ক্যানভাসের খালি অংশে একটা পিন-গাঁথা কাগজের টুকরো বিশ্রীভাবে গুটিয়ে আছে। ওটা বোধহয় দৃশ্যপটের ছবি। যেগুলো পিকম্যান পার্থিব জগৎ থেকে ক্যামেরাবন্দি করে। এই নৃশংস দানবটার পটভূমিকা আঁকার জন্য হয়তো ওই ছবিটা ব্যবহার করবে। যে পটভূমিকা এখনকার চরিত্রের নৃশংসতাকে আরও দশগুণ বাড়িয়ে দেবে। আমি হাত বাড়িয়ে গোটানো ছবিটা খুলে দেখতে চাইলাম। হঠাৎ আমি লক্ষ করলাম, পিকম্যান যেন মূর্তিবৎ স্থাণু হয়ে গেল। আমি খেয়াল করছিলাম, ওই অন্ধকার ঘরে আমার আর্তনাদ বিশ্রী প্রতিধ্বনি তোলার পর থেকেই সে যেন খুব মনোযোগ দিয়ে কী একটা শোনার চেষ্টা করছে। এখন আচমকাই মনে হল, তার মুখে যেন একটা ভয়ের ছায়া সরে গেল। না, ঠিক আমার মতো মারাত্মক আতঙ্কিত হল না সে, কিন্তু তারা সারা দেহে ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল। সে একটা রিভলভার টেনে বের করে, আমাকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে বলে ঘরটা থেকে মেইন সেলারে বেরিয়ে গেল। দরজাটাও বন্ধ করে দিয়ে গেল।
কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হল, আমার সারা শরীর বুঝি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে গেছে। পিকম্যানের কান পেতে শোনা ভয়ার্ত ভঙ্গিমাটার কথা মনে পড়তেই, আমি যেন অস্পষ্টভাবে পাথরের ওপরে নখের ছরছর আওয়াজ শুনলাম। কে যেন দ্রুতবেগে ছুটে গেল। তারপরেই বিভিন্ন দিক থেকে খনখন, গোঁ গোঁ শব্দ উঠতে লাগল। কারা যেন পাথরের গায়ে নখ ঠুকে নালিশ জানাচ্ছে। মানুষখেকো ইঁদুরের দল নয় তো! আমি দেখেছি বিড়ালের থেকেও বড় বড় ইঁদুর। দল বেঁধে ঘোরাঘুরি করে। দুর্বল অসহায় নিরস্ত্র মানুষ পেলে জীবিত খুবলে খেয়ে নেয়। আমি শিউরে উঠলাম। হঠাৎ একটা চাপা গুম শব্দে আমার ঘাড়ের রোঁয়া দাঁড়িয়ে গেল। আমি যেন শুনলাম না, বরং অনেক বেশিভাবে অনুভব করলাম ওই অদ্ভুত চোরা শব্দটা। যদিও আমি জানি না, আমি কীভাবে ব্যাখ্যা করব শব্দটাকে। আমার মনে হল, বিশাল ভারী কিছু একটা এসে পড়ল পাথরের মেঝের ওপরে।
আবারও শব্দটা হল। এবার স্পষ্ট এবং আরও জোরে। এমনকী আমিও পায়ের তলার মেঝেতে কাঁপুনি অনুভব করতে পারলাম, যদিও শব্দটা আসছিল অনেকটা দূর থেকে।
গুমগুম শব্দটার সঙ্গে ক্রমে যোগ হল একটা তীক্ষ্ণ কর্কশ আওয়াজ। আমি স্পষ্ট শুনলাম, পিকম্যান হ্রীং ক্রীং জাতীয় আবোল-তাবোল কী সব আওড়াচ্ছে। তারপরেই কান-ফাটানো ছ-ছ-টা গুলির শব্দ। সার্কাসের রিংমাস্টার সিংহকে পোষ মানাতে যেমন ফাঁকা বাতাসে গুলি করে, সেইরকম ফাঁপা আওয়াজ শুনলাম বলেই মনে হল আমার। একটা দমচাপা কর্কশ চিৎকার শুনলাম, পরক্ষণেই দুম করে কী যেন একটা পড়ল। তারপরে সেই একই রকমের গুমগুম শব্দ, পাথরের দেওয়ালে নখ আঁচড়ানোর শব্দ। কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতার পরে দরজাটা খুলে গেল, যেটার দিকে আমি উন্মাদের মতো তাকিয়ে ছিলাম। পিকম্যান ফিরে এল। হাতের রিভলভারের নল থেকে তখনও ধোঁয়া উড়ছিল। জাহান্নমের ইঁদুরের গুষ্টি বলে সে খিস্তি করল।
