তুমি কি জানো? পিকম্যান বলেছিল, এমন অনেক জিনিসই আছে, যাদেরকে ওই নিউবেরি স্ট্রিটের শিল্পসভার জন্যে বানানো সম্ভব নয়? এমন জিনিস, যা এখানে মানায় না। এখানে তার সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। যা-ই হোক গে, আমার কাজ হল আত্মার স্বরূপটাকে ছবিতে ধরা। আর সেটা কোনও ভুঁইফোঁড় রাস্তার ধারে গজিয়ে-ওঠা বাড়িতে করা যায় না। এর জন্য প্রাচীনত্ব লাগে। একটা অতীত লাগে। লাগে স্মৃতি। এই বোস্টন তো এখনও কিছুই হয়ে ওঠেনি। স্থানীয় আত্মাদের আকর্ষণ করার মতো স্মৃতি তৈরি করার সময় কোথায় পেয়েছে? যদি এখানে কোনও ভূত থেকেও থাকে, তাহলে তারা ওই লবণ জলাভূমি আর অগভীর চড়াগুলোতে চরে-বেড়ানো গৃহপালিত পশু বই আর কিছু নয়। আমার চাই মানুষের আত্মা, প্রেত। যারা নরকে উঁকি দেওয়ার মতো ক্ষমতা ধরে আর যে সমস্ত নারকীয় দৃশ্য তারা দেখে, সেইগুলো বোঝার ক্ষমতাও রাখে। মনে রাখবে, ব্যাক বে বোস্টন নয়।
কোনও শিল্পীর আসল থাকার জায়গা হল নর্থ এন্ড। যদি কোনও কলাবিদ্যাবিশারদ তার শিল্পের প্রতি একনিষ্ঠ হয়, তাহলে তাকে অবশ্যই ঐতিহ্যের পিণ্ডি চটকাতে চলে যেতে হবে ওই গ্রামগুলোতে। ওহ ভগবান! তুমি কি বুঝতে পারছ না, ওই বসতিগুলো কেউ তৈরি করেনি, ওগুলো আসলে গড়ে উঠেছে! প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষ ওখানে থেকেছে, জীবনকে অনুভব করেছে এবং মারা গেছে। সেই সময়ে যখন মানুষ থাকতে, অনুভব করতে কি মারা যেতে ভয় পেত না। তুমি কি জানো, ১৬৩২-এ কপস হিলে একটা কারখানা ছিল? আর ওখানকার বেশির ভাগ রাস্তাই গড়ে উঠেছিল সেই ষোলোশা পঞ্চাশ নাগাদ। আমি তোমাকে এমন বাড়িও দেখাতে পারি, যেগুলো আড়াইশো বছরেরও বেশি পুরোনো। সেই সমস্ত বাড়ি যা দেখেছে, তা আজকালকার ওই আধুনিক বাড়িগুলোর গর্ব ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে। এই নব্যকৃষ্টিগুলো কী জানে প্রাণ আর জীবনের অন্তঃশক্তির ব্যাপারে?
সালেম, ডাকিনীবিদ্যাকে তুমি অবহেলায় বলে দিতে পারো বিভ্ৰমমাত্র। কিন্তু আমি বাজি রেখে বলতে পারি, আমার ঊর্ধ্বতন চতুর্থ পিতামহী অবশ্যই অন্য কিছু বলবে এই ব্যাপারে। ওরা তাকে গ্যালোস হিলে ফাঁসি দিয়েছিল। ধর্মধ্বজী কটন ম্যাথার নিজের চোখে দেখছিল সেই ফাঁসি। ম্যাথার শয়তানটা, সারাজীবন ভয়ে ভয়ে ছিল যে, এই বুঝি কেউ গতানুগতিক অভিশপ্ত ধার্মিক চিন্তাভাবনার খাঁচাটা ভেঙে ফেলল। আমি সত্যিই খুশি হতাম, কেউ যদি তাকে অভিশাপ দিত বা রাতের অন্ধকারে তার রক্ত চুষে খেত।
