দু’জনেই খনির মুখটার বাইরে এসে বোঝার ভারে ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়ল।
এদিকে আহারের সন্ধানে ঘুরত ঘুরতে নকল টারজান ভাবতে লাগল সান্দ্রা পিকারেলের হাতে মারা গেছে।
ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ একটা আর্তনাদ শুনতে পেল নকল টারজান। মানবতার খাতিরে সেই আর্তনাদের শব্দ লক্ষ্য করে ছুটতে লাগল। ঘটনাস্থলে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। ভূত দেখে চমকে উঠল। দেখল সান্দ্রা পিকারেল মরার মত পড়ে রয়েছে আর তার উপর একটি নিগ্রো আদিবাসী মরে পড়ে আছে। তার পিঠে একটা তীর গাঁথা ছিল।
ছুটে গিয়ে সান্দ্রার উপর থেকে মৃতদেহটা সরিয়ে দিল নকল টারজান। তারপর সান্দ্রার দেহটা নিজের কোলের উপর তুলে নিল।
ক্রমে জ্ঞান ফিরে এলে চোখ মেলে চাইল সান্দ্রা। নকল টারজানকে দেখেই সে আশ্চর্য হয়ে গেল।
নকল টারজান বলল, ক্রাম্প আর মিনস্কিও বেঁচে আছে। তারা সোনার খনি থেকে এত সোনা তুলেছে। যা তারা বয়ে নিতে পারবে না।
নকল টারজান বলল, এখন আমাদের সামনে মাত্র দুটো পথ খোলা আছে। এক হলো, আলেমতেজোতে ফিরে গিয়ে আবার দেবদেবী সেজে থাকা আর একটা পথ হলো ঐ পাহাড়টা পার হয়ে তোমার বাবার কাছে ফিরে যাওয়া। আমি মনে করছি তাই যাব। এখন আমাদের কিছু খাওয়া দরকার।
ক্রাম্প আর মিনস্কি সেই খনির মুখটার বাইরে জ্বলন্ত রোদে শুয়ে রইল। অবশেষে মিনস্কি তার কনুই এর উপর ভর দিয়ে মুখটা তুলে চারদিকে তাকিয়ে দেখল অদূরে একটা গাছ রয়েছে। সে তাই অতি কষ্টে তার বোঝাটা নিয়ে সেই গাছটার ছায়ায় চলে গেল।
তার দেখাদেখি ক্রাম্পও সেখানে চলে গেল। জ্বলন্ত সূর্যের কড়া রোদে ওদের দেহের অবশিষ্ট শক্তিটুকু শোষণ করে নিল। পিপাসায় বুকটা ওদের ফেটে যাচ্ছিল। আরও এক ঘণ্টা থাকার পরে উঠে। বসল মিনস্কি। বলল, আমি জলের স্রোতের শব্দ শুনতে পাচ্ছি আমাদের ডান দিকে একটা গিরিখাতে জল আছে।
মিনস্কি বলল, এইখানে সোনার পুঁটলিগুলো রেখে যাব। জল খেয়ে আবার ফিরে আসব।
এই কথা বলে সে উঠতে গিয়ে আবার পড়ে গেল। ক্রাম্পও উঠতে গিয়ে উঠতে পারল না।
ক্রাম্প তখন চীৎকার করে বলল, মিনস্কি, আমায় জলের এনে দাও।
আবার ওঠার চেষ্টা করল মিনস্কি। ক্রাম্প তাকে ধরে সাহায্য করতে লাগল। কিন্তু কোনরকমে উঠে দাঁড়াতেই সে পাশ চেপে আবার পড়ে গিয়ে তার দেহটা একবার জোর কেঁপে স্থির হয়ে গেল। এবার ক্রাম্প গর্জন করতে করতে বলল, তোকে এবার উচিৎ শিক্ষা দেব।
এই কথা বলে সেই সোনালী ভারী তালটা দিয়ে পাগলের মত মিনস্কির মাথাটা ভাঙ্গতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাথার খুলিটা ভেঙ্গে থেঁতো হয়ে গেল।
ক্রাম্প হাসতে লাগল। হাসতে হাসতে বলল, এবার তোর আর আমার সব সোনা আমি একা ভোগ করব।
