ডাটন তখন একাই অন্ধকার বনপথে রুকুরি পর্বতের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। হঠাৎ এক সময় তার সামনে একদল নিগ্রো যোদ্ধা পথরোধ করে দাঁড়াল। সে তার রাইফেল তুলে গুলি করার আগেই তাদের একজন রাইফেলটা কেড়ে নিল তার হাত থেকে। ডাটন অসহায় হয়ে পড়ল একেবারে।
নিগ্রো যোদ্ধাগুলোর গায়ে গয়না ছিল। তাদের বড় বড় দাঁতগুলোকে দেখে সে বুঝল তারা নরখাদক। তাদের ভাষা সে জানত না বলে কোন কথাই বলতে পারল না। তারা তাকে তাদের দিকে ধরে নিয়ে। যেতে লাগল। পথে তার রাইফেলটা নিয়ে একটা যোদ্ধা নড়াচড়া করায় তার থেকে গুলি বেরিয়ে সামনের একটা লোকের বুকে লাগতেই সে মারা গেল। তখন একটা লোক ডাটনকে মারতে লাগল রেগে গিয়ে। মৃত লোকটা তার আত্মীয় ছিল।
কিন্তু তাদের সর্দার তাকে বাধা দিল। তাদের বোঝাল বন্দীকে গায়ে নিয়ে গেলে তার মাংস খেতে পারবে।
টারজান যখন তার বাঁদর-গোরিলা দল নিয়ে উত্তর দিকে যাচ্ছিল তখন হঠাৎ রাইফেলের একটা গুলির আওয়াজ শুনতে পেল।
ব্যাপারটা কি তা দেখার জন্য কাছের একটা উঁচু গাছের উপর উঠে পড়ল টারজান। সবচেয়ে উঁচু ডালের উপর থেকে দেখল একদল ওয়ারুভুরি যোদ্ধা একজন শ্বেতাঙ্গকে বর্শা দিয়ে খোঁচাতে খোঁচাতে নিয়ে যাচ্ছে। একটা ডুলিতে করে একটা মৃতদেহ বয়ে নিয়ে যাচ্ছে তারা। টারজান এবার বুঝতে পারল ঐ শ্বেতাঙ্গই হলো ডাটন।
ডাটন যে তার প্রতি সন্দেহবশত ইচ্ছে করে তার দল ছেড়ে পালিয়ে যায় এটা জানত না টারজান। সে ভাবল ডাটনের কোন দোষ নেই এবং সে বনে ইতস্তত ঘুরতে ঘুরতে পথ হারিয়ে ফেলে এবং পরে। ধরা পড়ে ওয়ারুতুরিদের হাতে।
সহসা ওয়ারুভুরিদের দলের একটা লোকের কাঁধে একটা তীর এসে লাগায় সে চীৎকার করে পড়ে গেল। দলের সবাই তখন থেমে গেল। চারদিকে কাউকে দেখতে পেল না। তখন সে লোকটার আত্মীয়। মারা যায় সে ডাটনকে দেখিয়ে বলল, এই শ্বেতাঙ্গটার কারসাজি এটা।
এই বলে সে তার বর্শাটা ডাটনের বুকে বসিয়ে দিতে যেতেই আবার একটা তীর এসে তার বুকে লাগল। সেও পড়ে গেল।
তখন এক অদৃশ্য কণ্ঠস্বর শুনতে পেল তারা, শ্বেতাঙ্গকে ছেড়ে দাও তোমরা। না হলে মরবে। নিগ্রোরা নিজেদের মধ্যে কিছুক্ষণ আলোচনা করার পর মৃতদের ফেলে বন্দীকে নিয়ে তাড়াতাড়ি পথ চলতে লাগল। আবার সেই কণ্ঠস্বর শোনা গেল, শ্বেতাঙ্গ বন্দীকে ছেড়ে দাও।
কিন্তু নিগ্রোরা এবার ছুটতে লাগল। তখন আবার একটা তীর এসে বিদ্ধ করল একজনকে এবার বন্দীকে ছেড়ে দিয়ে ছুটে পালাল নিগ্রোরা।
এতক্ষণে ডাটনের পথের সামনে নেমে পড়ল টারজান। ডাটন বলল, তুমি ঠিক সময়ে এসে পড়েছ, কি দিয়ে তোমার ঋণ পরিশোধ করব তা জানি না।
টারজান বলল, শিবির ছেড়ে আসা উচিৎ হয়নি তোমার। বাঁদর-গোরিলারা তোমায় রক্ষা করত যে কোন বিপদ থেকে।
ডাটন বুঝল এই টারজনের কাছে থাকাই সবচেয়ে নিরাপদ তার পক্ষে।
পরদনি সকালেই টারজান রুহুরি পাহাড়ের কোণে সেই কাটানটায় গিয়ে পৌঁছল। একটা সোজা পথ ধরে সেই খাদের পাশে খাড়াই পাহাড়ের পাদদেশে চলে গেল।
এই পাহাড়টা পার হতে হবে ওদের। বাঁদিকের খাদটায় বহু ক্ষুধার্ত সিংহ ঘোরাফেরা করছিল।
ডাটন বলল, মিস পিকারেলও নিশ্চয় এই পাহাড় পার হয়েছে।
টারজান বলল, খাদে সিংহের মুখে না পড়লে নিশ্চয়ই পাহাড়ে উঠতে হয়েছে অকে।
ডাটন বলল, ওদের সঙ্গে বাঁদর-গোরিলাগুলো তাহলে কি এখান থেকে ফিরে গেছে?
