এইবার গৃহকর্তা গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেলেন মাটির তলার ভাঁড়ারঘরটার দিকে, যেটাকে উনি আসলে স্টুডিয়ো হিসাবে ব্যবহার করেন। আমি ঈশ্বরের নাম জপতে জপতে বুকটাকে শক্ত করতে লাগলাম। আরও কী বীভৎস উৎকট শিল্পকলা অপেক্ষা করছে অসম্পূর্ণ ক্যানভাসে! ড্যাম্প-ধরা সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে উনি ফ্ল্যাশলাইটটা জ্বালিয়ে ঘরের একপাশে রাখলেন।
ঘরের মেঝের মধ্যে একটা বিশাল ইটে বাঁধানো কুয়ো। কুয়োর দেওয়ালে আলো লেগে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে। আমরা ওটার কাছে এগিয়ে গেলাম। পাঁচ ফুট দূরে থাকাকালীনই আমি ওটা স্পষ্ট দেখতে পেলাম, প্রায় এক ফুট চওড়া সলিড বেড়বিশিষ্ট, মেঝে থেকে ইঞ্চি ছয়েক উঁচু ষোড়শ শতকের একটা স্থাপত্য।
পিকম্যান জানাল, এই ধরনের স্থাপত্যের কথাই সে বলছিল। এই জিনিসগুলোই সুড়ঙ্গের জাল তৈরি করে ছড়িয়ে পড়েছে পাহাড়ের তলা দিয়ে। ভালো করে লক্ষ করে দেখলাম জিনিসটা ইটে বাঁধানো নয়। বরং একটা খুব ভারী কাঠের চাকতি দিয়েই তৈরি। ওপরের ছবিগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে এই কুয়োর স্থাপত্য ইতিহাস বিশ্লেষণ আমার মোটেও ভালো লাগল না। নিজের অজান্তেই কেমন যেন শিউরে উঠলাম। পিকম্যান পাশের সরু দরজা দিয়ে এক ধাপ ওপরে একটা ঘরে গিয়ে ঢুকল। আমিও তড়িঘড়ি তাকে অনুসরণ করলাম। ঘরটা মেঝে কাঠের আর আসবাবপত্রও একজন শিল্পীর স্টুডিয়োর মতোই। একটা অ্যাসিটিলিন গ্যাসের জোরালো বাতি শিল্পীকে তার প্রয়োজনীয় আলো দিয়ে সাহায্য করে।
ইজেলের ওপরে অসমাপ্ত চিত্রগুলো চাপানো। অনুশীলনের কিছু কিছু ছবি দেওয়ালের গায়ে ঠেসান দেয়া। সবই ওই ওপরের ঘরের সম্পূর্ণ ছবিগুলোর মতোই। একই রকমের নৃশংস আর যন্ত্রণাদায়ক শিল্পকলায় পরিপূর্ণ। দৃশ্যপটের ব্লকগুলো অত্যন্ত যত্ন সহকারে আঁকা। চরিত্রের পেনসিল স্কেচিংগুলোও খুব সূক্ষ্ম। পিকম্যান খুব যত্ন সহকারে ছোট ছোট অনুশীলনেও দৃষ্টিকোণ আর বিজাতীয় দেহের অনুপাত সঠিকভাবে বজায় রেখেছে।
নাহ্! শিল্পী হিসাবে মানুষটা মহান, স্বীকার করতেই হবে! সব কিছু জানার পরে আমি এখনও সেই কথাই বলব। টেবিলের ওপরে রাখা একটা বড় ক্যামেরা হঠাৎ আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। পিকম্যান বলল, ওটা পটভূমির জন্যে প্রাকৃতিক ছবি তুলতে কাজে দেয়। বিভিন্ন শহরের ছবি অথবা কবরখানা অথবা পাহাড়ের উপত্যকা, সবই যেন এই স্টুডিয়োয় বসেই সে ছবি দেখে অনুপুঙ্খভাবে আঁকতে পারে। সে মনে করে, একটা ছবি অনেকটা প্রকৃত দৃশ্যপটের মতোই হওয়া উচিত। এমনকী মডেলদেরও। সে স্বীকার করল যে, সে প্রায়শই তাদের ভাড়া করে আনে।
