এরপর দরবার ঘরটা স্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই ভয় পেয়ে গেল। মোষের সঙ্গে টারজনের লড়াই তারা দেখেছিল, তার উপর আবার তারা তার শক্তির পরিচয় পেয়ে আশ্চর্য হয়ে গেল। এবার দুই-একজন বাদে সবাই একবাক্যে বলে উঠল, দা গামা নিপাত যাক, দা সেরা দীর্ঘজীবী হোক।
তারা সবাই ধ্বনি দিতে দিতে টারজান আর দা সেরাকে ঘিরে দাঁড়াল। দা গামার অনুগত দুই-চারজন অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে রইল। রুইজ যোদ্ধাদের কাছে রাজা দা গামা আর আসল দেবতার প্রতি অনুগত থাকার জন্য আহ্বান জানাল। কিন্তু রুইজকে সবাই ভয় আর ঘৃণা করত। এই জন্য অনেকে রুইজকে মারার জন্য ধরতে গেল। রুইজ পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গেল। তার পিছু পিছু দা গামও পালাল।
এইভাবে আসারিও দা সেরা আলেমতেজোর রাজ-সিংহাসনে আরোহণ করল। দাসরা সিংহাসনের পাশে বসে তার পাশে টারজনের আসল দেবতা হিসেবে বসাল। এবার তাদের সামনে কে সাদা নামে একজন পুরোহিত এসে টারজনের সামনে নৃতজানু হয়ে বসল। দা সেরা টারজানকে বলল, এই হচ্ছে তোমার প্রধান পুরোহিত। জনতার সামনে ঘোষণা করে দাও।
সেই রাতেই প্রাসাদের মধ্যে এক ভোজসভার আয়োজন করল দা সেরা।
এমন সময় একদল দূত এসে নতুন রাজা দা সেরাকে খবর দিল ওয়ারুতুরিদের গাঁ থেকে সোনার বিনিময়ে লোহা আর লবণ আনার সময় আমাদের যোদ্ধারা তিনজন শ্বেতাঙ্গকে বন্দী করে এনেছে।
টারজনের এ সব ভাল লাগছিল না। তবু ব্যাপারটা দেখার জন্য বসল। দা সেরা বন্দী তিন জনকে সেখানে আনার জন্য হুকুম দিলে তাদের আনা হলো। বন্দী তিনজন হলো ক্রাম্প, মিনস্কি আর বোল্টন। ক্রাম্প টারজানকে দেখেই আশ্চর্য হয়ে মিনস্কিকে বলল, ঐ দেখ, সেই বাঁদরলোকটা।
মিনস্কি বলল, লোকটা আবার সিংহাসনে বসে আছে। সোনার খনিটা আর খুঁজে পাব না।
টারজান ক্রাম্প ও মিনস্কিকে কিছু না বলে বোল্টনকে বলল, তুমি একজন ইংরেজ, তুমি এদের সঙ্গে কি করে এলে?
বোল্টন বলল, যারা আমাকে বন্দী করেছিল তারাই ওদের ধরে। আমি এদের এখনো দেখিনি। দু’বছর আগে নিগ্রো মুসলমানদের হাতে ধরা পড়ি আমি। ওদের সুলতান আমাকে সেখানে ক্রীতদাস করে। রেখেছিল।
টারজান বলল, তুমি তাহলে ওদের দেশে দু’বছর ছিলে?
দা সেরা টারজানকে বলল, ঠিক আছে, তুমি এই লোকটাকে তোমার ক্রীতদাস হিসেবে রাখতে পার। বাকি দু’জন বন্দী হয়ে থাকবে।
দা সেরার হুকুমে ক্রাম্প আর মিনস্কিকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হল।
ভোজসভা শেষ হয়ে গেলে টারজান বোল্টনকে তার ঘরে নিয়ে গেল। টারজান জানালার কাছে বোল্টনকে নিয়ে গিয়ে বলল, নিগ্রো মুসলমানদের দেশটা কোথায় জান? ওরা কি ভাবে কি রীতিতে যুদ্ধ করে তা দেখেছ?
