আরও আধুনিক! আমি অবশ্য নিজের মতামত ব্যক্ত করার মতো অবস্থায় ছিলাম না। ভয়ে, ঘৃণায়, কী এক অস্বাভাবিক বোধে, আমার অন্তরাত্মা পর্যন্ত কাঠ হয়ে গিয়েছিল। তবে আমার মনে হয়, সে আমার অবস্থাটা ভালোই বুঝতে পারছিল, আর নিজের কাজের জন্যে বেশ আত্মশ্লাঘা বোধও করছিল। আমি তোমাকে আবারও নিশ্চিত করছি এলিয়ট, আমি কোনও দুর্বলচিত্ত মানুষ না, যে সাধারণ জীবনের গায়ে একটু ঘা দেখলেই ভয়ে কেঁপে উঠব। আমি প্রায় মধ্যবয়স্ক এবং যথেষ্ট বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন। তুমি আমাকে ফ্রান্সে দেখেছিলে, আশা করি বুঝতে পারছ যে, আমি সহজেই উলটে-যাওয়া মানুষ নই। মনে করে দ্যাখো, স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্যে হাওয়া বদলে গিয়ে, আমি কোন সব ছবির ভক্ত হয়ে উঠেছিলাম। যেগুলোতে কলোনিয়াল নিউ ইংল্যান্ডকে নরকের রাজ্য ভেবে আঁকা হয়েছিল। এসব কিছু সত্ত্বেও, পরবর্তী ঘরের ছবিগুলো সত্যি সত্যি আমার মুখ থেকে আর্তনাদ টেনে বার করে আনতে সমর্থ হল। আমি টলে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচতে দরজার হাতলটা চেপে ধরলাম। আগের ঘরটায় দলকে দল পিশাচ আর ডাইনিরা আমাদের পূর্বপুরুষের অতীত হয়ে-যাওয়া মাটিতে চরে বেড়িয়েছে। কিন্তু এই ছবিটাতে আতঙ্ক নিজে উঠে এসেছে আমাদের প্রাত্যহিক বর্তমান জীবনে।
ভগবান, কী করে একটা মানুষ এরকম আঁকতে পারে! এই ছবিটার নাম সাবওয়ে অ্যাক্সিডেন্ট। বয়েলস্টোন স্ট্রিটের সাবওয়ের একটা প্ল্যাটফর্ম ভরতি মানুষ। কোন এক অজানা ক্যাটাকুম্বের সুড়ঙ্গের সঙ্গে একটা দীর্ঘ ফাটল সেই প্ল্যাটফর্মকে যুক্ত করে দিয়েছে। সেই ফাটল বেয়ে উঠে আসছে রাশি রাশি নরকের জীব, তারা ঝাঁপিয়ে পড়ছে প্ল্যাটফর্মের হতভাগ্য মানুষগুলোর ওপরে। অন্য ছবিটায়, কপস হিলের ওপরে নৃত্য। দৃশ্যপটে বর্তমান সময়ের শবঘরগুলো। চারপাশে নৃত্য করছে একদল দেহধারী জীব। আরও কয়েকটা ছবিতে বেশ কিছু ভাঁড়ারঘরের ছবি। মাটির নীচের এই ভাঁড়ারঘরগুলোর দেওয়ালের ফাটল আর সুড়ঙ্গ দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে উঠে এসেছে কিছু জীব। কড়িকাঠের ওপরে আলো-আবছায়ায় ছুঁচোলো দাঁত মেলে তারা উবু হয়ে বসে আছে। সিঁড়ি দিয়ে যে নামবে, তার ঘাড়েই চোখের পলকে লাফিয়ে পড়বে।
আর-একটা জঘন্য ক্যানভাস জুড়ে বেকন হিলের এক বিস্তীর্ণ ক্রস সেকশন। সেই উপত্যকা বেয়ে দানবীয় পিঁপড়ের মতো উঠে আসছে নরকের পূতিগন্ধময় রাক্ষসদের সেনাবাহিনী। ঠিক মাটির নীচে গর্ত কেটে কেটে মাকড়সার জালের মতোই বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে তারা। ক্রমশ এগিয়ে আসছে জনবসতির দিকে। বর্তমান সময়ের একটা কবরখানার মধ্যে নৃত্য ছবিটা স্বাভাবিকভাবেই আঁকা। তবে একটা ধারণা আমাকে নাড়িয়ে দিল একেবারে। একটা অজানা সমাধিকক্ষের মধ্যে খান কুড়ি