টারজান তখন এ কথার উত্তর না দিয়ে উঙ্গোকে কি বলতে সে আবার তার দলের বাঁদর-গোরিলাদের ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিল। তখন বাঁদর-গোরিলাগুলো অনায়াসে পাহাড়ের মাথায় উঠে গেল। টারজানও অবলীলাক্রমে ওদের মতই উঠে গেল পাহাড়ের চূড়ায়।
পাহাড়টার মাথায় উঠে ডাটন কিছুক্ষণ বিশ্রাম করল। টারজান উপর থেকে দেখল, পাহাড়ের ওপারে একটা উপত্যকা। উপত্যকার ওধারে একটা বন। পাহাড় থেকে নেমে উপত্যকার উপর দিয়ে যেতে যেতে টারজান বলল, ঐ সামনের বনটায় দু’দলে যুদ্ধ হচ্ছে। আমি এগিয়ে গিয়ে দেখব কারা যুদ্ধ করছে। আমার মনে হয় সেই লোকটা মেয়েটিকে নিয়ে ওর মধ্যে পড়ে যেতে পারে।
উপত্যকাটা পার হয়ে বনের কাছে যেতেই ওরা দেখল দুই দলে যুদ্ধ হচ্ছে। দেখল বনটা যেখানে শেষ হয়েছে সেইখানে একটা ফাঁকা জায়গায় আর বিরাট প্রাসাদ দাঁড়িয়ে আছে। তার উপর থেকে বাদামী রঙের সৈনিকরা মাথায় শিরস্ত্রাণ আর গায়ে বর্মা পরে তীর আর বর্শা ছুঁড়ছে আর প্রাসাদের নিচে কুড়িটা মোষে-টানা একটা উঁচু রথে করে অনেক কৃষ্ণকায় সৈনিক ঘুরে ঘুরে যুদ্ধ করছে। তাদের হাতে ছিল তীর ধনুক আর বর্শা।
ওরা দাঁড়িয়ে আশ্চর্য হয়ে যুদ্ধ দেখছিল বলে কোন কিছু খেয়াল করেনি। কখন একদল কৃষ্ণকায় সৈনিক এসে ওদের ঘিরে ফেলেছে তা জানতে পারেনি। টারজান তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে পালিয়ে গেল। কিন্তু ডাটন ধরা পড়ল- আর দু’জন বাঁদর গোরিলা মারা গেল।
এদিকে ক্রাম্প আর মিনস্কি রুভুরি পাহাড়ের কাছে এসে ওয়ারুভুরি গাঁয়ের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল।
ওয়ারুতুরি গাঁটা ফেলে রেখে ঠিক পথেই যাচ্ছিল ওরা। কিন্তু ওদের ডান দিকের উপত্যকায় একদল যোদ্ধার একটা সফরি দেখতে পেয়ে মিনস্কি ক্রাম্পকে তা দেখাল।
ওরা বনের মধ্যে লুকিয়ে দেখল সেই সফরিতে মোট পনের জন লোক ছিল। তাদের চেহারাগুলো লালচে ধরনের বলে তাদের শ্বেতাঙ্গ ভাবল। তাদের সঙ্গে যে মালপত্র ছিল তা পাঁচজন বাহক বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
