ছবিগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে বিশেষ কোনও লাভ নেই। ক্যানভাসের ওপরে তুলির কিছু সামান্য আঁচড়েই ফুটে উঠেছে ভয়ংকর, অমানবিক আতঙ্ক, অবিশ্বাস্য ন্যক্কারজনক নীতিহীন এক বর্ণনাতীত নরক। এরকম বিজাতীয় টেকনিক সিডনি সাইমের আঁকাতেও দেখা যায় না। এমনকী ট্রান্স সাটার্নিয়ান ল্যান্ডস্কেপ বা লুনার ফাঙ্গি ছবিতে, ক্লার্ক আসটন স্মিথের ওই রক্ত-হিম-করা টেকনিকের থেকেও এ যেন আরও ভয়াবহ কিছু।
দৃশ্যপটগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পুরোনো চার্চের উঠোন, গভীর অরণ্য, সমুদ্রের ধার থেকে উঠে-যাওয়া খাড়া পাহাড়, ইটের সুড়ঙ্গ, প্রাচীন কড়িকাঠওয়ালা ঘর অথবা সাধারণ অর্ধবৃত্তাকার ডোম– এইসবই। ওই বাড়ি থেকে কয়েকশো মিটার দূরেই যে কপস হিলের কবরখানা, সেটা দৃশ্যপট হিসাবে ব্যবহার হয়েছে অনেকবার।
কিন্তু সেই দৃশ্যপটের পটভূমিতে আঁকা চেহারাগুলোর শিরায় শিরায় পাগলামি আর অস্বাভাবিকতা পরিস্ফুট। পিকম্যানের ওই রোগগ্রস্ত চিত্রকলা যেন মাত্রাতিরিক্তভাবেই কোনও শয়তানের প্রতিকৃতি। ছবির চেহারাগুলো কদাচিৎ পুরোপুরি মানুষের মতো। কিন্তু সেগুলোর ক্ষেত্রেও মানবিকতা যেন প্রায় অনুপস্থিত। মোটামুটিভাবে দ্বিপদী দেহগুলো হয় বসে আছে অথবা সামনে ঝুঁকে, তাদের শ্বদন্তের সারি দেখা যাচ্ছে অস্পষ্টভাবে। সব থেকে বড় কথা হল, এই বিকট গঠনবিন্যাস জুড়ে ছড়িয়ে আছে এক বিশ্রী রকমের প্রাণময়তা।
আহ! আমি আবার ওগুলোকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। দয়া করে আমাকে স্পষ্টভাবে বর্ণনা দিতে বোলো না। ওগুলোর প্রবৃত্তি… বেশির ভাগ দেহধারী ছিল ভক্ষণরত অবস্থায়… না! কী খাচ্ছিল তা আমি বলতে পারব না!
তারা দলবদ্ধভাবে চরে বেড়াচ্ছিল কবরখানাগুলোতে অথবা মাটির তলায় সুড়ঙ্গের মধ্যে। অনেকগুলো ছবিতেই তারা নিজেদের মধ্যে মারামারি করছিল শিকার অথবা গুপ্তধন নিয়ে। এই চোখ-মুখবিহীন দেহধারীগুলোর আকৃতিতে কী যে এক অলৌকিক অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলেছে পিকম্যান! ভাবলেও গায়ে কাঁটা দেয়। কিছু কিছু ছবিতে দেহগুলো জানালা দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে রাত্রির অন্ধকারে। অথবা, বসে বসে পা দোলাচ্ছে ঘুমন্ত ব্যক্তির বুকের ওপর; অধীরভাবে তাকিয়ে আছে মানুষগুলোর কণ্ঠার দিকে। একটা ক্যানভাসে ছিল গ্যালোস হিলের ফাঁসি-দেওয়া এক ডাইনিকে ঘিরে অনেকগুলো জীবের চক্রাকার অবস্থান। ডাইনির মৃত মুখটা ওই জীবগুলোর সঙ্গে প্রায় একই রকম।
