ক্রাম্প বলল, ওরা ওয়ারুতুরি নয়। ওরা শ্বেতাঙ্গ; ওদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে হবে। ওরা নিশ্চয় রুকুরি পাহাড়ের কোথায় সোনা পাওয়া যায় তা জানে।
মিনস্কির ইচ্ছা ছিল না। তবু ক্রাম্পের সঙ্গে যেতে হলো। ওরা তাদের কাছে যাবার আগেই তাদের ফসরির একজন শ্বেতাঙ্গ মালবাহককে ইংরেজিতে বলল, তোমরা ইংরেজি ভাষা জান?
ক্রাম্প বলল, জানি।
সেই মালবাহককে শ্বেতাঙ্গ বলল, এদের কাছে এস না। ভাল চাও ত পালিয়ে যাও এখান থেকে। নিকটবর্তী কোন বন্দরে কোন ইংরেজ অফিসারকে জানিয়ে দেবে, ফান্সিস বোল্টন শিল্টন রুকুরি পাহাড়ে বন্দী হয়ে আছে।
ক্রাম্প বলল, ধরতে পারলে ওরা আমাদের কি খুন করবে?
বোল্টন বলল, না তোমাদের ক্রীতদাস করে রাখবে।
মিনস্কি বলল, ওদের হাতে বন্দুক নেই। আমরা গুলি করে ওদের সবাইকে খতম করে শ্বেতাঙ্গ বন্দীটাকে মুক্ত করতে পারি।
মিনস্কি রাইফেল তুলতেই ক্রাম্প বলল, থাম, থাম। আমরা সোনার খনিটা খুঁজছি। আমাদের খনিটা পাওয়া নিয়ে দরকার। ওরা আমায় ক্রীতদাস বানায় ত বানাবে। কিন্তু একবার সোনার খনিটার সন্ধান। পেলেই আমরা পালিয়ে যেতে পারব।
ক্রাম্প আবার এগোতে বোল্টন তাকে সাবধান করে দিল। কিন্তু ক্রাম্প তাকে থামিয়ে দিল ধমক দিয়ে বলল, তুমি থাম, বাজে বকো না। আমরা জেনেশুনেই যাচ্ছি।
ক্রাম্প আর মিনস্কি দলটার কাছে যেতেই তারা ওদের ঘিরে ফেলল। বোল্টন বলল, ওরা বলছে তোমরা ওদের বন্দী। বন্দুকগুলো দিয়ে দাও।
বনের মধ্যে গাছের আড়াল থেকে যুদ্ধটা দেখল টারজান। হঠাৎ অদূরে বনের মধ্যে দু’দল বাঁদর গোরিলার লড়াইয়ের শব্দ শুনতে পেয়ে সেদিকে এগিয়ে গেল সে। গিয়ে দেখল দু’দল বাঁদর-গোরিলা সামনাসামনি দাঁড়িয়ে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। একদলের সামনে আছে মালগাশ নামে তাদের রাজা। দু’জনেই নিজেদের বাঁদর দলের অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজা বলে বুক চাপড়াচ্ছে।
দু’দলের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে টারজান বলল, আমি হচ্ছি টারজান, সব বাঁদর-দলের রাজা।
টারজানকে দেখে উঙ্গো সরে গেল। মালগাশ হচ্ছে আলেমতেজোর দেবতার সেবক বাঁদর গোরিলাদের নেতা। সে প্রথমে টারজানকে তাদের দেবতা ভেবেছিল। কিন্তু পরে বুঝল তাদের দেবতা পালিয়ে গেছে। প্রথমে তার দলের সবাৱঁ সঙ্গে কি আলোচনা করল। তারপর ফিরে এসে টারজানকে মালগাশ বলল, না, তুমি টারজান নওঁ। মালগাশ তোমাকে মারবে।
এই বলে সে টারজনের গলাটা ধরার জন্য হাত দুটো বাড়িয়ে দিল। কিন্তু টারজান তার তলা দিয়ে গলে গিয়ে তার মাথায় এমন একটা জোর ঘুষি মারল যার আঘাতে সে ঘুরে পড়ে গেল। টারজান তার হাত দুটো ধরে তাকে তুলে আছাড় মেরে ফেলে দিল মাটিতে। তারপর তার বুকের উপর বসে বলল, কাগোদা? অর্থাৎ হার মেনেছ?
