তবে, তুমি এই সমস্ত বিষয়ে কৌতূহলী। বেশ খোলা মনেই গ্রহণ করেছ আমার ছবিগুলোকে। খুব একটা পেট-পাতলাও নও। তাই ভাবছি, তোমাকে বলাই যায়… আমার আরও একটা স্টুডিয়ো আছে, পাহাড়ের ওপরের দিকে। ওখানে আমি সেইসব ছবি আঁকি, যা আমি নিজেই এই নিউবেরি স্ট্রিটে দাঁড়িয়ে কল্পনাও করতে পারি না। ক্যানভাস বন্দি করা প্রাচীন সব ভীতি। অবশ্য ক্লাবের ওই বুড়ি ঠাকুমাদের মতো নীতিসর্বস্ব সদস্যগুলোর সামনে এই ব্যাপারে আমি কোনও দিনও কিছু বলিনি, আর বলবও না। ওই শয়তান রেইড তো কিছু না জেনেই এমন ফিশফিশ করে, যেন আমি একটা বিকৃত মস্তিষ্কের দানব। এমন এক দানব, যে বিবর্তনের উলটোদিকে গড়িয়ে নামছে। তবে গ্রাবার, বহু দিন ধরেই আমি মানতাম, একজন চিত্রকর যেমন জীবনের সৌন্দর্যটা ফুটিয়ে তোলে, তেমনি আতঙ্কটাও ফুটিয়ে তোলা উচিত। সেই জন্যেই আমি জীবনভর অনুসন্ধান করেছি। অবশেষে কিছু জায়গা খুঁজেও পেয়েছি, জানতে পেরেছি প্রাচীন আতঙ্কদের।
এমন একটা জায়গার খোঁজ পেয়েছি, যেটা আমি ছাড়া আর মাত্র তিনজন জীবিত নর্ডিক মানুষ দেখেছে। দূরত্ব হিসাবে মাপলে সেটা এমন কিছুই দূরে নয়। কিন্তু, প্রাচীনতার দিক থেকে দেখলে স্থানটার আত্মা শত শত বছরের পুরোনো। আমি ওই বাড়িটা ঠিক করেছিলাম, কারণ ওই বাড়ির সেলারের মধ্যে একটা উৎকট ধরনের কুয়ো রয়েছে। ঠিক যেমন একটু আগে তোমাকে বলছিলাম। কুটিরটা প্রায় ভেঙেই পড়েছিল। ওখানে কেউ বাসও করত না। এত কম দামেই ওটা নিয়েছি যে, ভাবতেও লজ্জা করে। জানলাগুলো কাঠকুটো খুঁজে পুরোপুরি বন্ধ করা। তবে ওটা আমার কাজেই লেগেছে। আমি যা করি, তার জন্যে দিনের আলোর কোনও প্রয়োজন নেই। আমি মাটির নীচের ঘরে বসেই আঁকি। ওখানেই আমার অনুপ্রেরণারা ভিড় করে আসে। তবে একতলার কয়েকটা ঘরকে আমি পরিষ্কার করে রেখেছি। ওই বাড়িটার মালিক ছিল এক সিসিলিয়ান, আমি ওটা পিটার নামে ভাড়া নিয়েছি।
এখন তুমি যদি চাও, তবে আমি তোমাকে ওখানে নিয়ে যেতে পারি। আমার মনে হয়, ছবিগুলো তোমার ভালোই লাগবে। ওখানে আমি প্রায়ই যাই। কখনও কখনও পায়ে হেঁটেই চলে যাই। বারে বারে ট্যাক্সি করে গেলে ওই জায়গাটার প্রতি সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ হবে। বুঝতেই পারছ, সেটা আমি একদমই চাই না। অবশ্য আজকে সাউথ স্টেশন থেকে ব্যাটারি স্ট্রিটের জন্যে আমরা একটা শার্ট নিতে পারি, তারপরে না-হয় বাকি রাস্তাটা হেঁটেই চলে যাওয়া যাবে।