ঘরের মধ্যে চতুর্দিক থেকে উঁকি মারছে বমন উদ্রেককারী স্কেচগুলো আর অসমাপ্ত নারকীয় দৃশ্যপটেরা। এই ছবিগুলোতে কী যেন একটা ব্যাপার আছে। কেমন একটা অস্বস্তি ক্রমে ঘিরে ধরছে আমাকে। পিকম্যান হঠাৎ একটা বিশাল ক্যানভাসের ওপরের সাদা কাপড়টা টেনে সরিয়ে দিল। আমার গলা থেকে একটা আর্ত চিৎকার আপনা-আপনি ছিটকে বেরিয়ে এল। দ্বিতীয়বার, ওই সন্ধেতেই। প্রাচীন বদ্ধ সেলার ঘরের ভ্যাপসা দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে আর্তনাদটা ফিরে ফিরে আসতে লাগল। প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ার ধাক্কায় আমার দম আটকে এল, পরক্ষণেই নিজের অবস্থা বুঝে একটা পাগল-করা হাসি বেরিয়ে এল গলা চিরে।
ভগবানের দোহাই, এলিয়ট, আমি ওটাকে প্রথমে সত্যিই ভেবেছিলাম। জিনিসটা এত বেশি প্রাণবন্তভাবে আঁকা হয়েছিল। আমি কখনও স্বপ্নেও ভাবিনি, পৃথিবীতে কেউ এমনও কল্পনা করতে পারে।
ওটা একটা প্রকাণ্ড ছবি। নামহীন অতলের অন্ধকার থেকে উঠে-আসা এক জীব। তার রক্তচক্ষু জ্বলজ্বল করছে নৃশংসতায়, অস্থিময় নখরযুক্ত হাতে ধরে আছে একটা নরদেহ। একটা শিশু যেরকম লালসার সঙ্গে ললিপপ চুসে খায়, ঠিক সেভাবেই দেহ থেকে মাথাটা ছিঁড়ে খাচ্ছে সেই জীব। জীবটা সামান্য গুঁড়ি মেরে বসে আছে। দেখে মনে হচ্ছে, সে যে কোনও সময়ে হাতের দেহটা ছুঁড়ে ফেলে দেবে নতুন লজেন্সের সন্ধানে। কিন্তু ওসব কিছু না, বিষয়বস্তুও কিছু অতিপৈশাচিক নয়, যা কারও হৃৎপিণ্ড স্তব্ধ করে দেবে। ওই কুকুরমুখে ছুঁচোলো কান নয়, ওই রক্তচক্ষু, থ্যাবড়া নাক, ঝোলা ঠোঁট, ওইসবও নয়। দীর্ঘ নখরে দুমড়ে-মুচড়ে-যাওয়া মনুষ্যদেহের ধ্বংসাবশেষও না, না ওই ক্ষুরকায় পদযুগল– ওইসব কিছু না। যদিও ওইগুলোর মধ্যে যে-কোনও একটাই সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষকে পাগল করার জন্যে যথেষ্ট ছিল, তবু আমি বলব, ওইসব কিছু নয়।
টেকনিক, এলিয়ট, ওই মারাত্মক শাপগ্রস্ত অবাস্তব টেকনিক! আমি, আমি একটা জ্যান্ত মানুষ হয়ে বলছি, আমি কোথাও দেখিনি, একটা আঁকা ছবিও ওরকম শ্বাসপ্রশ্বাসযুক্ত জীবিত প্রাণীর মতো হতে পারে। ওই পিশাচটা যেন আমার থেকে কয়েক হাত দূরে ওই ঘরের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে। আমার দিকে জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে আছে, বাড়ানো হাতের নখরগুলো যেন এক্ষুনি আমাকে ছুঁয়ে যাবে। প্রকৃতির নিয়মের বেড়াজালে থাকলে এই ধরনের চিত্রকলা কোনও মানুষ মন থেকে ফুটিয়ে তুলতে পারে না। মডেল ছাড়া এত প্রাণবন্ত ছবি আঁকা কোনওমতেই সম্ভব নয়। ওই নারকীয় জগতের একঝলক সত্য সত্যই না দেখলে, শুধুমাত্র কল্পনা থেকেই এত নিখুঁত চিত্র কোনও মানুষ আঁকতে পারে না। নরকের শয়তানের কাছে বিক্রি না হয়ে গেলে, এমন কল্পনাই বা কারও মাথায় আসে কী করে! আমি কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিলাম না।