মালগাশ বলল, ‘কাগোদা’ অর্থাৎ হার মেনেছি।
টারজান এবার উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমি হচ্ছি সমস্ত বাঁদর-দলের রাজা, আমি যা বলব তাই তোমাদের করতে হবে।
মালগাশ তার দলের সবাইয়ের সঙ্গে মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছিল। টারজান তাদের ডাকল। বলল, মালগাশ তার দলের রাজা থাকবে আর উঙ্গোও তার দলের রাজা থাকবে। তবে যতদিন উঙ্গো তাদের দেশে থাকবে ততদিন তার ও দলের সঙ্গে শান্তিতে মিলেমিলে বাস করতে হবে। আমি যখনই ডাকব তখনই তোমরা সবাই আসবে। দুজনে মিলে তোমাদের সাধারণ শত্রুদের সঙ্গে লড়াই করবে।
বাকি দিনটা বাঁদর-গোরিলাদের সঙ্গে কাটিয়ে রাত্রি হতেই তাদের কাছ থেকে চলে গেল টারজান। আলেমতেজোর রাজপ্রাসাদের কাছাকাছি একটা গাছের উপর উঠে লক্ষ্য করতে লাগল প্রাসাদটাকে।
সকাল হতেই প্রাসাদের সামনের দিকের গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। প্রহরী তাকে তাদের দেবতা ভেবে সম্ভ্রমের সঙ্গে পথ ছেড়ে দিল। ভিতরের সৈনিকটাও তাকে কিছু বলল না বা তার পথ আটকাল না। এমন সময় একটা জোর গোলমালের শব্দে সকলেই ছোটাছুটি করতে লাগল।
টারজানও তাদের সঙ্গে গিয়ে দেখল প্রাসাদের পিছন দিকে যে একটা ফাঁকা জায়গা ছিল তার উপর অনেকে জড়ো হয়েছে। গায়ের দিক থেকে একটা পাগলা মোষ ছুটে আসছিল। সবাই বলছিল বুনো মোষটা পাগলা হয়ে গেছে পোষ মানছে না। সামনে যাকে পাবে তাকেই মেরে ফেলবে। আলেমতেজোর। সামন্ত এবং প্রধান সেনাপতি আসোরিও দা সেরার বীর এবং সাহসী হিসেবে খ্যাতি ছিল। সে তাই তার তরবারি হাতে মোষটার পথের সামনে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু যখন দেখল ভয়ঙ্করভাবে গর্জন করতে থাকা মোষটাকে সে আটকাতে বা মারতে পারবে না তখন পিছন ফিরে ছুটে পালাতে লাগল। মোষটা এবার তাকেই তাড়া করল।
পাশ থেকে দাঁড়িয়ে দেখতে দেখতে টারজান বুঝল মোষটা অল্প সময়ের মধ্যেই ধরে ফেলবে লোকটাকে। মোষটার হাত থেকে তার কোন পরিত্রাণ নেই। তখন সে পাশ থেকে একটা লাফ দিয়ে শোষটার পিঠের উপর উঠে পড়ে তার একটা শিং ধরে মাথাটা ঘুরিয়ে দিল। ঘাড়টা এমনভাবে বাঁকিয়ে দিল যে মোষটা উল্টে পড়ে গেল। টারজান তখন মাটিতে নেমে পড়ল। মোষটা এবার ছাড়া পেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে আবার ছুটতে গেলে টারজান এবার সামনে এসে দুটো শিং ধরে আবার ঘাড়টা ঘুরিয়ে দিল। ফলে মোষটা এগোতে বা ছুটতে পারল না। মোষটাকে আবার ঘাড় ধরে উল্টে ফেলে দিল টারজান। তখন কুড়িজন যোদ্ধা মোটা দড়ি নিয়ে এসে তাকে বেঁধে ফেলল।