আলেমতেজোর সীমানা থেকে বেরিয়ে যাবার সহজ পথটা খুঁজে পেতে দেরী হলো না টারজনের। কিন্তু পথটা পেলেও সে পথ ধরে বেশিদূর গেল না। সে বুঝল এখনো তাকে এই পাহাড় এলাকাতেই থাকতে হবে। কারণ এই পাহাড়ের কোথাও সেই টারজান নামধারী লোকটা সান্দ্রা পিকারেল নামে মেয়েটিকে নিয়ে আছে।
টারজান একটা হরিণ মেরে এনে তার খানিকটা মাংস বোল্টনকে দিল।
হঠাৎ বাতাসে দুটো মরা মানুষের গন্ধ পেল টারজান। বোল্টন কিন্তু চারদিকে তাকিয়ে কিছু দেখতে পেল না। টারজান বলল, অদূরে দু’জন শ্বেতাঙ্গ মরে পড়ে আছে।
এ কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেল বোল্টম। সে টারজনের সঙ্গে পাহাড়ের উপর দিকে কিছুটা উঠে দেখল সত্যিই দু’জন শ্বেতাঙ্গের মৃতদেহ পড়ে আছে। সে বলল, কি করে তুমি জানতে পারলে?
লোক দুটো অদূরে জল থাকা সত্ত্বেও পিপাসায় মারা গেছে। এই পুঁটলি দুটোয় খাঁটি সোনার অনেক তাল আছে।
বোল্টন বলল, এদের তুমি চিনতে?
টারজান বলল, হ্যাঁ। এদের একজন আমাকে দু’বার হত্যা করতে গিয়েছিল।
সে ক্রাম্পের মৃতদেহটাকে পা দিয়ে দেখিয়ে দিল। বলল, তুমি কি এই সোনাগুলো বয়ে নিয়ে যেতে চাও?
বোল্টন বলল, না, ওদের মত আমিও কি মরব? আমার ওতে দরকার নেই। আমি শুধু এ অঞ্চল থেকে বেরিয়ে যেতে চাই।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বোল্টন দেখল, টারজান নেই। সে ভয় পেয়ে গেল। টারজান কোথায় গেছে তা ভেবে পেল না কিছু।
কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা শুয়োর শিকার করে নিয়ে এল টারজান। সে বলল, খাওয়ার পরই আমরা যে পথে এসেছি সেই পথে কিছুটা গিয়ে লোকটার খোঁজ করব।
সান্দ্রা আর নকল টারজান তখন হাত ধরাধরি করে পাহাড় থেকে উপত্যকার দিকে সেই পথেই নেমে আসছিল।
হঠাৎ টারজান তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই সান্দ্রা বলে উঠল, টারজান তুমি? আমি ত ভেবেছিলাম তুমি মারা গেছ মাথায় গুলি লেগে।
কথাটার কোন উত্তর দিল না টারজান। তার চোখ দুটো তখন সান্দ্রার সঙ্গী লোকটার উপর নিবদ্ধ ছিল। সে তাকে জীবনে দেখেনি কখনো এর আগে। এই লোকটাকেই সে খুঁজে বেড়াচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে।
সে তার সামনে গিয়ে বলল, তুমি তোমার তীর ধনুক ফেলে দাও।
লোকটা বলল, কেন?
টারজান বলল, কারণ আমি তোমাকে খুন করব।
লোকটা তার তীর ধনুক ফেলে দিয়ে বলল, আমি বুঝতে পারছি না কেন তুমি আমাকে হত্যা করতে চাও?
কিন্তু সে ভয় পেল না। ভয়ের কোন চিহ্ন বা লক্ষণ পাওয়া গেল না তার মুখে।
টারজান বলল, আমি তোমায় খুন করব, কারণ তুমি আমার নাম ধারণ করে আমার প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন গা থেকে অনেক নারী ও শিশু চুরি করে হয় তাদের হত্যা করেছ অথবা শত্রুদের হাতে ক্রীতদাস হিসেবে তুলে দিয়েছ। আমার বন্ধুরা ভাবছে আমিই এ কাজ করেছি।