ওই জাঁকালো বক্তৃতার পরে, প্রথম খালি ক্যাবটা দেখামাত্রই হাঁটার বদলে দৌড়ে যাওয়া ছাড়া, আমার অবশ্য আর বিশেষ কিছুই করার ছিল না। সাউথ স্টেশনে ক্যাব চেঞ্জ করে, পুরোনো ওয়াটারফ্রন্টের পেছন দিয়ে সরকারি ঘাট পেরিয়ে, ব্যাটারি স্ট্রিটের সিঁড়ি ভাঙতে যখন শুরু করেছি, তখন ঘড়িতে পাক্কা বারোটা বাজে। অত গলিঘুজির হিসাব রাখতে পারিনি আমি, তবে বলতে পারি, যেখানে আমরা গিয়ে পৌঁছেছিলাম, সেটা গ্রিনাফ লেন নয়।
রাস্তাটা বেঁকতেই একটা বহু প্রাচীন আর নোংরা গলির মধ্যে গিয়ে পড়ল। অমনটা আমি জীবনেও দেখিনি। একটা জনমানবশূন্য সরু রাস্তা ক্রমশ ঢাল বেয়ে ওপরের দিক উঠে গেছে। আশপাশের বাড়িগুলোর হাড়গোড়ের মতো বেরিয়ে-আসা কার্নিশ বয়সের ভারে ক্ষয়প্রাপ্ত। ছোট ছোট জানলার কাচগুলো চিড়-খাওয়া। সাবেককালের আধভাঙা চিমনিগুলো চাঁদের আলো ফুড়ে বিসদৃশভাবে দাঁড়িয়ে আছে। আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। আমার দৃষ্টির মধ্যে ওই তিনটে বাড়ি, কটন ম্যাথারের সময়ের থেকেও প্রাচীন। আচমকাই আরও দুটো বাড়ি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। আমার মনে হল, আমি প্রায় ভুলে-যাওয়া ছুঁচোলো তেকোনা ছাদওয়ালা স্থাপত্যের একটা বাড়ি দেখলাম। পুরাতত্ত্বজ্ঞরা নিশ্চয়ই বলবেন, ওরকম বাড়ি বোস্টনে আর দুটি নেই।
আলো-আবছায়ার ওই গলিটা থেকে আমরা বাঁয়ে বেঁকলাম। প্রায় একই রকমের আরেকটা নিস্তব্ধ এবং আরও সরু গলি, এটা একদম অন্ধকার। কয়েক পা পরেই ডানদিকে একটা ত্যারচা বাঁক নিলাম যেন আমরা, অন্ধকারের মধ্যেই। তৎক্ষণাৎ পিকম্যান ফ্ল্যাশলাইটটা জ্বালল।
মান্ধাতারও আগের যুগের দশ খোপওয়ালা এক দরজা। ঘুণে খাওয়ার নরকযন্ত্রণাতেই যেন সেটা অমন বেঁকেচুরে গেছে। তালা খুলে, পিকম্যান আমাকে ফাঁকা নির্জন হলওয়েতে প্রবেশের আমন্ত্রণ জানাল। হলওয়ের দেয়াল জুড়ে চমৎকার কালো ওক কাঠের প্যানেলিং। দেখতে খুবই সাধারণ হলেও, অ্যান্ড্রোস ও ফিপ্সের আমলের এবং ডাকিনীবিদ্যার যুগের ওই ব্যাবস্থাটা এক প্রাচীন পরিবেশ তৈরি করেছিল ঘর জুড়ে। তারপরে সে আমাকে বাঁদিকের একটা দরজা দিয়ে ঢোকাল। একটা তেলের বাতি জ্বেলে আমার দিকে ফিরে বলল, আপাতত এটা নিজের বাড়ি বলেই মনে করো।
বিশ্বাস করো এলিয়ট, আমি তেমনই মানুষ, যার মানসিক দৃঢ়তা খেটে-খাওয়া কুলিমজুরদের মতোই ইস্পাতকঠিন। তবে আমি তোমাকে বলতে পারি, ওই ঘরের দেওয়ালগুলোতে আমি যা দেখেছিলাম, তাতে আমারও রক্ত ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। দেওয়ালে ঝুলছিল পিকম্যানের আঁকা বিভিন্ন ছবি। অবশ্যই যেগুলো ও নিউবেরি স্ট্রিটে আঁকতে পারত না বা দেখাতেও পারত না। ও যে বলছিল মন খুলে আঁকা তা একদিক থেকে ঠিকই। এসো, আরেক পাত্তর নেওয়া যাক। তুমি না নিলেও, আমার দরকার!
