তুর হাতে ধরা পড়ে। তারপর ছেলেটা মানুষ হয়েও ঐ বেবুনদের দলে থাকত। ছেলেটা আদিবাসী জংলী বলেই পেরেছিল। র্যান্ড তখন এক হাজার পাউন্ড বাজী রাখল।
আমিও তাতে রাজী হয়ে গেলাম। এক ঘণ্টা ধরে আলোচনার পর ঠিক হলো র্যান্ড আর আমি দু’জনে তার ছোট বিমানটায় করে মধ্য আফ্রিকায় গিয়ে ভাল শিকার পাওয়া যায় এমন একটা জায়গায় নামব। তারপর আমি বিমানে করে অন্য জায়গায় চলে যাব। এক মাস পরে আমি তাকে তুলে নিয়ে যাব সেখান থেকে। আরো ঠিক হলো, ধোয়ার কুন্ডলির মাধ্যমে সে আমাকে তার অবস্থার কথা জানাবে। যদি উপর থেকে একটা ধোঁয়ার কুন্ডলি দেখতে পাই তাহলে বুঝতে হবে সে ভালই আছে আর যদি দুটো কুন্ডলি দেখা যায় তাহলে বুঝব সে বিপদে পড়েছে। এবং সাহায্য চায়। সে যদি টারজনের মত বেশভূষা করে এক মাস সেখানে টিকে থাকতে পারে তাহলে সে বাজীতে জিতে যাবে এবং আমি তাকে এক হাজার পাউন্ড দেব আর না পারলে সে আমাকে এক হাজার পাউন্ড দেবে।