পিশাচ দাঁড়িয়ে। একজনের হাতে একটা বই। সে সেটা তারস্বরে পড়ছে। বাকিরা সবাই একটা নির্দিষ্ট সুড়ঙ্গের দিকে আঙুল তুলে নির্দেশ করছে। তাদের বিকৃত চোয়াল বেয়ে ঝরে পড়ছে অট্টহাসি। সমস্ত ছবিটা এতটাই সুস্পষ্ট যে, আমি যেন নিজের কানে সত্যি সত্যি শুনতে পাচ্ছিলাম ওই বর্বর পৈশাচিক হাসি। বইটা ছিল আমাদের অতি পরিচিত বোস্টন গাইড বুক। ছবিটার নাম ছিল, হোমস, লয়েল আর লংফেলো। এই পাহাড়ের তলায় শুয়ে আছে।
ধীরে ধীরে আমি দ্বিতীয় ঘরের অত্যুচ্চমানের শয়তানি আর বিকারের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে লাগলাম। গা গোলাচ্ছিল তা-ও আমি ছবিগুলোকে বিশ্লেষণ করতে শুরু করলাম। প্রথমেই আমি নিজেকে নিজে বললাম, পিকম্যানের ঘোরতর অমানবিকতা আর নির্মম নিষ্ঠুরতার প্রতিবিম্ব এই ছবিগুলো। দেহমনের ওপরে এই অবিরাম নিপীড়ন। মানুষের এই পবিত্র আত্মার বাসস্থানস্বরূপ দেহবাড়িকে এইভাবে নিকৃষ্ট রূপ দেওয়া! এই
লোকটা নির্ঘাত মানবতাবাদের এক নির্দয় শত্রু। দ্বিতীয়ত, আমার মস্তিষ্ক আচ্ছন্ন হয়ে উঠল ছবিগুলোর উচ্চমানের রূপ দেখে। ছবিগুলোর শিল্পকলা এতই উঁচুদরের যে, ক্রমশ হৃদয়ের মধ্যে প্রত্যয় জন্মাচ্ছিল তাদের বাস্তবতার প্রতি। বুকের মধ্যে ভয় জমছিল ছবিগুলোর প্রতি। যখন আমরা চিত্রগুলো দেখছিলাম, তখন যেন শুধু চিত্রকলা নয়, ওই পিশাচগুলোকেই আমরা দেখছিলাম। প্রত্যেকটা ছবি এতটাই সুচারুভাবে আঁকা হয়েছিল। আর সব থেকে অদ্ভুত ব্যাপার হল, পিকম্যান ছবিগুলোর মধ্যে কোথাও কোনও অবাস্তবতা কিছুই ব্যবহার করেনি। একটা অংশও ঝাপসা, আবছা, বিকৃত বা গতানুগতিক ছিল না। প্রত্যেকটা বস্তু বা জীবের আউটলাইনগুলো পরিষ্কার এবং প্রায় জীবিত মডেল ব্যবহার করার মতোই পরিষ্কার। যন্ত্রণাদায়কের মতোই প্রত্যেকটা ডিটেইল পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে আঁকা। আর মুখগুলো!
না! যা আমি দেখছিলাম, ওগুলো কোনও সাধারণ শিল্পীর কল্পনার ব্যাখ্যা নয়। বিষয়বস্তুর প্রাঞ্জলতা, চরিত্রদের ঘৃণ্যতা, সব মিলিয়ে ছবিগুলো নিজেই নরক। হ্যাঁ, নরক! ওহ্ ভগবান! ওই লোকটা মোটেও কোনও কল্পনাপ্রবণ বা ভাববিলাসী নয়। সাধারণ কল্পনার মন্থনপ্রসূত হলাহল সে তুলে আনেনি। সে স্বয়ং নেমে দাঁড়িয়েছে হিমশীতল, বিষাক্ত দুনিয়ায়। একই সঙ্গে দু-হাতে টেনে নামাতে চাইছে আমাদের এই জাগতিক পৃথিবীকেও। যেখানে শত শত রৌরব নরকের জীব ঘুরপাক খাচ্ছে, সড়সড়িয়ে বুকে হাঁটছে অথবা ভেসে বেড়াচ্ছে। ভগবান জানে, কোথায় ও কীভাবে ওই সমস্ত নারকীয় দৃশ্যের একঝলকও তার মনের মধ্যে ফুটে উঠেছিল! তবে যেভাবেই সেগুলো মনের আয়নায় বিম্বিত হোক-না কেন, একটা জিনিস খুব পরিষ্কার। পিকম্যানের আঁকা ওই ছবিগুলো, ওই দেহধারীরা, ওই প্রেক্ষাপট– ভাবনাচিন্তা ও চিত্রায়ণের দিক থেকে একদম নিখুঁত আর প্রায় বাস্তব। বিজ্ঞানসম্মতভাবে বাস্তব।