একের পর এক ছবিতে ওই উকট বিষয়ের পরিবেশের বীভৎস চর্চা দেখতে দেখতে আমি প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলাম। আমি কোনও শিশু নই, ওইরকম বিষয়বস্তুর ওপরে আঁকা চিত্রকলা আমি আগেও দেখেছি। কিন্তু ওই মুখগুলো! এলিয়ট! ওই নারকীয় অভিশপ্ত মুখের সারি। কুটিল দৃষ্টি আর লালা-ঝরানো মুখগুলো যেন ভীষণ প্রাণবন্ত হয়ে ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাইছে ক্যানভাস কুঁড়ে। ওহ্ ভগবান, আমার সত্যি সত্যি মনে হচ্ছিল ছবিগুলো যেন জ্যান্ত! ওই জঘন্য জাদুকর নরকের আগুনের এক-একটা টুকরো তুলে এনেছে ওর ক্যানভাসে। ওর তুলিই যেন জাদুদণ্ড হয়ে প্রসব করেছে দুঃস্বপ্ন। বোতলটা দাও, এলিয়ট! বোতলটা…
একটা ছবি ছিল, নাম শিক্ষা… উফ, কেন যে ওটা দেখতে গেলাম! ভগবান আমায় রক্ষা করুক! একটা ভাঙা চার্চ, উঠোন দখল করে চক্রাকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে বিকটদর্শন কুকুরের মতো দেহধারী জীবগুলো। মধ্যিখানে একটা বাচ্চা। তারা বাচ্চাটাকে শেখাচ্ছে তাদের খাদ্যরীতি। কোটি টাকার ওপরে দাম হবে ওটার। তুমি কি সেই লোককথাটা জানো! কখনও নরকের না-মানুষের দল দোলনা থেকে মানুষের বাচ্চা তুলে নিয়ে তার বদলে রেখে যেত তাদের ছানা। পিকম্যান এঁকেছে, তারপরে কী ঘটত সেইসব মানুষের বাচ্চাদের সঙ্গে কীভাবে তারা বড় হয়ে উঠত– তারপরেই আমি লক্ষ করতে শুরু করলাম মানুষ আর অমানুষ দেহধারীগুলোর মুখের মধ্যে এক পাশবিক মিল। ছবিটার মধ্যে অমানবিক দেহধারী জীবগুলো আর অধঃপতিত মানুষদের মধ্যে এক অদ্ভুত ক্রমবিন্যাসের বিকার ফুটে উঠছিল। এ যেন বিবর্তনবাদের ছিঁড়ে-যাওয়া এক পৈশাচিক সুতো। ওই হায়েনাশ্রেণির জীবগুলো যেন মরমানব থেকেই বিবর্তিত হয়েছে।
পরক্ষণেই আমার মাথায় এক চিন্তা এল, ওই হায়েনা জীবগুলো তো লুকিয়েচুরিয়ে নিজেদের বাচ্চা রেখে যাচ্ছে মানুষজাতির মধ্যেই। এরপরেই আরেকটা ছবি আমার চিন্তা দখল করে নিল। ওটা ছিল একটা প্রাচীন হর্মের অন্তঃস্থল। বিশাল বিশাল কড়িকাঠ-দেওয়া উঁচু উঁচু ঘর, জাফরি-কাটা জানালা, চিরস্থায়ীভাবে রাখা যোড়শ শতকের সব জবরজং আসবাবপত্র। একটি পরিবার সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছে। গৃহকর্তা নিষ্ঠাভরে বাইবেল পড়ছেন। প্রত্যেকের মুখে সম্ভ্রম এবং শ্রদ্ধার ছাপ স্পষ্ট, শুধু একজন বাদে। তার ঠোঁটের কোনা মুচড়ে ঠিকরে আসছে চাপা ব্যঙ্গ-হাসি। এটা নিশ্চয়ই ওই একটা বদলে দেওয়া বাচ্চা, যে যুবক হয়ে উঠেছে বিগত কয়েক বছরে। একজন ধর্মজ্ঞ নিষ্ঠাবান বাবা পেয়েও তার রক্তের মধ্যে খেলা করে যাচ্ছে জন্মের সময়কার অশুচিতা। আর এই সমস্ত কিছুর থেকে থেকে বড় ব্যাপার হল, ওই যুবকের সঙ্গে পিকম্যান তার নিজের মুখের এক প্রত্যক্ষ সাদৃশ্য রেখেছে।
এই সময় পিকম্যান পাশের ঘরে গিয়ে আরেকটা বাতি জ্বালল। বিনয়বশত দরজাটাও খুলে ধরল আমার জন্যে। জিজ্ঞাসা করল, আমি কিছু আধুনিক চিন্তা দেখতে আগ্রহ বোধ করব কি না?