শয়তান জানে, হতচ্ছাড়াগুলো ওই গর্তে কী খায়! সে ভেংচি কেটে হাসল, এই সুড়ঙ্গগুলো হয়তো মাটির তলা দিয়ে কবরখানাটাকে ছুঁয়ে গেছে। সেইসব জায়গা থেকেই হয়তো ওইগুলো খাবার জোগাড় করে। তবে যা-ই হোক-না কেন, ওদের ভাঁড়ারে টান পড়েছে। ওরা বেরিয়ে আসতে চাইছে মাটির ওপরে। তোমার চিৎকার ওদেরকে টেনে এনেছিল বলেই মনে হচ্ছে। এই সমস্ত প্রাচীন জায়গায় একটু সাবধানে থাকতে হয়। এই জাহান্নমের জীবগুলো একটা অসুবিধা তো বটেই। তবে আমার মনে হয়, ওদেরও এই পরিবেশকে তৈরি আর বৈচিত্র্যময় করার পিছনে যথেষ্ট অনুদান আছে। এ তো এক রকমের সম্পদই বটে।
হ্যাঁ। সেই রাত্রের বিভীষিকাপূর্ণ অভিযানের সেইখানেই সমাপ্তি, এলিয়ট। পিকম্যান আমার কাছে প্রতীজ্ঞা করেছিল যে, সে আমাকে জায়গাটা দেখাবে, আর সে কথাও রেখেছে। সে আমাকে সেই গোলকধাঁধার মতো গলির মধ্যে দিয়ে ফিরিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। চার্টার স্ট্রিটে এসে আমি রাস্তাটা চিনতে পেরেছিলাম। কিন্তু আমি মানসিকভাবে এতটাই অবশ হয়ে পড়েছিলাম যে, বুঝতেই পারিনি, কোথা দিয়ে বেরিয়ে এলাম। তখন অনেকটাই রাত্রি হয়ে গিয়েছিল। কোনওরকম গাড়ি পাওয়ার জন্যে আমরা বস্তির মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হ্যাঁনোভার স্ট্রিটে ফিরে এসেছিলাম। সেই হাঁটার কথা আমার মনে আছে। ট্রেমন্ট আপ বেকনে উঠে আসার পরে পিকম্যান আমাকে একটা কফি শপের পাশে দাঁড় করিয়ে রেখে যায়। ওখান থেকেই আমি একটা ক্যাব পাই। তারপরে আর তার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি।
কেন? কেন আমি ওর সঙ্গ ত্যাগ করলুম? আহ্ অধৈর্য হোয়ো না। এক কাপ কফি বলো। অনেক কারণই ছিল, তবে একটাই কারণ যথেষ্ট ছিল। না, না– ওই ছবিগুলো নয়। হতে পারে, ছবিগুলো ভয়ংকর ছিল। অবশ্যই বোস্টনের কলাশিল্পের ক্লাব আর অন্যান্য মানুষজন ছবিগুলো দেখলেই তাকে একঘরে করতে দ্বিধা করত না। তবু আমি বলব, ওই ছবিগুলো না।
এতক্ষণে তুমি বোধহয় একটু একটু আন্দাজ করতে পারছ আমার কুসংস্কারের ব্যাপারটা। বুঝতে পারছ, আমি কেন অন্ধকার সাবওয়ে আর মাটির নীচে সেলার ঘরে যাওয়ার ব্যাপারে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে উঠেছি।
আসলে পরের দিন সকালে আমি আমার কোটের পকেটে একটা দলা-পাকানো কাগজের টুকরো পাই। ওটা সেই গোটানো কাগজের টুকরোটা, যেটা ক্যানভাসের গায়ে পিন দিয়ে আটকানো ছিল। ওই যেটা আমি ভেবেছিলাম পটভূমি আঁকার জন্যে প্রাকৃতিক দৃশ্যের ক্যামেরায় তোলা ছবি। আমি ওটা খুলে হাতে নিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু তারপরেই সেই ভয়ংকর ইঁদুরগুলোর মোকাবিলায় পিকম্যান ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। আমিও উদ্বেগে-আতঙ্কে ছবিটা কখন যেন দলা পাকিয়ে কোটের পকেটে ঢুকিয়ে রেখেছি। মনেই ছিল না।