বোল্টন বলল, হ্যাঁ জানি।
টারজান বলল, আমি তোমাকে ওখানে নিয়ে যাব। ওখানে একটা লোক একটা মেয়েকে নিয়ে পালিয়েছে। আমি লোকটাকে খুন করে মেয়েটাকে উদ্ধার করতে চাই।
টারজান এবার দা সেরাকে বলল, নিগ্রো মুসলমানদের গায়ে যাচ্ছি। সেই ভণ্ড লোকটাকে খুন করে মেয়েটিকে উদ্ধার করতে চাই। ইংরেজ মেয়েটিকে সে জোর করে ধরে এনে এখানে দেবী বানায়।
দা সেরা বলল, আজ সকালে ওখানকার সুলতান একজন দূত পাঠিয়েছিল। ও বলেছে এখানকার রাজা যদি দুশো মোষ দেয় তাহলে ওরা ওদের দুজনকে ছেড়ে দেবে।
টারজান বলল, তুমি এখন সম্প্রতি রাজা হয়েছ। এখন যদি তোমাদের শত্রুদেশকে জয় করতে পার এই সুযোগ তাহলে এ দেশের জনগণ ও যোদ্ধারা সব তোমাকে দারুণ খাতির করবে। যুঙ্কু ও দেশ জয়ই রাজাব মান-সম্মান বাড়িয়ে দেয়।
দা সেরা কথাটা মেনে নিল।
নিগ্রো মুসলমানদের গায়ে একটা কুঁড়ে ঘরে বন্দী ছিল সান্দ্রা পিকারেল। টারজনের নামধারী লোকটা ক্রীতদাস হিসেবে কাজ করতে গিয়েছিল খনিতে।
সেদিন দুপুরবেলায় একজন যোদ্ধা এসে সুলতানকে খবর দিল, সে নিজে দেখেছে, আলেমতেজোর এক বিরাট সৈন্যদল উপত্যকার ওধারে পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে। ওরা ঠিক আমাদের গাঁ আক্রমণ করবে। সুলতান সব ক্রীতদাসদের কাজ বন্ধ করে তাদের যুদ্ধের সাজে সজ্জিত করতে বলল।
টারজনের পরামর্শে আলেমতেজোর যোদ্ধারা লুকিয়ে ছিল পাহাড়ের পাশে এক হাজার মোষ নিয়ে।
এদিকে সন্ধ্যা হতেই দা সেরা আক্রমণ করল। সুলতান যুদ্ধের জন্য সবাইকে প্রস্তুত হবার জন্য হুকুম দিতে লাগল। সব ক্রীতদাসদের হাতে অস্ত্র দেয়া হল। মুসলমান যোদ্ধারা বর্শা আর তীর ধনুক নিয়ে রুখে দাঁড়াল। টারজনের বাঁদর-গোরিলারাও নিগ্রোদের ধরে ধরে কামড়াতে লাগল। বহু নিগ্রো মারা গেল। অনেকে যুদ্ধ ছেড়ে পরিবার নিয়ে পালাতে লাগল গা ছেড়ে।
সান্দ্রা দেখল সুলতানের যোদ্ধারা হেরে যাচ্ছে। আলেমতেজোর যোদ্ধারা জয়ের ধ্বনি দিচ্ছে। তারা তাকে আবার বন্দী করে নিয়ে যাবে। সে তাই যুদ্ধের গোলমালের মধ্যে এক সময় পালাল একদিকে। তাকে দেখতে পেয়ে টারজান নামধারী লোকটা তাকে গিয়ে ধরে ফেলল। ডাটনও তাদের কাছে চলে এল। সন্ধ্যার অন্ধকারে গা পার হয়ে তারা বনের ভিতরে গিয়ে ঢুকে পড়ল।
যুদ্ধে সুলতানের বাহিনীকে একেবারে হারিয়ে দিয়ে আলেমতেজো জয়লাভ করল। সুতলান লুকিয়ে পড়েছিল। দা সেরা তাকে খুঁজে বার করে রাখল আলেমতেজোতে ধরে নিয়ে যাবার জন্য। টারজান সেই ভণ্ড লোকটা বা সান্দ্রাকে অনেক খুঁজেও কোথাও পেল না। তখন সে বলল, এখন রাত্রিকাল। কাল সকালে আবার খোঁজ করব।