আমি তোমাকে ওই বাড়িটাও দেখাতে পারি, যেখানে সে থাকত। তোমাকে আরও একটা বাড়ি দেখাতে পারি, অত বারফট্টাই সত্ত্বেও ধর্মের ষাঁড়টা যেখানে পা রাখতে ভয় পেত। সে আসলে কিছু জিনিস জানত, কিন্তু সেগুলোকে ওই বোকা ম্যাগনালিয়া অথবা বুড়োর ওয়ান্ডারস অব দি ইনভিসিব্ল ওয়ার্ল্ড-এ ছাপাতে ভয় পেয়েছিল। তুমি নিশ্চয়ই জানো, এই সম্পূর্ণ নর্থ এন্ড একসময় সুড়ঙ্গে ভরতি ছিল। কিছু মানুষ বাকিদের অগোচরে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখার জন্যে এই ব্যবস্থা চালু করেছিল। এ ছাড়াও ছিল কবরখানা আর সমুদ্র। ওই বোস্টনের বোকাদেরকে মাটির ওপরের জিনিস নিয়েই হয়রান হতে আর নালিশ করতে দাও। প্রতিদিন মাটির গভীরে এমন অনেক কিছুই ঘটে যায়, যেখানে ওদের কল্পনাও কোনও দিন পৌঁছোতে পারবে না। ওইসব হাসির শব্দের হদিশও ওরা কোনও দিন খুঁজে পাবে না।
কিন্তু কেন? সতেরোশোর আগে তৈরি হওয়া বাড়িগুলির অন্তত দশটার ক্ষেত্রে আমি বাজি ধরে বলতে পারি, মাটির নীচের ঘরগুলোয় তুমি অবশ্যই বীভৎস কিছু জিনিস খুঁজে পাবে। আরে, এই তো মাসখানেক আগেই, কিছু মজুর ইটের গাঁথনি ভাঙতে গিয়ে কুয়ো খুঁজে পেয়েছে। তুমি পড়োনি? এমন গভীর সব কুয়ো, যেগুলো সুড়ঙ্গ হয়ে কোন পাতালে অদৃশ্য হয়েছে, কেউ জানে না। হেঞ্চম্যান স্ট্রিটে অমন একটা দেখতে পাবে তুমি। ওসব জায়গায় ডাইনিরা থাকত। মন্ত্র পড়ে ডাক পাঠাত। জলদস্যুরাও আসত, সঙ্গে করে নিয়ে আসত লুটের মাল। মৃত মানুষের সম্পদ।
আমি বলছি তোমায়, আগেকার দিনে মানুষ জানত, কীভাবে বাঁচতে হয়। জানত, কীভাবে জীবনের সীমানাকেও বিস্তৃত করে দেওয়া যায়। জ্ঞানী আর সাহসী মানুষদের কাছে এটাই একমাত্র পৃথিবী ছিল না। আর আজকের অবস্থা দেখো, ঠিক উলটো। ওই ক্লাবের হবু শিল্পীগুলোর ফ্যাকাশে গোলাপি ঘিলুতে কাঁপুনি আর খিচুনি ধরে যায়, যদি কোনও চিত্রকলায় বেকন স্ট্রিটের চায়ের টেবিলের সহ্যক্ষমতার থেকে বেশি কোনও অনুভূতি ফুটে ওঠে।
অতীতকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার না করে অগ্রসর হওয়ার বোকামি করা হয়তো বর্তমানের পক্ষেই সম্ভব। আচ্ছা, এখান থেকে ওই উত্তরদিকের জায়গাগুলোর ব্যাপারে তোমার ম্যাপ, গাইড বই কী বলে? অ্যাঁ? আমি আন্দাজে তোমাকে প্রিন্স স্ট্রিটের উত্তরে প্রায় ত্রিশ-চল্লিশটা গলিতে নিয়ে যাব– তারও আবার তস্য গলি আছে। বিদেশি পর্যটকের দল হয়তো সেখানেও ভিড় করে মচ্ছব করছে, কিন্তু ঘুণাক্ষরেও তারা কল্পনাতে আনতে পারবে না সেসব স্থানমাহাত্ম। আরে, বিদেশি পর্যটকদের তো ছেড়েই দিলাম। এখানকার কতজনই বা এসব চেনে বলো দিকিনি? দেখাও তো এমন কয়েকটাকে!! থ্রাবার, মেনে নাও, পারবে না। এই প্রাচীন জায়গাগুলো তাদের আতঙ্কের জটার মধ্যে দুর অতীত স্বপ্নের যে ঊর্ণনাভ জাল বুনে চলেছে, তার হদিশ পাওয়া সাধারণের কম্ম নয় হে৷ সাধারণের থেকে অনেক অনেক উর্ধ্বে এরা সম্পূর্ণ উপলব্ধির বিষয়। কেউ বুঝতে পারেনি, কেউ না –না না– একজন পেরেছিল। আমি কি বৃথাই এত দিন ধরে অতীতের কবর খুঁড়ে চলেছিলাম নাকি? হুঁ।
